কী রকম?
আপনি শুনেছেন বোধহয় সব! আমার স্ত্রীকে নবাবের লোক চুরি করে চেহেল সুতুনে রেখেছে।
কিন্তু আপনি তো আপনার পত্নীর বদলে অন্য একটি মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন চেহেল্-সুতুনে।
সে তো পাঠিয়েছিলুম, কিন্তু এবার আপনার কাছে পাঠাবার সময় যে সব গোলমাল হয়ে গেল। কী করে জানব বলুন যে, ফিরিঙ্গিরা ঠিক এই সময়েই আবার ফিরে আসবে, আর কলকাতা দখল করে নেবে; নবাবের ফৌজের সঙ্গে পল্টনদের লড়াই হবে। যারা বজরার সঙ্গে ছিল তারা এসে বললে, বোম্বেটে ডাকাতরা বজরা নিয়ে পালিয়ে গেছে–তারা কোনওরকমে হাতিয়াগড়ে ফিরে এসেছে
মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন আর আপনার শ্রীনাথ, মাঝির সর্দার?
সে কি আর বেঁচে আছে? তাকে বোধহয় নবাবের লোকরা ঠেঙিয়ে নদীর জলে ডুবিয়ে দিয়েছে।
তারপর?
ছোটমশাই বললেন–তারপর আপনার চিঠি পেয়েই আমি মুর্শিদাবাদে জগৎশেঠজির হাবেলিতে গেলাম। গিয়ে শুনি সব অদ্ভুত কাণ্ড। আমার গৃহিণীকে কলমা পড়িয়ে মুসলমান করে নাম বদলিয়ে দিয়ে চেহেল সুতুনে রেখে দিয়েছে। এখন নাম হয়েছে মরিয়ম বেগম। সেই আমার গৃহিণীর ওপর নাকি নবাবের ওমরাও সফিউল্লা খা অত্যাচার করতে গিয়েছিল। তাতে তাকে খুন করে ফেলেছে সে।
সে তো সব শুনেছি আমি। মরিয়ম বেগম কি আপনারই গৃহিণী?
ছোটমশাই বললেন–এসব কি আমিই জানতুম? আমাকে জগৎশেঠজি সব বললেন যে। সেই খুনের অপরাধে তো আমার গৃহিণীর ফাঁসি হয়ে যাবার কথা। আমি জগৎশেঠজির কাছ থেকে পনেরো হাজার আসরফি হাওলাত নিয়ে তবে কাজিসাহেবকে ঘুষ দিয়ে তাকে ছাড়াই
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কথাগুলো শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বললেন–এ তো আমি জানতুম না তারপর? তারপর এখন কী অবস্থা?
এখন নবাব তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে চেহেলসূতুনে তুলেছেন। তারপর ভগবান যা করেন। আমি এইটুকু দেখে আপনার কাছে ছুটে এসেছি, আপনি পরামর্শ দিন এখন কী করব?
মহারাজ খানিকক্ষণ ভাবলেন।
তারপর বললেন–আপনি জগৎশেঠজির কাছে আর যাননি?
গিয়েছিলুম। তিনি নিজেও এখন অপমানের ভয়ে চুপ করে আছেন। একবার নবাবের হাতে চড় খেয়েছেন সকলের সামনে। সে-অপমান এখনও ভুলতে পারেননি। আমি তো সেই জমায়েতের সময় ছিলাম, যখন জগৎশেঠজির বাড়িতে মিরজাফর আলি সাহেব এসেছিলেন, ওয়াটসন সাহেব এসেছিলেন, মেহেদি নেসার সাহেব ছিলেন, তখন থেকেই তো চেষ্টা চলছে আমার; কিন্তু দেখছি আপনি ছাড়া কিছু হবে না। আপনি নিজে একটু চেষ্টাচরিত্র করুন, নইলে কিছুই হবে না।
মহারাজ বললেন–আমি তো আমার দেওয়ানকে পাঠিয়েছিলাম। বলে পাঠিয়েছিলাম যে, নবাবের মিরবকশিকে যদি দলে টানা যায় তবেই আমাদের সব চেষ্টা সার্থক হবে। মিরবকশি যদি নবাবের দলে থাকে, তা হলে কিছুই হবে না
ছোটমশাই বললেন–শুনছি তো মিরজাফর সাহেবও নবাবের ওপর খাপ্পা হয়ে উঠেছে নাকি!
তা তো উঠেছে। সে আমিও জানি। কিন্তু কেন হয়েছে তা ঠিক জানি না।
ওই যে মিরজাফর আলি সাহেব কলকাতার উমিচাঁদ সাহেবের সঙ্গে জোট বেঁধে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে–এইরকম খবর নবাবকে কে নাকি দিয়েছে।
মহারাজ বললেন–সে-খবর আমার কানেও গেছে!
না, শুধু খবর নয়, নবাবের হাতে উমিচাঁদের লেখা চিঠিও নাকি পৌঁছে গেছে। এর পর কী হবে তা বুঝতে পারছি না। ওসব খবর নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই, এখন আমি নিজের ব্যাপারে কী করব তাই ভাবছি, সেই জন্যেই আপনার কাছে পরামর্শ করতে এলুম
মহারাজ বললেন–এখন একমাত্র উপায় ইংরেজরা
তাদের সঙ্গে তো আর দেখা হচ্ছে না। আর তাদের কাউকে আমি চিনিও না। তারাও আমাকে চেনে । একবার তারা নবাবের সঙ্গে লড়াইতে হেরে গেছে, তারা তো ভয়ে নবাবকে চটাতেই চাইবে না। কলকাতায় তারা উপোস করছে এখন, কেউ তাদের চাল-ডাল-তেল-নুন বেচছে না। এ সময়ে কি তারা লড়াই করতে সাহস করবে?
মহারাজ বললেন–লড়াই না করেও তো নবাবকে জব্দ করা যায়।
কী রকম?
মহারাজ বললেন–সে-সব কথা আপনার জানবার দরকার নেই আপনি এক কাজ করুন—
কী কাজ?
আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি ফিরিঙ্গি কর্নেলের কাছে, আপনি সেখানা নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করুন। গিয়ে।
কে সে?
তার নাম কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ।
সে আবার কোন সাহেব?
মহারাজ বললেন–সে এক নতুন কম্যান্ডার এসেছে মাদ্রাজ থেকে। লোকটা ভাল। এরই মধ্যে বেশ মেলামেশা করে নিয়েছে বাঙালিদের সঙ্গে, চাষাভুষোদের সঙ্গে মিশে তাদের অনেক ভাষা শিখে নিয়েছে। আমি এবার যখন কালিঘাটে গিয়েছিলুম, ঠাকুর দেখার নাম করে তার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। উমিচাঁদ সাহেবের সঙ্গে খুব ভাব তার। খুব আঁদরেল লোক, নবাবকে উচ্ছেদ করবেই। আমি যা বলবার তা বলেছি, দেশের গরিব বড়লোক কেউ নবাবকে চায় না। এখন আপনিও গিয়ে দেখা করে বলে আসুন। বলনে, দরকার হলে আমরা টাকা দিয়ে, লোকজন দিয়ে, সবকিছু দিয়ে তাদের পেছনে আছি
ছোটমশাই বললেন কলকাতার কোথায় থাকে তারা?
আপনি কখনও যাননি কলকাতায়?
ছোটমশাই বললেন– না।
দলবল নিয়ে পল্টনরা থাকে কেল্লায়, আর ক্লাইভ থাকে বরানগরে।
ছোটমশাই বললেন–তা আমি তো উমিচাঁদ সাহেবের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি!
খবরদার, খবরদার! মহারাজ সাবধান করে দিলেন–খবরদার, ও-লোকটা একটা কাঁকড়াবিছে ও নবাবের দলেও আছে, আমাদের দলেও আছে। আপনি ওর ছায়া মাড়াবেন না
