যখন আদুরি ছিল, যখন বউ ছিল, তখন শোভারামের এমন দুরবস্থা ছিল না। তখন গায়ের জোর ছিল। তখন শোভারাম বড়মশাইয়ের কোরফা-প্রজা ছিল। কিন্তু তাও সময়মতো খাজনা দিতে না-পারায় ইস্তফাপত্র দিয়ে আসতে হল সেরেস্তায়। টাকায় তিন-চার গুণ চালের দর। খাজনা দেব কী দিয়ে। তারপর একদিন কেঁদে গিয়ে পড়ল বড়মশাইয়ের কাছে। বড়মশাইয়ের মান ছিল খাতির ছিল। প্রজাদের ওপর দয়া-মায়া ছিল। বড়মশাই বললেন–কোরফা ইস্তফা দিয়ে তুমি খাবে কী শোভারাম?
শোভারাম হাত-জোড় করে বড়মশাইয়ের পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বলেছিল–হুজুরই আমার মা বাপ, হুজুরের পায়ের তলাতেই পড়ে থাকব–
কাজকর্ম কী জানো?
হুজুর যে-কাজ বলবেন তাই পারব!
তা পাইকের কাজ পারবে?
শোভারাম বলেছিল–আজ্ঞে বয়েস হয়েছে, এখন কি আর তেমন দৌড়ঝাঁপ করতে পারব?
বড়মশাই বলেছিলেন–আগের দিন হলে তোমার খাজনা মকুব করতে পারতাম শোভারাম, এখন নবাব-সরকার থেকে রোজই চিঠি আসছে মাথট দাও, মাথট না দিলে জমিদারি থাকবে না, পাটোয়ারি আর কানুনগোদের যা অত্যাচার–
বহুদিনের লোক শোভারাম। গড়বন্দি যখন মজবুত ছিল তখন থেকেই শোভারাম আছে হুজুরের কাছে। বাড়ির ভেতরে রানিমাদের কাছেও যাবার অধিকার আছে শোভারামের। কতবার রানিমার কাছে গিয়ে হাত-জোড় করে খাজনা মকুব করে এসেছে। সে মা-রানি আর নেই। এখন আর কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে।
বড়মশাই বলেছিলেন–তোমায় চাকরান জমি দেব, এখন থেকে তুমি আমার ঘরের কাজই করবে, বুড়ো বয়সে তোমার আর মেহনত করতে হবে না–
বড়মশাইয়ের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে গিয়ে সেদিন কেঁদে ফেলেছিল শোভারাম। সে বড়মশাই এখন আর নেই। শেষ জীবনে তীর্থে চলে গিয়েছিলেন। যাবার সময় হাতিয়াগড়ের কাউকে আর অসন্তুষ্ট রেখে যাননি। বড়মশাইয়ের তীর্থে যাবার কথাটা রটে যেতেই সবাই এসে হাজির। যার যা চাইবার চেয়ে নিয়ে গেল। বড়মশাই সামনে বসে থাকতেন নামাবলি গায়ে দিয়ে। পাশে জগা খাজাঞ্চিবাবু টাকার থলি নিয়ে বসে আছে।
কী রে, কী চাই তোর?
মাধব ঢালি মাথায় তেলকুচকুচে চুল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। নিচু হয়ে প্রণাম করল। বললে–কিছু চাইনে আজ্ঞে, বড়মশাইকে পেন্নাম করতে এসেছি–
ডাকাতি করছিস কেমন?
মাধব ঢালি লজ্জায় মাথা নিচু করল। বললে–হুজুর, ডাকাতি করবার কি আর জো আছে—
কেন, কী হল আবার?
আজ্ঞে, ডাকাতদের ধরে ধরে একেবারে আস্ত কোতল করছে, গোবিন্দপুরে আমাদের আর ঢোকবার সাহসবল নেই–
কেন, গোবিন্দপুরের হোগলাবনেই তো তোদের আড্ডা ছিল। কারা কোতল করছে?
হুজুর ফিরিঙ্গি কোম্পানি! ও-দিকটায় বন কেটে শহর করতে লেগেছে সব, আমাদের অন্ন গেল আজ্ঞে–
বড়মশাই জগা খাজাঞ্চির দিকে চেয়ে বললেন–জগা, মাধব ঢালিকে পাঁচটা মোহর আর পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে দাও তো
প্রণাম করে চলে যাচ্ছিল মাধব ঢালি। বড়মশাই বললেন–দেখিস মাধব, আমি কাশী চলে যাচ্ছি, ছোটমশাই রইল তোদের, তোদের হাতেই ছেড়ে দিয়ে গেলাম–
তারপর এল বিশু পরামানিক।
বিশু পরামানিককে কিছু বলতেই হল না। বড়মশাই বললেন–জগা, বিশুর নামে বিলের ধারের দু’বিঘে চাকরান জমি লিখে দাও তো, ওর বাপ আমাদের কামিয়েছে, ছেলেকে রেখে গেলাম রে, দেখিস তোরা, বুঝলি–
বিশু পরামানিক চলে গেল।
তারপর এল শোভারাম।
বড়মশাই বললেন–তোর কী চাই রে শোভারাম?
আজ্ঞে চাইনে কিছু!
বড়মশাই হাসলেন। বললেন–বউ মরে গেছে বলে তুই বিবাগী হয়ে যাবি নাকি? তোর মেয়ে মরালী রয়েছে না? তার বিয়ে দিতে হবে না? কত বয়েস হল মেয়ের?
আজ্ঞে, এই গেল চোত-কিস্তির সময়ে সাত বছরে পা দিয়েছে।
তা হলে? আর দেরি কেন? বিয়ে দিয়ে ফেল? মেয়ে দেখতে কেমন হয়েছে?
আজ্ঞে, বাপ হয়ে আর কোন মুখে বলব?
জগা খাজাঞ্চিবাবু পাশ থেকে বললে–আমি দেখেছি বড়মশাই, খুব সুন্দরী
তবে তো আর ঘরে রাখা ঠিক নয় রে। এখন নবাবি আমল, এ আমলে টাকাই বলো আর মেয়েমানুষই বলো, লুকিয়ে রাখতে না পারলেই সব বেহাত হয়ে যাবে, তুই বিয়ে দিয়ে ফেল–
শোভারাম বলেছিল–বিয়ে দিতে পারলে আমিও বাঁচি হুজুর, ভালমতন একটা পাত্তোর যে পাচ্ছিনে–
তা তোর যেমন অবস্থা তেমনই ঘরে দে, রাজা-মহারাজা খুঁজলে চলবে কেন?
শোভারাম বলেছিল-হুজুর, মেয়ের আমার খুব বুদ্ধি, একটা ভাল বুদ্ধিমান পাত্তোর পেলেই দু’হাত এক করে দেব–
কী নাম রেখেছিস মেয়ের?
ছোটমশাই নাম রেখেছেন মরালী। মরালীবালা।
বড়মশাই বলেছিলেন–মা-মরা মেয়ের অত নামের বাহার তো ভাল নয় রে, ওতে যে মেয়ের অকল্যণ হয়। ওকে মরুনি বলে ডাকিস, তাতে মেয়ে বেঁচে থাকবে, মেয়ের পরমাই বাড়বে—
.
তা সেই মেয়েরই আজ বিয়ে। বড়মশাই বেঁচে থাকলে আজ আনন্দ করতেন খুব। তীর্থ করতে তিনি সেই যে কাশীধামে চলে গেলেন তারপর বেশিদিন বাঁচলেন না আর। আর চিরকাল কে আর বেঁচে থাকতে এসেছে সংসারে। শোভারামও একদিন চলে যাবে। মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দিলেই তার কাজ শেষ। তারপর ঝাড়া হাত-পা। কারও আর পরোয়া করবার দরকার নেই।
শোভারামের সেই বিয়েবাড়ির হুজুগের মধ্যেই সেইসব দিনের কথা মনে পড়তে লাগল।
যাবার সাতদিন আগে থেকে হাতিয়াগড়ের হাটের আটচালার নীচে জগা খাজাঞ্চিবাবু থলি-ভরতি টাকাকড়ি নিয়ে বসে থাকত।
চিৎকার করে বলত–হুজুরের কাছে কার কী পাওনা আছে, বলো গো তোমরা–
