পাশের ঘর থেকে ফিরে এসেই উমিচাঁদ সাহেব বলেছিল–তা হলে কী হল, বলো?
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বললে–বলুন, আপনি কত নেবেন?
আমি তোমাদের সঙ্গে নবাবের লড়াই বাধিয়ে দেব!
ওয়াটসন বললে–শুধু লড়াই বাধিয়ে দিলে চলবে না, লড়াইতে জিতিয়েও দিতে হবে?
তা হলে অনেক টাকা চাই।
কত টাকা?
নবাবের খাজাঞ্জিখানায় যত টাকা তোমরা পাবে, তার চার ভাগের এক ভাগ।
ক্লাইভ বললে–তাই-ই দেব!
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আমরা কারবারি লোক, তোমরাও নতুন, তোমাদের সঙ্গে কারবারে তোমরা আমার কথা রাখোনি আগে, এবার লেখাপড়া করে নেব!
তা লেখাপড়াই করে নেবেন।
বেশ, সেই কথাই রইল। এখন কী করতে হবে আমাদের?
উমিচাঁদ বললে–একটা খবর তোমাদের মুফত বলে দিই, এর জন্যে তোমাদের টাকাকড়ি কিছু দিতে হবে না। আমার কাছে মুর্শিদাবাদ থেকে এখুনি একটা চর এসে একটা খবর দিয়ে গেছে।
কী খবর?
উমিচাঁদ দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললে–নবাব মির্জা মহম্মদ মুর্শিদাবাদ থেকে রওনা হয়েছে তোমাদের সঙ্গে লড়াই করবার জন্যে!
সেকী? আমরা তো কিছু খবর পাইনি?
উমিচাঁদ বললে–তোমরাই যদি খবর পাবে সাহেব, তা হলে আমি কী করতে হালসিবাগানে বসে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছি।
নবাব বেরিয়ে পড়েছে?
হ্যাঁ সাহেব, হ্যাঁ।
আপনি ঠিক বলছেন? আপনি ঠিক জানেন?
এ তো ছোট তুচ্ছ খবর সাহেব। এ-খবর তোমাদের মুফত দিয়ে দিলুম। এর জন্যে একটা দামড়িও নেবে না উমিচাঁদ। উমিচাঁদ মাছি মেরে হাত নষ্ট করে না সাহেব!
একটু থেমে আবার বললে–তবে আরও শোনো,নবাবের সঙ্গে আছে চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার, ষাট হাজার পায়দল ফৌজ, পঞ্চাশটা হাতি আর তিরিশটা কামান–ভয় হচ্ছে?
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন রবার্টের দিকে চাইলে।
আর তোমাদের?
অ্যাডমিরাল বললে–আমাদের আছে গোরা পল্টন সাতশো এগারোজন, গোলন্দাজ একসোজন, নেটিভ সেপাই প্রায় তেরোশো
উমিচাঁদ জিজ্ঞেস করলে আর কামান? কামান ক’টা আছে?
অ্যাডমিরাল বললে–তিন সেরি গোলা ছোড়বার মতো কামান আছে চোদ্দোটা।
উমিচাঁদ হেসে উঠল। বললে–তোমাদের তো সাহস কম নয় হে! মোটে এইকটা মাল নিয়ে তোমরা নবাবের সঙ্গে লড়বার জন্যে পাঁয়তাড়া কষছ?
ক্লাইভ বললে–পারি না-পারি সে আপনার দেখবার দরকার নেই, কিন্তু আপনি বলুন আমাদের কতটা হেলপ করতে পারবেন!
আমি?
উমিচাঁদ সাহেব সেই একই রকম রহস্যময় হাসি হাসতে লাগল।
বললে–হেলপ আমি করব, কিন্তু তার আগে তোমাদের একটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ?
তোমাদের একটা ফারসি-জানা মুনশি রাখতে হবে।
মুনশি তো আমাদের আছে।
উমিচাঁদ বললে–তাকে দিয়ে চলবে না। অন্য মুনশি রাখতে হবে। সে আমাদের লোক। মুর্শিদাবাদ থেকে যে-সব চিঠি আসবে সে-সব চিঠি যাকে-তাকে দিয়ে পড়ালে চলবে না। বাইরের লোক জেনে ফেলবে। আমাদের নিজেদের জানাশোনা মুনশিকে দিয়ে পড়াতে হবে।
তা তাই করব। সে-মুনশিকে কোথায় পাব?
আমি তাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেব।
কে সে?
সে একজন গরিব ছোকরা। বেচারি চাকরি খুঁজছে অনেক দিন ধরে। আমার কাছেও এসেছিল চাকরির খোঁজে। আমি কিছু করতে পারিনি। কিন্তু ছেলেটা বিশ্বাসী। প্রাণ গেলেও ছেলেটা ভেতরের কথা কাউকে ফাস করবে না।
তা বেশ তো৷ তাকেই রাখব। কত মাইনে নেবে?
তিন টাকা, চার টাকা, পাঁচ টাকা যা দেবে তাতেই সে খুশি থাকবে।
কী নাম তার?
নবকৃষ্ণ।
নামটা শুনে রেখেছিল ক্লাইভ! কোথাকার কোন নবকৃষ্ণ, ছেলেটা কেমন কাজ করবে কে জানে। তবু কথাটা মনে লেগেছিল। মন্দ বলেনি উমিচাঁদ। ইন্ডিয়াতে এসে ব্যাবসা করতে গেলে ইন্ডিয়ানদের হেলপ নিতেই হবে। ইন্ডিয়ানদেরই এজেন্ট বানাতে হবে। সেই এজেন্টদের দিয়েই ইন্ডিয়াকে হাত করতে হবে।
হঠাৎ নিজের ক্যাম্পের সামনে আসতেই হরিচরণকে দেখে ঘোড়া থামিয়ে দিলে ক্লাইভ সাহেব।
কী হরিচরণ? হোয়াট নিউজ? কী খবর?
হরিচরণ যা-কিছু ঘটেছিল সব বলতেই মাথায় রক্ত উঠে গেল ক্লাইভের। বললে–কোথায় গেল স্পাইটা?
তাকে পল্টনরা ছাউনিতে ধরে নিয়ে গেছে হুজুর
ক্লাইভ ঘোড়া থেকে আর নামল না। সোজা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ছাউনির দিকে ছুটে চলল। লড়াই যদি শেষপর্যন্ত করতেই হয় তো ধীরে-সুস্থে করলে চলবে না। নবাব মুর্শিদাবাদ থেকে আর্মি নিয়ে কলকাতার দিকে আসছে, এখন তো আর সময় নষ্ট করলে চলে না। অ্যাডমিরাল চলে গেছে কেল্লার দিকে তোড়জোড় করতে। এদিকে বরানগরের ক্যাম্পেও তোড়জোড় শুরু করতে হবে।
হরিচরণ পেছন থেকে বললে–রান্না হয়ে গেছে হুজুর খেয়ে যান
দুর, খাওয়ার কথা এখন ভাবলে চলে! আগে খাওয়া না আগে লাইফ। লাইফ আর ডেথের প্রশ্ন এখন। এখন কি খাওয়ার কথা ভাবলে চলে!
*
মতিঝিলের আম-দরবার তখন জমজমাট হয়ে উঠেছে। নানিবেগমের সঙ্গে মরিয়ম বেগমসাহেবা গিয়ে সেইখানেই হাজির হল।
চবুতরার ওপর তাঞ্জামটা গিয়ে থামতেই নেয়ামত খবর পেয়েছে।
সামনে এসে সেলাম করে দাঁড়াল নেয়ামত। বললে–বন্দেগি বেগমসাহেবা
নবাব কী করছে নেয়ামত?
নেয়ামত বললে–দরবার খতম করে কলকাতায় লড়াই করবার হুকুম জারি করে দিয়েছে জাঁহাপনা
এখন কে কে আছে মতিঝিলে?
কেউ নেই বেগমসাহেবা। জগৎশেঠজি ছিলেন, তিনিও ভি চলে গেছেন। মানিকচাঁদজি, মিরজাফরজি, মোহনলালজি, মিরমদনজি, মেহেদি নেসার সাহেব, ইয়ারজান সাহেব, সবাই চলে গেছেন বেগমসাহেবা। জাঁহাপনা ভি মুস্তায়েদ হচ্ছেন
