হঠাৎ বাইরে যেন কীসের গোলমাল হল। ভোর হয়ে এল নাকি? নাকি নবাবি ফৌজ কলকাতায় যাবার জন্যে তৈরি হয়ে এসেছে। কিন্তু কই, ভোরই যদি হবে ইনসাফ মিঞার নহবত বাজে না কেন?
নেয়ামত দৌড়োত দৌড়োতে এসেছেজাঁহাপনা, সরাবখানার খিদমদগারকে ধরেছি
মির্জা মহম্মদ বললে–কোতোয়ালের কাছে নিয়ে যা–এখন আমি ব্যস্ত আছি
জাঁহাপনা, তার সঙ্গে আর একজন ছিল, দু’জনে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলছিল সরাবখানায়।
কে সে?
আমি তাকে নিয়ে আসছি জাঁহাপনা–বলে নেয়ামত দৌড়ে বাইরে গেল। গিয়েই আবার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এল দু’জনকে নিয়ে। একজন বুড়োমানুষ, তার সঙ্গে কান্ত!
মরালী দেখেই চমকে উঠেছে। কান্ত আবার এখানে এল কী করে!
জাঁহাপনা, এ আমাদের সরাবখানার খিদমদগার, আর এ…
মির্জা মহম্মদ ভাল করে চেয়ে দেখছিল কান্তর দিকে। যেন চেনা-চেনা লাগছিল। মরালীও অবাক হয়ে গিয়েছিল। নানিবেগমসাহেবাও কান্তর দিকে চেয়ে দেখছিল। এই ছেলেটাকেই তো চেহেল্-সুতুনে মরিয়ম বেগমের ঘরে সন্ধেবেলা দেখেছিল!
জাঁহাপনা, এর নাম ইব্রাহিম খাঁ। আর এ হল কাফের। এই কাফেরটার সঙ্গে এ সরাবখানার ভেতরে গুজগুজ ফিসফিস করে কথা বলছিল।
মির্জা মহম্মদ দু’জনের দিকে চেয়েই কেমন যেন তাদের মনের ভেতরের মতলব বার করবার চেষ্টা করলে।
জাঁহাপনা, এই ইব্রাহিম খাঁ’র মতলব ভাল নয়। বাইরের আদমির সঙ্গে বাতচিত করে, চকবাজারে গিয়ে সলাপরামর্শ করে, সারাফত আলির আদমি বাদশার সঙ্গে…
ইব্রাহিম খাঁ আর পারলে না। মরিয়ম বেগমের দিকে চেয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললে–মা, তুমি আমাকে বাঁচাও মা, আমি বুড়োমানুষ। আমাকে তুমি চিনতে পারবে কি মা আমি সেই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই, আমার পিতা ইন্দিবর ঘটক, পিতামহ ঈশ্বর কালীবর ঘটক…
মরালী চমকে উঠল। বললে–আপনি সেই ঘটকমশাই?
হ্যাঁ মা, আমি এই কান্ত বাবাজির সঙ্গে একটু কথা বলছিলাম, এরা আমাকে ধরে এনেছে।
মরালী কান্তর দিকে চাইলে আবার আর তুমি? তুমি আবার কী করতে এসেছিলে এখানে?
তোমার জন্যে!
আবার তুমি এসেছ? আমি বলেছি না, আমি ডাকলে তবে আসবে! কেন এলে?
মির্জা এতক্ষণ সব শুনছিল। মরিয়ম বেগমের দিকে চেয়ে বললে–তুমি এদের চেনো নাকি?
হ্যাঁ জাঁহাপনা। এ আমার বিয়ের সময় ঘটকালি করেছিল জাঁহাপনা। আগে হিন্দু ছিল। আমি প্রথমে চিনতে পারিনি, নবাবের কোনও ক্ষতি করবার ক্ষমতা এর নেই জাঁহাপনা।
আর এ?
এর কথা আমি পরে বলব। ওরা আগে চলে যাক
মির্জা মহম্মদ ইঙ্গিত করতেই নেয়ামত দু’জনকে নিয়ে বাইরে চলে গেল।
মরালী আবার বললে–এর জন্যেই আমি জাঁহাপনাকে বলতে এসেছিলাম।
ওর সঙ্গে তোমার কীসের সম্পর্ক?
কোনও সম্পর্ক নেই জাঁহাপনা। একদিন ওর সঙ্গেই আমার বিয়ে হবার কথা হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। তারপর চেহেলসূতুনে আসবার সময় ও-ই আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিল।
কিন্তু এখনও কেন তোমার কাছে আসে?
ও আমার ভাল চায়!
তোমার ভাল চেয়ে ওর লাভ?
মরালী বললে–ভাল চাওয়া যার স্বভাব সে লোকের ভালই চাইবে, লাভ-লোকসানের কথা ভাববে । এই আমি যেমন জাঁহাপনার ভাল চাই—
ওর সম্বন্ধে তুমি কী বলতে এসেছিলে?
জাঁহাপনা, আমার একটি শুধু আর্জি, জাঁহাপনার সঙ্গে যদি আমাকে না যেতে দেন তো ওকে জাঁহাপনার সঙ্গে যেতে দিন, ও জাঁহাপনাকে মদত দেবে, ও জাঁহাপনার সেবা করবে। ও জাঁহাপনার পাশে পাশে থাকবে, জাঁহাপনার কোনও ক্ষতি না হয় তাই দেখবে। ও জাঁহাপনার…
কিন্তু তার জন্যে তো অন্য লোক আছে!
মরালী বললে–এরপর আমি আর কাউকেই বিশ্বাস করি না জাঁহাপনা। ও কাছে থাকলে আমি তবু নিশ্চিন্ত হব, নইলে যে চেহেল্-সুতুনে বসে বসে আমার ভাবনায় দিন কাটবে না।
মির্জা মহম্মদ নানিবেগমসাহেবার দিকে চাইলে এবার।
নানিজি, তবে যে তুমি বলেছিলে আমাকে কেউ ভালবাসে না। এই তো একজন রয়েছে যে আমার ভাল চায়, যে আমার জন্যে ভাবে
নানিবেগম কথা বলবার আগেই নহবতখানায় ইনসাফ মিঞার নহবতে টোড়ির সুর বেজে উঠল। সুরটা শুনেই যেন সবাই সচেতন হয়ে উঠেছে।
মির্জা মহম্মদ বললে–তোমার কথাই রইল বেগমসাহেবা, ও থাকবে আমার সঙ্গে, কিন্তু তোমরা এখন যাও, আমায় তৈরি হতে হবে আমি এখুনি হুকুমত জারি করে দিচ্ছি
তারপর ডাকলে–নেয়ামত!
ততক্ষণে মরালী নবাবকে কুর্নিশ করে আম-দরবার থেকে বেরিয়ে এসেছে। নানিবেগমও বেরিয়ে এসেছে মরালীর পেছন পেছন। চবুতরার ওপরে তাঞ্জাম দাঁড়িয়ে ছিল। দু’জোড়া হাতিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ে তাল ঠুকছিল।
মুর্শিদাবাদের আকাশের পুব দিকটায় তখন অন্ধকার পাতলা হয়ে এসেছে। পাতলা হয়ে এসেছে মোগল ঐশ্বর্যের শেষ আড়ম্বরের গাঢ় রং। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা তখনও জানত না যে এবারে যে সূর্য পুব দিক থেকে উঠছে সে অন্যদিনের চেয়েও প্রখর, অন্যদিনের চেয়েও উজ্জল। ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে যে-সভ্যতা আরব সমুদ্র পেরিয়ে হিন্দুস্থানে এসে আসন গাড়তে এসেছিল সে অন্যরকম। হিন্দুস্তানের পশ্চিম আকাশে তার আবির্ভাব একদিন অমোঘ হয়েছিল বলেই এ-দেশের মানুষ নিজের অর্থ, নিজের ঐশ্বর্য, নিজের গৃহলক্ষ্মীকে পর্যন্ত তার পায়ে জলাঞ্জলি দিয়েছিল। কিন্তু এবার আর অত সহজে ওদের খিদে মিটবে না। এবার যে আসছে সমস্ত পৃথিবী তার মুঠোর মধ্যে চাই। আগে যারা এসেছিল তারা এখানকার মসনদ নিয়েছিল, এবার এরা নেবে মুনাফা। কারবারের মুনাফা, মসনদের মুনাফা আর মনুষ্যত্বের মুনাফা নিয়ে তবে এরা হিন্দুস্তানকে রেহাই দেবে।
