সত্যিই বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা মতিঝিলের মধ্যে আর একবার একটা বিরাট আয়নার সামনে নিজের চেহারাটা দেখছিলেন। জগৎশেঠজি একটু আগেই ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করতে বারণ করে গেছে। কিন্তু মানিকচাঁদ বলেছে লড়াই চালিয়ে যেতে! একেবারে উলটো কথা!
মানিকচাঁদ বলেছিল–লড়াই না করলে ওরা ভাববে জাঁহাপনা ভয় পেয়েছেন!
জগৎশেঠজি বিজ্ঞ মানুষ। বলেছিলেন কিন্তু একবার তো লড়াই করে জাঁহাপনা দেখিয়ে দিয়েছেন ভয় পাবার লোক জাঁহাপনা নন
মানিকচাঁদ বলেছিল কিন্তু এবার তো ড্রেকসাহেব নয় জাঁহাপনা, এবার যে তৈলঙ্গ দেশ থেকে নতুন দল এসেছে। এদের সঙ্গে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন আছে, রবার্ট ক্লাইভ বলে আর একজন আঁদরেল কর্নেল আছে
নবাব বললে–এ লোকটা কেমন, মানিকচাঁদ? ওই ক্লাইভ?
জাঁহাপনা, লোকটা কাটখোট্টা আদমি কাকে বলে মেহেরবানি, কাকে বলে তোয়াজু কিছু জানে না। দিল বলে কোনও পদার্থ নেই লোকটার–এককথায় মতলববাজ!
মির্জা মহম্মদ সব শুনলে।
তারপর বললে–এতদিন যে ফিরিঙ্গিরা ফলতায় গিয়ে ছিল, কী খেয়ে থাকত? আমি তো হুকুম দিয়ে দিয়েছিলাম কেউ ওদের খুরাকি বেচবে না! কে ওদের খুরাকি জোগান দিলে?
হঠাৎ মানিকচাঁদের মুখটা খানিকক্ষণের জন্যে যেন কালো হয়ে গেল। কথা বলতে গিয়ে জিভটা আটকে গেল।
তুমি খুরাকি জুগিয়েছ?
নবাবের গলার শব্দে যেন আসমানের বাজ ভেঙে পড়ল আমদরবারে।
না জাঁহাপনা।
তা হলে কে জোগান দিল? খিলাফত-ই-খুদা?
সবাই চুপ। মাসের পর মাস ফিরিঙ্গিরা ফৌজ-পল্টন নিয়ে হিন্দুস্থানের নবাবের হুকুম অমান্য করে হিন্দুস্থানের দরিয়াতে ভেসে রইল তবে কি সির্ফ হাওয়া খেয়ে? নিশ্চয় হিন্দুস্থানের নিমকহারামরা তাদের খুরাক জুগিয়েছে। কে সে নিমকহারাম? কে সে বেত্তমিজ! কে সে হারিফ? কে সে দুশমন? কে সে শয়তান?
সমস্ত আম-দরবারটা যেন গমগম করতে লাগল নবাবের রাগের চিৎকারে।
তা আমি জানি না জাঁহাপনা।
কিন্তু আমি জানি!
এবার আর রাগ নয়। এবার নবাবের গলায় যেন আর্তনাদের বিভীষিকা ভয়াল মূর্তিতে ফুটে উঠল।
তা হলে নবাব কি সব জেনে গেছে! মিরজাফর আলির বুকটা দুলে উঠল শিরশির করে। জগৎশেঠজি স্থির নিশ্চল নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নবাবের তো কিছু জানবার কথা নয়। তবে কি এও একটা কৌশল। ভেতরের খবর আদায় করবার কারসাজি?
তুমি কেমন করে নিমকহারামি করতে পারলে মানিকচাঁদ? তোমাকে না আমি কলকাতার সুবাদার করে দিয়েছিলাম! তোমার ওপর কলকাতার ভার তুলে দিয়ে আমি না নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিলাম। তোমাকে না আমি বিশ্বাস করেছি, তোমাকে না আমি ইয়াকিন করেছি! বলল, সত্যি কি মিথ্যে?
মানিকচাঁদ মাথা উঁচু করল।
না জাঁহাপনা, আমি নিমকহারামি করিনি!
তুমি ফিরিঙ্গিদের খুরাক জোগাওনি?
না।
তুমি উমিচাঁদের সঙ্গে হাত মেলাওনি? সত্যি বলো, কত টাকা কামিয়েছ তোমরা দু’জনে আমার দুশমনদের খুরাক হাজত-রফাই করে?
মানিকচাঁদের মাথাটা আস্তে আস্তে হেঁট হয়ে এল।
এত টাকা কামিয়ে তোমরা কার নিমকহারামি করলে মানিকচাঁদ? আমার, না হিন্দুস্থানের, না খুদাতালার? বলো বলো।
সমস্ত মতিঝিল, সমস্ত আম-দরবার হতবাকের মতো স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল নবাব মির্জা মহম্মদের করুণ মুখখানার দিকে।
এ হিন্দুস্থান কি আমার একলার মানিকচাঁদ? না আলিবর্দি খাঁ’র, না দিল্লির শাহেন শা বাদশাজাদার? এ তো কারও একলার তালুকদারি নয়! এ তোমার আমার খিলাফত-ই-খুদার! তোমরা কার সর্বনাশ করলে? আমার, না তোমার? না তামাম হিন্দু-মুসলমানের? যাদের আমি কলকাতা থেকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছি, তাদের তুমি আবার ডেকে আনলে টাকার লোভে? এত তোমার টাকার লোভ? কলকাতার সুবাদারি পেয়েও তোমার টাকার লোভ মিটল না?
এতক্ষণে মানিকচাঁদ সাহস করে আবার মুখ তুলল।
বললে–জাঁহাপনা আমার ওপর অবিচার করছেন, জাঁহাপনা হয়তো ভুল খবর পেয়েছেন।
ভুল খবর?
মানিকচাঁদ বললে–নিজামতের চররা লোকের মুখের ভুল খবর জাঁহাপনাকে জানিয়েছে।
নিজামতের চর নয় মানিকচাঁদ।
তবে কে জানিয়েছে, জিজ্ঞেস করতে পারি কি জাঁহাপনা?
নবাব বললে–সে-খত আমার কাছে রয়েছে এই চিঠিতেই সব লেখা আছে
ও কার চিঠি জাঁহাপনা?
উমিচাঁদের!
আবার থমথম করে উঠল আম-দরবার! আবার খানিকক্ষণের জন্যে যেন বিহ্বল হয়ে রইল মতিঝিল। কী বলবে ভেবে পেলে না কেউ।
ও চিঠি তো জালও হতে পারে জাঁহাপনা!
না, জাল নয়। সফিউল্লা খাঁ’র জেব থেকে পাওয়া গেছে এই রাজদার খত!
কে পেয়েছে?
পেয়েছে আমার বেগম। চেহেল্-সুতুনের বেগম।
তিনি কী করে পেলেন এ চিঠি?
সেই বেগমই খুন করেছে সফিউল্লাকে! সেই বেগমসাহেবার নাম মরিয়ম বেগম।
তারপর যেন বড় ঘৃণা হয়েছিল মির্জা মহম্মদের। এই আমির-ওমরাও সকলকে জুতো মেরে আম-দরবার থেকে বার করে দিতে ইচ্ছে হয়েছিল। হায় রে! এরাই তার আমির। এদের পরামর্শ নিয়েই তিনি চালাচ্ছেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার মসনদ! এদেরই খেতাব দিয়ে, খেলাত দিয়ে তিনি তোয়াজ। করছেন। এরা নিমকও খাবে আবার হারামিও করবে। অথচ কাকে বিশ্বাস করবেন? মরবার সময় আলিবর্দি খার চোখমুখ বড় করুণ হয়ে উঠেছিল মির্জার কথা ভেবে। কাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছেন তিনি তার নাতিকে। দিল্লির বাদশার দিন ফুরিয়ে গেছে। মসনদের চারপাশে শেয়াল কুকুর-শকুনির ভিড়, আর ওদিকে ওত পেতে বসে আছে ফিরিঙ্গিরা। তামাম হিন্দুস্থান হয়তো শ্মশান করে দিয়ে তবে ছাড়বে!
