জিজ্ঞেস করলেন–চাকরি আমি তোমায় দিতে পারি, কিন্তু তোমার মতো লোককে কী কাজ দেব বলো তো?
আজ্ঞে, যে কাজ দেবেন সেই কাজই করব! জমিদারি সেরেস্তার কাজকর্মও করতে পারি।
গোপাল ভাঁড় মশাই বসে ছিলেন সেখানে। বলেছিলেন–আমি যে-গল্পগুলো বলি সেগুলো লেখার কাজ তো এঁকে দিতে পারেন মহারাজ। তা হলে আমি অমর হয়ে থাকতুম!
মহারাজ বলেছিলেন–তোমার ভাঁড়ামি যদি লোকের মুখে মুখে ফেরে তা হলেই তুমি অমর হয়ে যাবে গোপাল, কিন্তু লিখলে আমার বদনাম হবে–
কেন মহারাজ?
লোকে ভাববে, দেশের যখন দুর্দিন তখন রাজসভায় বসে বসে মহারাজ কেবল ফষ্টিনষ্টিই করে গেছেন! আমি যে দেশের কথা ভাবি, সেকথা কেউই বুঝবে না।
গোপাল ভাড় মশাই বলেছিল–না, তা ভাববে না মহারাজ; ভাববে, মহারাজ রাজকার্যে এতই। বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন যে, দুশ্চিন্তা ভোলবার জন্যে গোপাল ভাঁড়কে বাড়িতে পুষে রেখেছিলেন!
মহারাজ খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন–তুমি তো বেশ বলেছ গোপাল, খাসা বলেছ। কিন্তু বিদ্বানকে বিদ্যাচর্চার সুযোগ না দিয়ে বসিয়ে রাখলে লোকেও যে আমাকে নিন্দে করবে।
তারপর ভারতচন্দ্রের দিকে চেয়ে বলেছিলেন–তুমি নিজেই বলল, তুমি কী করতে চাও
ভারতচন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন আজ্ঞে আমি মহারাজের অনুচর, আপনি যা আদেশ করবেন তাই-ই করব
সেই তখনই শুরু হয়েছিল অন্নদামঙ্গলকাব্য রচনার সূত্রপাত।
তারপর থেকে অনেক বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে নবাব সরকার থেকে খাজনা আদায়ের হুমকি এসেছে। অনেকবার দেওয়ান কালীকৃষ্ণ সিংহকে যেতে হয়েছে নবাব নিজামতে। বারবার দরবার করতে হয়েছে নবাবের আমদরবারে। কোনও ফল হয়নি। মহারাজকে নিজেকে গিয়েও জগৎশেঠ মহতাপজির সঙ্গে সলা-পরামর্শ করতে হয়েছে। তাতেও ফল হয়নি। অনেক রকম ষড়যন্ত্র হয়েছে নবাবকে নিয়ে। কতবার ভেবেছেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেখেছেন আস্তে আস্তে নিজামতের জলুস বেড়েই চলেছে। সন-পিছু ৮,৩৫,৯৫২ টাকা রাজস্ব দিলে রাজ্য চলবে কেমন করে সেটা কেউ দেখে না। দেখেছেন মিরজাফর আলি সাহেবও খুশি নয়, জগৎশেঠজিও খুশি নয়, মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা খাঁ, কেউই খুশি নয়। নিজামতের প্রত্যেকটা আমিন কর্মচারী থেকে শুরু করে আমির-ওমরাওরা পর্যন্ত সবাই যেন নিজামতের সর্বনাশ চায়। এমন অবস্থা আগে কখনও ছিল না। আগে কখনও এমন করে নবাবকে অভিশাপ দিত না সবাই। নবাবের অবশ্য টাকার দরকার। বর্গিদের হাঙ্গামার পর থেকেই টাকার টানাটানিটা যেন দিন দিন বেড়ে চলেছে। আর তারপর ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে যখন ঝগড়া বাধতে শুরু হল তখন থেকে নিজামতের খাই যেন আরও বেড়ে যেতে লাগল। শেষকালে যখন আরও অসহ্য হয়ে উঠল তখন মহারাজ দেখলেন, তাঁর দলে আরও অনেকে আছেন। শুধু তিনিই নন, শুধু জগৎশেঠই নন, কিংবা শুধু মিরজাফর, মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা খাই নন, ফিরিঙ্গি কোম্পানিও আছে, আর আছে হাতিয়াগড়ের রাজা হিরণ্যনারায়ণ রায়। বেচারির অনেক বয়েস কম। কোনওদিন কোনওরকমে কোনওভাবেই হাতিয়াগড়ের রাজা নিজের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে অন্যায় পস্থা গ্রহণ করেননি। নিজের কোনও সন্তান নেই, কিন্তু দুটি সতীসাধ্বী স্ত্রী নিয়ে সুখে ঘরকরনাই করতে চেয়েছেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রেরও যেমন দুটি স্ত্রী, হিরণ্যনারায়ণেরও তেমনি দুটি। তবুনবাবের দৃষ্টির শনি সেখানেও পড়েছে। নিজের গোমস্তা সরখেলমশাইকে অনেকবার পাঠিয়েছেন হাতিয়াগড়ে খবর আদানপ্রদানের জন্যে। অন্তত কিছুটাও যদি সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত বোধহয় তা-ও পারা গেল না। দ্বিতীয়পক্ষের পত্নীকে মহারাজ নিজের প্রাসাদে আশ্রয় দেবেন কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও হয়তো শনির দৃষ্টি পড়ল।
পাশের ঘরেই হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইকে বসানো হয়েছিল। মহারাজকে খবর দিয়ে দেওয়ান কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই এসে হাজির হলেন। বললেন–কী সংবাদ ছোটমশাই? মুর্শিদাবাদের কিছু সংবাদ পেলেন?
ছোটমশাই বললেন–পেলাম। কিন্তু মহারাজা কোথায়?
তিনি আসছেন, খবর পাঠিয়েছি। আমাদের এদিকেও খুব গণ্ডগোল চলছে, মহারাজার মন ভাল নেই–
কেন?
নিজামতের খাই বাড়ছে দিন দিন। নবাবের পাওনা বেড়েই চলেছে সন-সন। এবার চিঠি এসেছে ৮,৩৫,৯৫২ টাকা দিতে হবে। এত টাকা কোত্থেকে আসে?
আমারও তো তাই হয়েছে। আমাকেও ১,১৭,০০০ দিতে হুকুম হয়েছে। কিন্তু এত টাকার দরকারই বা হচ্ছে কেন নিজামতের?
আমি তো সেই কথা জানতে গিয়েছিলুম নিজামতকাছারিতে। তহশিলদার বললে–দিল্লির বাদশার কাছ থেকে হুকুমত এসেছে।
ছোটমশাই বললেন–সব বাজে কথা।
বাজে কথাই তো। আমি কিছু জানি না ভেবেছে ওরা? দিল্লির বাদশার কাছারিতে আমিও তো যাতায়াত করি। তারা বলে, বাংলাদেশ থেকে আলিবর্দি খাঁ শুধু একবার খাজনা পাঠিয়েছিলেন, তার পর আর কেউই পাঠায়নি। মুর্শিদকুলি খাঁ’র সময় থেকে কেউই খাজনা পাঠায়নি। যে যখন প্রথম নবাব হয় তখনই মাত্র একবার খাজনা পাঠায় বাদশার কাছে, তারপর আর পাঠায় না
হঠাৎ মহারাজ ঘরে ঢুকলেন। ছোটমশাই উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করলেন তাকে। কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই ভেতরে চলে গেলেন।
আপনার গৃহিণীর কোনও সংবাদ পেলেন ছোটমশাই?
পেলাম মহারাজ, কিন্তু না পেলেই হয়তো ভাল হত।
