দুর্গার ভয়-ভয় করতে লাগল।
কিন্তু ছোট বউরানি সোজা এগিয়ে এল দরবার খাঁ’র দিকে।
এবার বাঁ হাতের পাতাটা দেখি মা তোমার?
বলে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলে ছোট বউরানির দিকে। ছোট বউরানিও নিজের বাঁ হাতটা দিলে দরবার খাঁ’র দিকে। খুব মন দিয়ে কী যেন দেখতে লাগল দরবার খাঁ।
বললে–সামনে বড় বাধা আছে মা তোমার জীবনে, খুব সাবধানে থাকবে।
কীসের বাধা? আমার নিজের ঘরে ফিরে যেতে পারব তো? আমাদের বড় কষ্ট হচ্ছে বাবা। অনেক দিন ধরে ঘরে ফেরবার চেষ্টা করছি, কিছুতেই পারছিনে।
তোমাদের ঘর কোথায় মা?
হাতিয়াগড়ে!
হাতিয়াগড়ে? হাতিয়াগড়ে তোমাদের যদি ঘর তো এখানে কেমন করে এলে? এখানে কে নিয়ে এল?
দুর্গা বললে–ওই ফিরিঙ্গি সাহেব আমাদের।
ফিরিঙ্গি সাহেব? ওই গোরা পল্টনদের সাহেব? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছি। ফ্লেচ্ছসংস্পর্শ করাচ্ছে রাহু। রাহু সরলে তো মুক্তি নেই মা তোমার!
রাহু? কিন্তু আমরা তো সাহেবের ছোঁয়া খাইনে। আমি নিজেই তো রান্নাবাড়া করি।
দরবার খাঁ বললে–এখনও সংসর্গ পুরোপুরি হয়নি, কিন্তু এবার আর এড়াতে পারবে না মা।
তা হলে কি জাত যাবে আমাদের?
জাত যাবে কেন? বৃহস্পতি আছে কী করতে? রাহুর পরেই বৃহস্পতি আসছে। তিনিই বাঁচিয়ে দেনে। কিন্তু রাহু তার ঝাট যা-দেবার তা তো দেবেই, তা তো এড়াতে পারবে না মা!
ছোট বউরানির মুখখানা কালো হয়ে উঠল।
বললে–তা হলে কী উপায়?
উপায় আছে বই কী মা! একটা উপায় আছে।
বলে দরবার খাঁ নিজের কমণ্ডলুর ভেতর থেকে একটা হরতুকি বার করলে।
বললে–তোমার সোয়ামির নাম কী মা?
ছোট বউরানি’একটু বিব্রত হয়ে পড়ল।
দুর্গা রেগে গেল। বললে–তোমার তো আক্কেল খুব বাবা! সোয়ামির নাম কী করে করবে মেয়ে। ইস্ত্রি হয়ে কী সোয়ামির নাম কেউ করে? তুমি কী রকম বোস্টম শুনি?
দরবার খাঁ প্রায় বেসামাল হয়ে পড়েছিল। বললে–আমাদের ধর্মে কিছু আটকায় না মা, আমারও তো বোষ্টুমি আছে, সে তো আমার নাম ধরে ডাকে।
তা আমরা তো বোস্টম নই!
তবে তোমরা কী মা?
কিন্তু তার উত্তর দেওয়া আর হল না। ওদিক থেকে ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে দু’জন পল্টন আসছিল, তাদের দেখেই দুর্গা আর ছোট বউরানি ভেতরে চলে গেল।
এই ভাগো ভাগো ইধার সে, ভাগ যাও
দরবার খাঁ ভয় পেয়ে গেল। বললে–কেন বাবা, আমি তোমাদের কী ক্ষতি করেছি?
নেহি, হুকুম নেহি ইধার ঘুসনে কা। ই কোম্পানিকো পল্টনকা ক্যাম্প হ্যায়।
আমি তো গরিব বোস্টম বাবা, আমি তো লড়াই করতে আসিনি। দুটো সেবা নিতে এসেছিলুম।
হঠাৎ তখন ওদিক থেকে হরিচরণ এসে পড়েছে। হরিচরণ পল্টনের লোক। কিন্তু সাহেব তাকে দুর্গাদের সেবার কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। সে তখন ছাউনি থেকে বরাদ্দ চাল-ডাল আনতে গিয়েছিল। বাড়ির সামনে এসে এই হইচই কাণ্ড দেখে অবাক। একটুখানি বাইরে গিয়েছে, আর তার মধ্যে এত কাণ্ড ঘটে গিয়েছে!
এ কে? কী হয়েছে?
গোরা পল্টন দু’জন ততক্ষণে দরবার খাঁ-কে ধরে ফেলেছে। দরবার খাঁ বললে–আমাকে ছেড়ে দাও বাবা, আমি জানতুম না এ কোম্পানির পল্টনদের ছাউনি। আমি সেবা নিতে এসেছি।
দাঁড়াও, তোমার সেবা নেওয়া দেখাচ্ছি।
আর একজন পল্টন বললে–এ শালা স্পাই আছে, বি কেয়ারফুল কাপড়ের ভেতরে আর্মস থাকতে পারে ।
সঙ্গে সঙ্গে গায়ের গেরুয়া আলখাল্লাটা টান দিতেই কোমরের ভেতর থেকে চকচকে ছোরা একখানা খসে পড়েছে মাটিতে। ছোরাখানা দেখেই হরিচরণ কুড়িয়ে নিলে। কী সর্বনেশে কাণ্ড! এরই মধ্যে এত!
গোরা পল্টন দুটো দরবার খাঁ’র হাত দুখানা পিছোঁড়া করে বেঁধে ফেললে। তারপর হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেল নিজেদের ছাউনির দিকে। কলকাতার কেল্লার মতো বরানগরেও ছোটখাটো পল্টন ছাউনি।
হরিচরণ দৌড়াতে দৌড়োতে ভেতরে ঢুকল।
ও দিদি, দিদি
দুর্গ, ছোট বউরানি–দু’জনেই এতক্ষণ সব শুনছিল ভেতর থেকে। হরিচরণ যেতেই দুর্গা বললেও কে হরিচরণ? কী করতে এসেছিল?
হরিচরণ বললেনবাবের চর গো দিদি কোম্পানির ছাউনির হাঁড়ির খবর নিতে এইছিল—
নবাবের চর কথাটা শুনে ছোট বউরানি ভয়ে চমকে উঠল।
তোমাদের কী জিজ্ঞেস করছিল?
দুর্গা বললে–জিজ্ঞেস করছিল এর সোয়ামির নাম কী, কোথায় বিয়ে হয়েছে, এইসব
বলোনি তো কিছু তোমরা?
না হরিচরণ, আমরা আর একটু হলেই বলতে যাচ্ছিলুম! শুধু বলেছি হাতিয়াগড়ে এর শ্বশুরবাড়ি, আর কিছু বলিনি। কিছু বলবার আগেই গোরা পল্টন দু’জন যে এসে গেল, তা রক্ষে
ভাগ্যিস বলোনি, নইলে সব্বনাশ হত। আমি একটুখানি গিয়েছি ছাউনি থেকে তোমাদের চালডাল আনতে, আর এরই মধ্যে শয়তানটা এসে ঢুকে পড়েছে এখানে-সাহেব এসে সব জানতে পারলে খুব বকবে আমাকে দিদি।
হঠাৎ বাইরে ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ হতেই হরিচরণ অন্যমনস্ক হয়ে উঠল।
ওই আমার সাহেব আসছে দিদি। সাহেবের ঘোড়ার আওয়াজ আমি শুনলেই বুঝতে পারি। বলে দৌড়ে বাইরে গেল।
.
হরিচরণ সাহেবের মুখখানার দিকে চেয়ে দেখলে। সাহেবের মুখের চেহারা দেখেই হরিচরণ বুঝতে পারে সাহেবের মেজাজ। কেমন যেন রুক্ষ-রুক্ষ ভাব। সত্যিই ক্লাইভ সাহেবের রাগ হয়ে গিয়েছিল উমিচাঁদের কথা শুনে। উমিচাঁদ বলতে চেয়েছিল, টাকা দিলে নবাবের সঙ্গে লড়াই বাধিয়েও দিতে পারে, আবার মিটমাট করিয়ে দিতে পারে। লোকটা ট্রেটর! এই ট্রেটরদেরই ক্লাইভ টলারেট করতে পারে না। এরাই চিরকাল রবার্ট ক্লাইভদের এনিমি, আবার নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলাদেরও এনিমি। এরাই তাকে ইংলন্ড থেকে তাড়িয়ে ইন্ডিয়াতে পাঠিয়েছে। এরাই আবার কোম্পানিকেনবাবের সঙ্গে লড়াইতে নামিয়েছে। অথচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তো লড়াই করতে এখানে আসেনি।
