তা হলে আমি বরানগরেই যাব?
হ্যাঁ, ওখানে ক্লাইভ সাহেবের ছাউনি আছে, সেখানে গেলেই খবর পাবেন।
ছোটমশাই বললেন–তা হলে উঠি আমি মহারাজ
মহারাজ বললেন কিন্তু বিশ্রাম না করেই যাবেন? এক দিন এখেনে আরাম করে গেলে হত!
ছোটমশাই বললেন–বহুদিন থেকেই আমার বিশ্রাম ঘুঁটে গেছে মহারাজ। মাথার ওপর যতদিন বাবামশাই ছিলেন, ভাবনা ছিল না। তখন দিনকালও ছিল অন্যরকম। এখন কী যে হয়েছে, সব দিক থেকেই অশান্তি–
তারপর একটু থেমে বললেন–কিছু মনে করবেন না, আমি উঠি
তা হলে পালকিটা নিয়ে যান।
হ্যাঁ, ওরা তো ওখানে বসে রয়েছে, আমি লোকজনদের বসিয়ে রেখে দিয়ে এসেছি। বলে প্রণাম করে চলে গেলেন।
খানিক পরেই দেওয়ান কালীকৃষ্ণ ঘরে ঢুকেছেন। ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেছেন। মহারাজ, মহারাজ কোথায় গেলেন! পাশের ঘরে গেলেন, সেখানে গোপাল ভাঁড় মশাই একধারে বসে ছিলেন। আর কেউ নেই।
কোথায়? মহারাজ কোথায় গেলেন?
পাশের ঘরেই তো আছেন, দেখুন!
ভেতরে খবর পাঠালেন। জরুরি খবর এসেছে, মহারাজকে জানাতে হবে। খবর পেয়ে মহারাজ ভেতর থেকে এলেন-কী হল? কীসের জরুরি খবর দেওয়ানমশাই?
দেওয়ানমশাই বললেন–এখুনি মুর্শিদাবাদ থেকে খবর পাঠিয়েছিলেন আমাদের উকিলবাবু, নবাব কলকাতায় যাচ্ছেন লড়াই করতে।
নবাব যাচ্ছেন লড়াই করতে? কেন, ফিরিঙ্গিরা কি কিছু বাড়াবাড়ি করেছে?
তা জানি না। এই খবরটা পেয়েই আমাদের জানিয়েছেন। আর কিছু জানাননি।
মহারাজ বললেন–এখুনি যে ছোটমশাই কলকাতায় রওনা হয়ে গেলেন, দেখুন তো বজরা ছেড়ে দিয়েছে কিনা! ঘাটে গিয়ে একবার খবর নিতে বলুন তো শিগগির, শিগগির করুন।
সিংহমশাই আর দাঁড়ালেন না। সোজা কাছারির দিকে লোকের উদ্দেশে বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু ঘাটে গিয়ে যখন লোক পৌঁছুল তখন ছোটমশাইয়ের বজরা ছেড়ে দিয়েছে। নদীর এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো পর্যন্ত লক্ষ করেও তাঁর বজরার কোনও নিশানা পাওয়া গেল না।
*
বরানগরের ক্লাইভ সাহেবের ছাউনির সামনে গিয়ে দরবার খাঁ মিষ্টি গলায় সুর করে বলে উঠল–জয় রাধে কৃষ্ণ শ্রীরাধে
বাড়ির চালে একটা লাউগাছের ডগা লকলক করে লতিয়ে উঠেছে। বেলা পড়ো-পড়ো।
দরবার খাঁ-কে আর চেনবার উপায় নেই। ডান হাতে হরিনামের মালা, গলায় কঞ্চি, পরনে গেরুয়া কাপড়।
হালসিবাগান থেকে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে বরানগরে এসে ঠিক আস্তানা খুঁজে বার করেছে।
জয় রাধে কৃষ্ণ, শ্রীরাধে। দুটি সেবা পাই মা!
ভেতর থেকে দুর্গা কথাটা শুনতে পেয়েছিল। ছোট বউরানির কানেও কথাটা গিয়েছিল। দুর্গা বললে–আবার কোন আবাগির বেটা জ্বালাতে এল।
ছোট বউরানি বললে–বোষ্টমবাউল কেউ হবে বোধহয়, দেখব?
না গো, তোমায় দেখতে হবে না। আমি দেখছি!
বাইরে তখন দরবার খাঁ আবার একবার মিহি সুরে বলে–জয় রাধে কৃষ্ণ, দুটো সেবা পাই মা
আর থাকতে পারলে না দুর্গা। হরিচরণটাও কোথায় এই সময়ে কাজে গেছে। দুর্গা নিজেই বাইরে বেরিয়ে এল। এক মুখ দাড়িগোঁফ বোস্টমটার। কোন দলের কে জানে! কর্তাভজা, না বলরামভজা, না সাহেবধনি কে জানে।
বললে–এখানে কিছু হবে না বাছা, এ গেরস্তবাড়ি নয়
বলে ভেতরেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ বোস্টমটা বলে উঠল–তোর সামনে খুব বিপদ আসছে মা, ভারী বিপদ। একটু সাবধানে থাকিস!
বিপদের কথা শুনেই দুর্গা থমকে দাঁড়াল। ভাল করে চেয়ে দেখলে বোস্টমবাবাজির দিকে। এও কি বুজরুক নাকি!
কীসের বিপদ?
দরবার খাঁ বললে–একটু দাঁড়া না মা, দেখি তোর কপালটা ভাল করে দেখি! আমার দিকে চা, ভাল করে চা
দুর্গার কেমন সন্দেহ হল। বোস্টমরা তো এমন করে কথা বলে না। আবার ভাল করে চেয়ে দেখলে।
বললে–তুমি কোন দলের বোস্টম বাছা? সাহেবধনি, না কর্তাভজা?
দরবার খাঁ বললে–রাগ কোরো না মা, আমি গরিব বোস্টম, আমার আবার দল কী? আমি
শ্রীরাধার সেবা করে দিন কাটাই।
বলে সেইখানেই বসে পড়ল। বললে–একটু তেষ্টার জল দেবে মা?
দুর্গা বললে–এ তো গেরস্তবাড়ি নয় বাছা, এখানে কিছু সেবা হবে না
দরবার খাঁ বললে–শ্রীরাধার নাম করে যখন চাইছি মা, তখন আর ফিরে যেতে বোলোনা। তোমার ভাল হবে, তোমার মেয়েরও ভাল হবে!
মেয়ে!
হ্যাঁ মা, তোমার মেয়েরও ভাল হবে। তোমার মেয়ের সব দুঃখু ঘুচে যাবে। তোমার মেয়ের কপালে এবার থেকে সুখ আসছে!
দুর্গার কেমন সন্দেহ হতে লাগল। এ-ও আর-এক বুজরুক নাকি!
বলি তুমি বাটি চালতে পারো? আমার জামাই কোথায় আছে বলতে পারো?
দরবার খাঁ বললে–পারব না কেন মা? কিন্তু তোমার মেয়ের কপালটা একবার দেখতে হবে। কপাল দেখব, হাতের পাতা দেখব। ভূত-ভবিষ্যৎ কি অত সহজে বলা যায় মা! তোমার মেয়েকে একবার ডাকো না দেখি!
দুর্গা কী করবে বুঝতে পারলে না। হরিচরণটাও নেই, ফিরিঙ্গি সাহেবটাও নেই। কাকেই বা জিজ্ঞেস করে। আশেপাশে তো সবই জঙ্গল। জঙ্গলের ওপাশে গোরা পল্টনদের ছাউনি। ডাকলে তারা এখনই এসে পড়বে হুড়মুড় করে। কোম্পানির রাজত্বের মধ্যে বসে কেমন যেন ভয়-ভয় করতে লাগল দুর্গার। হাতিয়াগড় হলে এখুনি হাঁকডাক করলে পাইক-পেয়াদারা হইহই করে এসে পড়ত।
ভেতর থেকে ছোট বউরানি হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছে।
দুর্গা দেখতে পেয়েই বললে–তুমি আবার কেন বাইরে এসেছ বউরানি?
ভেতর থেকে আমি সব শুনিচি যে
দরবার খাঁ বললে–খুব ভাগ্যবতী মা, খুব ভাগ্যবতী তোমার মেয়ে দেখি মা, তোমার কপালটা ভাল করে দেখি।
