যাও, ভোরবেলা কলকাতা রওনা হব!
সবাই মির্জা মহম্মদের সামনে থেকে আড়ালে সরে গিয়ে যেন মুক্তি পেলে।
হঠাৎ নেয়ামতের গলার শব্দে চমক ভাঙল।
জাঁহাপনা, নানিবেগমসাহেবা আয়ি!
নানিবেগমসাহেবা?
জি জাঁহাপনা!
একলা?
না জাঁহাপনা, মরিয়ম বেগমসাহেবা ভি সঙ্গে আছে
মির্জা মহম্মদ আয়নার সামনে থেকে সরে এসে আম-দরবারের মাঝখানে দাঁড়াল। বললে–দাও, এত্তেলা দাও—
*
মতিঝিল, মুরাদবাগ, মনসুরগঞ্জ–আজকে এসব শুধু স্বপ্নের নাম। স্বপ্নের সমষ্টি হয়ে ঔপন্যাসিকের কল্পনার আশ্রয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেদিন সেই বিপ্লবের সন্ধিযুগে কে ভাবতে পেরেছিল দিল্লির মোগল বাদশার অধীনে বাংলার নগণ্য সুবাদারের একটা মসনদ নিয়ে সারা হিন্দুস্থানের ভাগ্যে এতবড় একটা বিপর্যয় ঘটে যাবে! কোথাকার কোন সাত সাগর তেরো নদীর পারের একটা তিরিশ বছরের বাপে-খেদানো মায়ে-তাড়ানো ছেলে এমনি করে হাজি আহম্মদের একমাত্র চোখের মণির চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নেবে!
সমস্ত হিন্দুস্থানটাই যেন সেদিন বারুদখানা হয়ে উঠেছিল। বারুদের স্থূপ।
রাত্রে ঘুমোতে ঘুমোতে শুধু কি মির্জা মহম্মদই শিউরে উঠত? চেহেল্-সুতুনের অন্দরে বেগমদের যখন সারাফত আলির আরক খেয়ে দামি ঘুম নিতে হত, তখন মিরবকশি, মির মহম্মদ জাফর খাঁ-ও তো ছটফট করত এক ফোঁটা ঘুমের জন্যে। আর মিরমহম্মদ জাফর খাঁই বা একলা কেন? কে ঘুমোতে পারত নিশ্চিন্ত মনে? হাতিয়াগড়ের ডিহিদার রেজা আলির ঘোড়া সেই ফিরিঙ্গিটা পর্যন্ত নিজের আস্তাবলে দাঁড়িয়ে পা ঠুকত খটখট শব্দ করে। হাতিয়াগড়ে রাজবাড়ির অতিথিশালায় অতিথিরা পর্যন্ত ছটফট করত নিজের মনে। বর্গিরা নেই, ভাস্কর পণ্ডিতরা আর আসে না পশ্চিমদিক থেকে। তবু ভয় কীসের জন্যে কে জানে। রাস্তায় একা একা চলতে ভয়, অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলতে ভয়। নদীতে নৌকো বাইতে ভয়।
তা ভয় করবে না?
কেউ বুঝতে পারে না, কেউ বোঝাতে পারে না। তবু মনে হয় সকলের পায়ের তলার মাটিতে কোথাও যেন ফাটল ধরেছে। নিজামতের কাছারিতে গেলে টাকা না দিলে কেউ কথা বলে না। ঘরে বউ-ছেলেমেয়ে রেখে কোথাও যেতে ভরসা হয় না। প্রাণটাও যেন বেওয়ারিশ হয়ে গেছে গোরু-ছাগল-মুরগির মতো। ওপরওয়ালা বলে একমাত্র যদি কেউ থাকে তো সে আছে। কিন্তু তাকে তো দেখা যায় না। তা হলে কোথায় যাই? কার কাছে গিয়ে নালিশ পেশ করি?
বুঝতে পেরেছিল শুধু ওই মেয়েটা। হাতিয়াগড়ে থাকতে অতটা বোঝা যায়নি, কিংবা তখন বয়েস কম ছিল বলে হয়তো বুঝতে পারেনি। কিন্তু মুর্শিদাবাদে আসার পর থেকেই দেখলে এ এক অরাজক দেশ। গায়ে যতদিন ছিল মরালী ততদিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখেছে। সেখানেও বুঝি এর চেয়ে বেশি নিয়ম শৃঙ্খলা আছে। নিয়ম করে সূর্য ওঠে সেসব সংসারে, আবার নিয়ম করে সূর্য ডোবে। কিন্তু মুর্শিদাবাদে নিয়মকানুনের বালাই নেই। নিয়ম যা আছে তা সেরেস্তা কাছারির নথিপত্রে। অথচ এই মুর্শিদাবাদে আসবার আগে কত ভয় করেছিল। কিন্তু এসে দেখলে এর বাইরেই শুধু বজ্রআঁটুনি। ভেতরে ভেতরে ফসকা গেরো। এখানে বসে যা-কিছু বেনিয়ম করা যায়, কেউ কিছু বলবার নেই। ইচ্ছে করলেই তো একদিন চেহেল সুতুন থেকে পালিয়ে যেতে পারত সে। ওই কান্ত রয়েছে। ওকে একটু বললেই নিয়ে যায় এখান থেকে। কিন্তু চোখের সামনে যখন খাঁচার ফটকটা খোলা দেখলে তখন আর পালাবার উপায় রইল না। মনে হল পালিয়ে। কোথায় যাবে? যেখানেই যাবে সেখানেই তো আবার তার জন্যে নতুন খাঁচা তৈরি হয়ে থাকবে। ওই মেহেদি নেসার, ওই ইয়ারজান, ওই সফিউল্লারা তো সারা দেশটাতেই ছড়িয়ে রয়েছে। ওই উমিচাঁদ, ওই মিরজাফর, ওই জগৎশেঠ, ওরা থাকতে পালিয়েই বা যাবে কী করে?
কান্ত বলেছিল–ওদের সঙ্গে কি তুমি পারবে মনে করেছ?
কান্তর মুখের দিকে চেয়ে একটু মায়া হয়েছিল মরালীর। ছেলেটার কিছু হবে না। কেন যে পড়ে আছে মুর্শিদাবাদে! চলে গেলেই পারে! আবার বিয়েথা করে ঘর-সংসার করবার চেষ্টা করলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
কান্ত বলেছিল–তা আর হয় না!
কেন? হয় না কেন?
কান্ত প্রথমে বলতে চায়নি। বলেছিল–তুমি তো ওসব বিশ্বাস করবে না।
কী সব?
হাত দেখা!
হাত দেখা! হাত দেখার কথা শুনে মরালী একটু কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল।
হাত দেখা মানে? তুমি কাউকে হাত দেখিয়েছ নাকি? কী বলেছে সে?
কান্ত কিছুতেই বলতে চায় না। মরালী পীড়াপীড়ি করলে বলল না, কী বলেছে, বলো না
কান্ত বলল তুমি যদি রাগ না করো তো বলি!
না, রাগ করব না, বলো।
কান্ত বললে–বলেছে, যার সঙ্গে আমার বিয়ে হবার কথা ছিল তার সঙ্গেই নাকি আমার আবার বিয়ে হবে!
তার মানে?
কান্ত চুপ করে রইল।
মরালী বললে–তার মানে আমার সঙ্গে? তুমি বুঝি সেই আশাতেই আমার পেছনে ঘুরঘুর করছ? এই তোমার মতলব? ওসব মতলব থাকলে কিন্তু তোমাকে আর আমার কাছে আসতে দেব না, তা বলে রাখছি।
কান্ত বলেছিল–না না, সত্যি বলছি মরালী, আমার সে-মতলব নেই। বিশ্বাস করো আমাকে, আমি সেকথা বিশ্বাস করিনি
মরালী বলেছিল–আচ্ছা, তুমি এখন যাও তো, তুমি এখন আমার সামনে থেকে যাও
বলে কান্তকে জোর করে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল মরালী। যেতে কি চায়! জোর না করলে হয়তো যেতই না। তাঞ্জামে করে চকবাজার দিয়ে আসতে আসতে কান্তর কথাই বেশি করে মনে পড়েছিল তার।
