মির্জা মহম্মদ নানিবেগমের দিকে চেয়ে বললে–নানিজি, তুমি বেগমসাহেবাকে বুঝিয়ে বললো না। যে, নবাবের কাছে এসব কথা নতুন নয়। নবাব সব জানে। একে বুঝিয়ে দাও যে, নবাবের মা, যে নবাবকে পেটে ধরেছে, সেও নবাবের ভাল চায় না! বলে দাও যে, বাংলার নবাব শত্রু নিয়েই সংসারে জন্মেছে।
নানিবেগম বললে–সে-সব আমি মরিয়মকে বলেছি, এ সব শুনেছে, তবু তোর কাছে এসেছে, তুই আর কারও কথা না শুনিস এর কথা শোনো বাবা
মির্জা যেন উত্তেজিত হয়ে উঠল। বললে–এসব পুরনো কথা শুনে কী করব? তবে কি বলতে চাও ওর কথা শুনে আমি সরফরাজ খাঁ’র মতন চেহেসতুনে গিয়ে বেগমদের সঙ্গে ফুর্তি করতে বসব? বেগমদের ঠুংরি গান শুনে আর তয়ফাওয়ালির নাচ দেখে দিন কাটাব? চারদিকে শত্রু আছে বলে কপাল চাপড়ে কাঁদতে বসব?
তারপর একটু থেমে আবার বলতে লাগল আর ভালবাসার কথা বলছ? মহব্বতের কথা বলছ? সে যে পায় সে পায়! আমি মহব্বত পাইনি বলে খুদাতালাকে গালাগালি দেব? খুদাতালার সঙ্গে কাজিয়া করব? আজ যদি আমি হিন্দুস্থানের খাতিরে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে মুকাবিলা করতে না যাই তো হিকায়াৎ আমাকে মাফ করবে? তারিখ-দান আমাকে ক্ষমা করবে?
মরালী খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে–জাঁহাপনা কথা দিন, জাঁহাপনার সঙ্গে আমাকে যেতে দেবেন ।
তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
কেন, জাঁহাপনার সঙ্গে কি তয়ফাওয়ালিরা যায় না?
তুমি কি তয়ফাওয়ালি?
ধরে নিন জাঁহাপনা, আমি আপনার তয়ফাওয়ালি!
কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে গিয়ে কী করবে?
মরালী বললে–আমি জাঁহাপনার পাশে পাশে থাকব–জাঁহাপনার যখন ভাবনায় ঘুম আসবে না, জাঁহাপনা যখন অশান্তিতে ছটফট করবেন, আমি তখন জাঁহাপনাকে একটু সান্ত্বনা দেব, কিংবা জাঁহাপনা যখন দুশমনদের হারিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, আমি তখন জাঁহাপনার মুখের সামনে শরবতের গাগরা তুলে ধরব।
মির্জা মহম্মদ বললে–তার জন্যে তো আমার বাঁদিই থাকবে!
মনে করবেন না হয় আমি জাঁহাপনার বাঁদিই!
মির্জা মহম্মদ আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল। আরও ভাল করে দেখতে লাগল মরিয়ম বেগমের মুখের দিকে।
বললে–কেন বলো তো? তুমি আমার জন্যে এতখানি করতে চাও কেন? তুমি কী চাও?
মরালী তেমনি মুখ তুলেই বললে–আমি কিছুই চাই না জাঁহাপনা।
কিন্তু বাংলার নবাবের জন্যে এতখানি দরদ তো ভাল কথা নয়? তুমি কি শোনোনি লোকে আমাকে আড়ালে কী বলে? লোকের কথা বুঝি তোমার কানে যায়নি? যদি কানে না গিয়ে থাকে তো যাকে জিজ্ঞেস করবে সে-ই তোমাকে বলে দেবে যে আমি লম্পট, আমি চরিত্রহীন, আমি বদমাইস, আমি মেয়েমানুষবাজ! এর পরেও তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
মরালী হাসল নবাবের দিকে চেয়ে। বললে–আমি চেহেল্-সুতুনে এতদিন কাটালুম, লম্পট দেখলে আমার আর ভয় করে না জাঁহাপনা–আমি পাপের আড়তের মধ্যে বসে আছি, আমি জাঁহাপনার চরিত্রকে ভয় করি না! সঁহাপনার ভালর জন্যে আমি জাহান্নমে পর্যন্ত যেতে রাজি আছি
মির্জা মহম্মদ এবার একটু চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করলে আসলে তুমি কে? তুমি কোত্থেকে এসেছ? আগে কী ছিলে? কোথায় ছিলে? দিল্লির তোষাখানায়?
নানিবেগম বললে–না রে মির্জা, ও হল হাতিয়াগড়ের ছোট রানিবিবি! ও হিন্দু! ওকে মেহেদি নেসার পরোয়ানা পাঠিয়ে চেহেল্-সুতুনে এনে তুলেছে।
মরালী নানিজির কথা শেষ না হতেই বললে–সেকথা আমি এখন ভুলে গিয়েছি জাঁহাপনা। আমি এখন মরিয়ম বেগম। আমার আর অন্য কোনও নাম নেই–
তুমি কি নিজের বাড়ি ফিরে যেতে চাও?
আমি ফিরে গেলেও আমার বাড়ি আমাকে আর ফিরিয়ে নেবে না। আমি চেহেল্-সুতুনে এসে পতিত হয়ে গিয়েছি।
তা হলে তুমি আর কী চাও বলো? কোথায় যেতে চাও? কার কাছে যেতে চাও? দেশে তোমার আর কে আছে বলো? কে তোমায় ফিরিয়ে নেবে?
কেউ নেবে না। জাঁহাপনা যাকে একবার নিয়েছে, চিরকালের মতো তার ভবিষ্যৎ চলে গেছে। দুনিয়ার কোথাও তার ঠাই নেই!
টাকা নেবে তুমি? আসরফি? মোহর?
না, আমার কিছুই চাই না। আমি জাঁহাপনার কাছে কাছে থাকতে চাই শুধু! যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন জাঁহাপনার কাছে থাকব, আর কিছুই চাই না।
মির্জা মহম্মদ বললে–কিন্তু আমার কাছে থাকলে যে চিরকালের মতো সুখের আশা জলাঞ্জলি দিতে হবে, তা পারবে?
কিন্তু আমি তো সুখ চাই না জাঁহাপনা।
মানুষ হয়ে জন্মিয়ে সুখ চাও না এ তো বড় তাজ্জব কথা। আমার বেগমদের মধ্যে এমন কথা তো আগে কখনও কারও মুখে শুনিনি!
মরালী বললে–জাঁহাপনা কি সকলের মনের কথা জানেন? সকলে কি জাঁহাপনার কাছে নিজেদের মন খুলে কথা বলে?
তুমি তো অনেক কথাই জানো দেখছি।
মরালী বললে–অনেক কথা না-জানলে কি জাঁহাপনার কাছে সাহস করে এসেছি? অনেক কথা জানি বলেই তো এমন করে মন খুলে কথা বলছি! আমার শুধু একটা অনুরোধ জাঁহাপনা, যদি লড়াই করতে যান তো আমাকে শুধু আপনার সঙ্গে যেতে দিন! তয়ফাওয়ালিরা যেমন যায়, বাঁদিরা যেমন যায়, বেগমসাহেবারা যেমন যায়, এবার তাদের মতো আমাকে জাঁহাপনার সঙ্গে যেতে দিন।
তা হয় না।
কেন হয় না জাঁহাপনা? আমি কি জাঁহাপনাকে সেবা করতে পারব না?
মির্জা মহম্মদ বললে–এবার সেলড়াই নয় বেগমসাহেবা, এবার সেরকম লড়াই নয়। এবার ফিরিঙ্গিদের একেবারে হিন্দুস্তান ছাড়া করে দিয়ে আসব। যাতে তারা আর এখানকার নোনা মাটিতে শেকড় গজাতে না পারে!
