কিন্তু তা হলে আমি থাকব কী নিয়ে?
আগে বেঁচে থাকো কিনা তাই দেখো, তারপর সুখশান্তি, সংসারের কথা ভেবো। আমি কদিন ধরে একদণ্ডের জন্যে ঘুমোতে পারিনি, তা জানো? আমি শুধু একটা সফিউল্লা খা-কে খুন করেছি। পারলে ওই সবক’টাকে খুন করতুম! ওই উমিচাঁদ, মেহেদি নেসার, মিরজাফর খাঁ, সকলকে খুন করতুম। শুধু তো নবাবকে খুন করতে চায় না ওরা, ওরা সমস্ত বাঙালি জাতকে খুন করে ফেলতে চায়।
তারপর বললে–এসব তুমি বুঝবেনা, তুমি এবার যাও, এখুনি হয়তো কেউ তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবার জন্যে আসবে–আমি নানিবেগমের সঙ্গে মতিঝিলে যাব নবাবের সঙ্গে দেখা করতে
কেন?
সেখানে রাজা মানিকচাঁদ এসে আবার কী মতলব দিচ্ছে কে জানে। আমি পাশে থাকলে নবাবকে সাবধান করে দিতে পারব। আজকে অনেক কষ্টে নানিবেগমের হাত থেকে তোমাকে বাঁচিয়েছি, এর পর হয়তো আর তোমাকে লুকিয়ে আসতে হবে না, তখন সোজা পাঞ্জা দেখিয়ে চলে আসতে পারবে
কী করে?
তা হলে আমি তোমাকে যা বলব তাই করতে হবে। দরকার হলে যাকে খুন করতে বলব তাকে খুনও করতে হবে, পারবে তা করতে?
তারপর হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল।
বেগমসাহেবা।
বরকত আলি একটা বোরখা নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। বললে–পালকি তৈরি।
মরালী কান্তকে বললে–বোরখাটা পরে নাও, ওর সঙ্গে বাইরে চলে যাও, আমি না ডাকলে আর কখনও এসো না
কবে ডাকবে তুমি?
যখন ডাকব তখন জানতে পারবে, এখন যাও, দেরি কোরো না
কান্ত বরকত আলির হাত থেকে বোরখাটা নিয়ে পরে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এ আবার কোন ষড়যন্ত্রের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল সে। কান্তর মনে হল যেন আরও জটিল জালে সে আটকে গেল মরালীর জীবনের সঙ্গে। হয়তো ভালই হল। তবু তো এই সূত্র ধরে সে মরালীর সঙ্গে দেখা করতে পারবে! মরালীর কাছে আসতে পারবে।
পালকিটা চেহেল্-সুতুনের সুড়ঙ্গ পেরিয়ে যখন ফটকের কাছে এসেছে, তখন বরকত আলির গলা শোনা গেল। ফটক খোলার হুকুম। ফটকটা খুলতেই পালকিটা বেরিয়ে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে ফটক বন্ধ করার শব্দ হল।
আর ওদিকে মরিয়ম বেগমের ঘরের ভেতর নানিবেগমসাহেবা এসে বললে–চল মেয়ে, চল তৈরি?
হ্যাঁ নানিজি।
বাছাকে একদিনের জন্যে আমি চেহেল্-সুতুনে আনতে পারলুম না। চল, তুই একটু বুঝিয়ে বলুবি, চল মা। তোর কথা শোনার পর থেকে আমার বড় ভয় করছে মা
মরালী বললে–ভয় কীসের নানিজি,আমি তো রয়েছি।
নানিবেগম বললে–কিন্তু যদি আবার ওরা মির্জাকে লড়াই করতে টেনে নিয়ে যায়?
মরালী বললে–তুমি কিছু ভেবো না নানিজি, যদি যান তো আমি সঙ্গে থাকব বলতে বলতে চবুতরের তাঞ্জামে গিয়ে উঠতেই তাঞ্জাম ছেড়ে দিল।
*
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তখন নদীয়ার একছত্ৰাধিপতি। নদীয়ার রাজস্ব আদায় তখন ন’লক্ষ টাকার মতন। কিন্তু তার মধ্যে ৮,৩৫,৯৫২ টাকা রাজস্ব দিতে হত নবাব সরকারের খাজাঞ্চিখানায়। কদিন থেকে মহারাজ বড় ব্যস্ত ছিলেন। এতগুলো টাকা জলে চলে যায়, অথচ খরচ অনেক। সারা বাংলাদেশ থেকে পণ্ডিতেরা আসে, নৈয়ায়িকা আসে, জমিদাররা আসে। তাদের দেখাশোনা করার একটা খরচ আছে। বাড়িতে বাঁধা পণ্ডিত আছেন কালিদাস সিদ্ধান্তমশাই। তিনি মহারাজকে সংস্কৃত শাস্ত্র শেখান। বিশ্রাম খাঁ কালোয়াতের কাছে গানবাজনা শেখেন। মুজাফার হুসেনের কাছে অস্ত্রশস্ত্র চালাতে শেখেন। এদের সকলের খাওয়া-পরা-থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে, জমির ইজারা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া আছে। পণ্ডিত-বিদায়।
পণ্ডিতই কি একজন! রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় যেমন ছিলেন ক্ষপণক, ধন্বন্তরী, অমরসিংহ, শম্বুক, বেতালভট্ট, ঘটকৰ্পর, কালিদাস, বরাহমিহির আর বররুচি, তেমনই মহারাজার সভাতেও ছিল হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত, রামচন্দ্র বিদ্যানিধি, কৃষ্ণানন্দ বাচস্পতি, বীরেশ্বর ন্যায়পঞ্চানন, ষড়দর্শনবেত্তা শিরাম বাচস্পতি, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, গুপ্তিপাড়ার বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার, ত্রিবেণীর জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন, হালিশহরের রামপ্রসাদ সেন।
দেওয়ানজির খাতায় সকলের নাম-ধাম কুলজি লেখা থাকত। মাসে মাসে সবাই মহারাজার দরবারে এসে শাস্ত্র আলোচনা করতেন আর মাসিক বৃত্তি নিয়ে যেতেন। কিন্তু যারা সবসময় কাছে থাকতেন তারা হলেন ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ, গোপাল ভাড়, মুক্তিরাম মুখোপাধ্যায় আর রামরুদ্র বিদ্যানিধি।
সেদিনও সকলকে নিয়ে বসেছিলেন।
দরবারি এসে জানাল-হাতিয়াগড় থেকে রাজা হিরণ্যনারায়ণ রায় এসেছেন—
কথাটা শুনেই মহারাজা উঠলেন। বললেন আপনারা বসুন, আমি আসছি–
যখন ভারতচন্দ্র কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে আসেন তখন আলিবর্দির আমল। ফরাসি গভর্নমেন্টের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণই তাঁর আলাপ করিয়ে দেন মহারাজার সঙ্গে। চারদিকে তখন অরাজক অবস্থা। ভারতচন্দ্র মন দিয়ে কেবল সংস্কৃত পড়নে। ভারতচন্দ্রের বাবা রাজেন্দ্রনারায়ণ বড় রাগ করতেন। বলতেন-সংস্কৃত পড়ে কী হবে শুনি? দিনকাল যা পড়েছে তাতে ও ভাষা শিখলে কে তোমায় খেতে দেবে? জমিদারি সেরেস্তায় যদি কাজকর্ম পেতে চাও তো ফরাসি পড়ো বাপ। তা ভাগ্যিস ফারসিটা পড়েছিলেন ভারতচন্দ্র। বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্রের মা যখন বাবার জমিদারি বাজেয়াপ্ত করলেন, তখন গাজিপুরে গিয়ে ফারসি পড়ে ফারসির পণ্ডিত হয়ে গেলেন। সেখানেই ইন্দ্রনারায়ণের বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে গেলেন। আর সেই সূত্রেই একেবারে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায়। এমন একজন সংস্কৃত-ফারসি জানা পণ্ডিত পেয়ে মহারাজা যেন হাতে চাঁদ পেলেন।
