নানিবেগম জিজ্ঞেস করেছিল–কী ভাবছিস মেয়ে?
মরালী বলেছিল কিছু না
নানিবেগম কিছুই বোঝে না। এতদিন নবাব আলিবর্দি খাঁ’র সঙ্গে সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছে আর চেহেলসুতুনের ভেতরে নিজের বেগমগিরি ফলিয়েছে। বাইরের পৃথিবীতে যে কী ষড়যন্ত্র চলছে তার নাতির বিরুদ্ধে, তার খবরও রাখে না। জানে না যে, এমনি করে চললে তার চেহেল্-সুতুনও একদিন চলে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে তার বেগমগিরিও চলে যাবে।
নেয়ামত ডাকতেই মরালী এগিয়ে গেল। পেছনে নানিবেগম। আজ আর কোনও ভয় করল না মরালীর নবাবের সামনে যেতে। আজ আর কোনও সংকোচও হল না।
নানিবেগমই প্রথম কথা বললে–তুই নাকি আবার লড়াই করতে যাচ্ছিস মির্জা?
হ্যাঁ নানিজি!
তা তুইও কি তোর নানার মতো কেবল লড়াই করেই জিন্দগি কাটাবি?
নবাবি রাখতে গেলে তাই-ই হয়তো করতে হয় নানিজি!
মরালী এবার মুখ তুলল। বললে–জাঁহাপনা আমার কসুর মাফ করবেন। নানাজি তো লড়াই করেছিল ডাকাতদের সঙ্গে, মারাঠা ডাকাত। জাঁহাপনা কার সঙ্গে লড়াই করতে যাচ্ছেন?
নবাব বললে–এরা মারাঠা ডাকাতদের চেয়েও বদমাস, তার চেয়েও শয়তান এরা–
কে জাঁহাপনাকে বললে–সে কথা? জাঁহাপনা কি তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন?
নবাব মরালীর কথায় যেন ক্ষুণ্ণ হল। বললে–তোমার তো খুব সাহস বেগমসাহেবা! তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ তা জানো?
মরালী মাথা নিচু করে একবার কুর্নিশ করে নিলে। তারপর বললে–আমি গাঁয়ের মেয়ে, গেরস্ত ঘরের বউ, আমার যদি কিছু বেয়াদপি হয়ে থাকে, জাঁহাপনা আমাকে ক্ষমা করবেন।
কী বলছিলে বলল, আমার বেশি কথা বলবার সময় নেই।
নানিবেগম বললে–কোনও দিনই তো তোর সময় হবে না মির্জা। তোর জন্যে সবাই চেহেল সুতুনে আমরা বসে ছিলুম। আমি নিজে বাবুর্চিখানায় গিয়ে তোর মুরগি-মসল্লাম খানার বন্দোবস্ত করেছিলুম, হঠাৎ শুনলুম মানিকচাঁদের ডাকে তুই চলে এসেছিস
মরালী বললে–আপনি সেই চিঠি পড়বার পরও মানিকচাঁদকে বিশ্বাস করছেন?
বিশ্বাস!
হঠাৎ এক মুহূর্তের মধ্যে নবাব যেন ছেলেমানুষে পরিণত হয়ে গেল। সেই হাসিটার কথা মরালী জীবনে কখনও ভুলবে না। নবাব হেসে নানিবেগমের দিকে চেয়ে বললে–তোমার এই নতুন বেগমকে বুঝিয়ে বললো না নানিজি যে, মির্জা মহম্মদ কাউকেই বিশ্বাস করে না। বুঝিয়ে বলল না যে, মির্জা তার নিজের মাসিকে পর্যন্ত বিশ্বাস না করে তাকে ফাটকে পুরে রেখে দিয়েছে। শুধু মাসি কেন, বলে দাও তোমার মির্জা তার নিজের মা, নিজের বউ, নিজের ভাইকে পর্যন্ত কখনও বিশ্বাস করেনি। নিজের ভাইকে সে এই সেদিন খুন করে এসেছে। এখনও তার হাতের রক্ত শুকোয়নি। বলো না নানিজি, ভাল করে বুঝিয়ে বলল না বেগমসাহেবাকে। বেগমসাহেবা তো নতুন এসেছে, তাই এখনও জানে না তোমার মির্জাকে–
মরালী বললে–আমি জানি জাঁহাপনা, সব জানি। জানি বলেই তো জাঁহাপনার হুকুম ছাড়াই এখানে এসেছি!
তা আমি লড়াইতে যাই এটা তুমি চাও না, না?
মরালী বললো—হ্যাঁ
নানিবেগম বললে–আমিও তো সেই কথাই তোকে বলতে এসেছি মির্জা
কিন্তু কই, আমার মা, আমার মাসি তারা তো কেউ বারণ করতে এল না। তারা কি কেউ আমাকে ভালবাসে না? তোমরাই শুধু আমাকে ভালবাসো?
মরালী বললে–জাঁহাপনা, এ সংসারে কেউ কাউকেই ভালবাসে না।
সেকী? কী বলছ তুমি?
আমি ঠিক কথাই বলছি জাঁহাপনা। ওটা কথার কথা। আমরা সবাই নিজেকেই ভালবাসি। জাঁহাপনাই কি কাউকে কোনওদিন ভালবেসেছেন? আমরা জাঁহাপনার বেগম। আমাদের সকলের মুখ কি কোনওদিন জাঁহাপনা ভাল করে দেখেছেন? আমাদের কথা ছেড়েই দিন, জাঁহাপনা কি লুৎফুন্নিসা বেগমকেই কোনওদিন চিনতে চেষ্টা করেছেন?
মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা এই যেন প্রথম ভাল করে চেয়ে দেখলে মরিয়ম বেগমের দিকে। এতদিন যেন আমলই দেয়নি এই মেয়েটাকে। এ-মেয়েটা এত কথা শিখল কেমন করে!
এই যে আমি, এই যে নানিবেগমসাহেবা, এই আমরাই কি জাঁহাপনাকে ভালবাসি বলে এত কথা বলতে এসেছি?
মির্জা বললে–তা হলে এত রাতে কীজন্যে এসেছ তোমরা?
এসেছি আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। আমরা আমাদের ভালর জন্যই এসেছি। আমাদের যাতে কোনও ক্ষতি না হয় তাই আমরা জাঁহাপনাকে লড়াই করতে যেতে বারণ করতে এসেছি।
তা আমি লড়াই করতে গেলে তোমাদের কীসের লোকসান? আমি যদি হেরে যাই, সেই ভয়? আমি হেরে গেলে তোমাদের দেখবার কেউ থাকবে না, সেই লোকসান?
না, তা নয়!
মরালী একটু থেমে আবার বললেনবাব কি আপনিই প্রথম হয়েছেন? তা তো নয়। আমি তো শুনেছি আপনার আগে আরও অনেক নবাব এসেছেন গেছেন। সবাই লড়াই করেছেন। কেউ হেরেছেন, আবার কেউ বা জিতেছেন। জীবনেরই যখন কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই, তখন লড়াইতে হার-জিত তো ছোট কথা। আমি তা বলছিনা। আমি বলছি, জাঁহাপনার মতো এমন করে শত্রু নিয়ে কেউ লড়াই করতে যায়নি আগে। আপনি কাদের ওপর ভরসা করে লড়াই করতে যাচ্ছেন? কে আপনার দলে? কারা জাঁহাপনার লোক? আপনার কে আছে? জাঁহাপনার আমির-ওমরার মধ্যে কেউই তো নেই যে আপনার ভাল চায়।
মির্জা মহম্মদ চুপ করে রইল।
মরালী আবার বলতে লাগল–যে মানিকচাঁদকে আপনি কলকাতার সুবাদার করেছিলেন, সেই মানিকচাঁদই ফিরিঙ্গিদের চাল-ডাল-আটা বিক্রি করে হাজার হাজার মোহর কামালে। আপনি চেয়েছিলেন ফিরিঙ্গিদের দেশছাড়া করতে, আপনার ওমরাওরা তাদেরই আবার দেশের ভেতরে ডেকে আনলে। আপনি যাকে সবচেয়ে বিশ্বাস করেন, সেই উমিচাঁদও আপনার সর্বনাশ করবার জন্যে কাঁদ পাতছে। আমার বেআদপি মাফ করবেন জাঁহাপনা, আমি সফিউল্লা খাঁ-কে খুন না করলে এত কথা জানতেও পারতাম না, এত কথা বলতেও আসতাম না ।
