তুমিই সেই?
এতক্ষণে মনে পড়ল যেন নানিবেগমের। বললে–ঠিক আছে, আমি ওকে বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু খবরদার বলছি মেয়ে, ওকে তুই আর কখনও চেহেল্-সুতুনের ভেতরে আনতে পারবিনে। আমি যা দেখতে পারিনে তাই হয়েছে–আমি গিয়ে বোরখা পাঠিয়ে দিচ্ছি, সেইটে পরে পালকি করে বাইরে চলে যাক ও
বলে নানিবেগম বাইরে বেরিয়ে গেল।
কান্তর মুখে এবার কথা ফুটল। বললে–আমি যাব না
না, তুমি যাও
তা হলে এই পালকিতে তুমিও চলো আমার সঙ্গে। কেউ জানতে পারবে না। তোমার পোশাকটা আমাকে দাও
মরালী বললে–আমার জন্যে তুমি কেন এত ভাবছ?
না, সত্যি বলছি, এক্ষুনি হয়তো কোনও খোঁজা বোরখা নিয়ে আসবে। তার আগেই তোমার ঘাগরা ওড়নি আমি পরে ফেলি, আর আমার পোশাকটা তুমি পরে নাও। তুমি বোরখা পরে চলে যাও আমার বদলে–
আর তুমি?
কান্ত বললে–আমার কথা ভেবো না তুমি। নজর মহম্মদ আমার চেনা লোক, আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেবে, মোহর পেলে সে সব করবে। তারপর আমি বাইরে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করব
বাইরে গিয়ে কোথায় যাব? কোথায় থাকব? হাতিয়াগড়ে তো যেতে পারব না।
কান্ত বললে–তুমি যেখানে বলবে সেখানে নিয়ে যাব তোমাকে। তোমাকে কোনও নিরাপদ জায়গায় রেখে দিয়ে আমি চলে যাব আমার কথা শোনো মরালী, আমাকে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দাও, বেশি দেরি কোরো না, এখনই কেউ এসে পড়বে, শিগগির করো!
মরালী বললে–পাগলামি কোরো না, সমস্ত বাংলাদেশে আগুন জ্বলে উঠবে, কোথাও নিয়ে গিয়ে তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে না, আর দুদিন পরেই দেখতে পাবে!
আগুন জ্বলবে? তার মানে?
মরালী বললে–সে তুমি এখন বুঝবে না।
আমি বাইরে থাকি, এত জায়গায় ঘুরি, আমি জানব না, আর তুমি চেহেল্-সুতুনের ভেতরে থেকে এত জানলে কী করে?
মরালী বললে–সব কথা বলবার সময় নেই এখন। এখানকার চেহেলসূতুনের অন্য বেগমরা কেউ সেসব জানে না, নানিবেগমও কিছু জানে না। শুধু আমি জানি। সফিউল্লা খাঁ সাহেবের কাছে যে-চিঠি পাওয়া গিয়েছে তা থেকে আমি সব জেনেছি। আমি যদি এ সময়ে চেহেসূতুনে না থাকি তো সমস্ত ছারখার হয়ে যাবে। মুর্শিদাবাদ ছারখার হবে, কেষ্টনগর ছারখার হবে, হাতিয়াগড়ও ছারখার হয়ে যাবে। আমি তো দূরের কথা, কেউই বাঁচব না, তুমিও বাঁচবে না সেই বিপদ থেকে।
কান্ত বললে–কী বলছ তুমি? আমি যে কিছু বুঝতে পারছি না
মরালী বললে–তোমাকে সব কথা এখন খুলে বলা যাবে না। নিজামতের এখন ভীষণ বিপদ চলছে। বাইরে থেকে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, কিন্তু আমি উমিচাঁদের চিঠি থেকে সব টের পেয়ে গিয়েছি–এই সময় যদি আমি এখান থেকে চলে যাই তো সব তছনছ হয়ে যাবে
কী হবে?
বলেছি তো, সব তোমাকে বলা যাবে না। হয়তো উমিচাঁদই মুর্শিদাবাদের নবাব হয়ে বসবে।
তাই নাকি?
মরালী বললে–শুধু উমিচাঁদ নয়, জগৎশেঠজিও নবাব হতে পারে। মহারাজ কেষ্টচন্দ্রও হতে পারে, সবাই ষড়যন্ত্রের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। মেহেদি নেসারও নবাব হবার চেষ্টা করছে। কর্নেল ক্লাইভ বলে কে একটা ফিরিঙ্গি আছে, সেও নবাব হতে পারে। হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইও এই দলের মধ্যে আছে
কান্ত শুনতে শুনতে অবাক হয়ে যাচ্ছিল।
মরালী আবার বলতে লাগল-মুর্শিদাবাদে এমন একজনও নেই, যে এর মধ্যে নেই। তারা সবাই লুঠপাট করে বড়লোক হতে চাইছে। যেমন করে হোক, নবাবকে হটিয়ে দিয়ে সব টাকা-কড়ি-মোহর লুটেপুটে নিতে চাইছে
তারপর একটু থেমে বললে–তা এসব কথা তোমাকে বলছিই বা কেন? তুমিই বা কী করতে পারবে? যদি পারতে তো তোমাকে একটা কাজ করতে বলতুম–
কী কাজ বলো না, তুমি বললে–আমি সবকিছু করতে পারব।
তা হলে তুমি বাইরে যেখানে যা কিছু শুনবে, আমাকে বলে দিয়ো এসে, আমিনবাবকে বলে দেব।
কান্ত বললে–আমি এখেনে কী করে আসব?
সে আমি নজর মহম্মদের সঙ্গে ব্যবস্থা করব। কেউ জানতে পারবে না। জানো, নবাবকে এই অবস্থায় ছেড়ে চলে যেতে আমার কেমন লাগছে।
কান্ত জিজ্ঞেস করলে সত্যিই নবাব ভাল লোক বলে তুমি মনে করো?
মরালী বললে–নবাব ভাল হোক মন্দ হোক, নবাবের জায়গায় যে-ই আসুক, সে-ই এইরকম করবে। উমিচাঁদ নবাব হলে কি আর ভাবছ পরের বউকে ধরে টানাটানি করবেনা? রাতারাতি সাধু হয়ে যাবে?
দেখো মরালী, একটা কথা–কান্ত বললে–আমাদের সারাফত আলি আছে, যার বাড়িতে আমি থাকি, সেই বুড়ো মিঞাসাহেব আমাকে এত টাকা দেয়, আমার জন্যে এত খরচ করে শুধু চেহেল্-সুতুন ধ্বংস করবার জন্যে।
মরালী বললে–আমি জানি। আমি এখানে এসে পর্যন্ত দেখছি, কেউ নিজামতের ভাল চায় না। নবাবের মা পর্যন্ত নবাবকে গালাগালি দেয় তার নিজের সোরার কারবার বন্ধ হয়ে গেছে বলে। টাকার জন্যে নিজের ছেলের পর্যন্ত শত্রু হয়ে গেছে, ভাবতে পারো?
কিন্তু তুমি যে নবাবকে এত ভালবাসো, নবাব তোমার জন্যে কী করবে?
মরালী বললে–আমার আবার কী করবে? আমি এখন আর আমার নিজের জন্যে কিছুই চাই না
তোমার নিজের সুখ, তোমার নিজের শান্তি, তোমার নিজের সংসার
মরালী বললে–সংসারের কথা, সুখের কথা, শান্তির কথা আমাকে আর বোলো না। যেদিন থেকে মরিয়ম বেগম হয়ে গেছি সেইদিন থেকেই আমার সব সুখ, সব শান্তি ঘুচে গেছে–
কান্ত বললে–না, ওকথা তুমি বোলো না! আমি তোমাকে শাস্তি দেব!
তোমার সাধ্যি কী আমাকে শাস্তি দাও, আকাশের ভগবানেরও আমাকে শাস্তি দেবার ক্ষমতা নেই।
