মরালী বড় ব্যস্ত হয়ে উঠল–এ গোঁয়ার লোককে নিয়ে তো খুব মুশকিলেই পড়লুম; বলছি যে তোমার সর্বনাশ হবে, কথা শোনো, শিগগির লুকিয়ে পড়ো
কান্ত বললে—না
ওরে ও মেয়ে, দরজা খোল, মির্জা চেহেল্-সুতুন থেকে চলে গেছে, আমি যাচ্ছি মতিঝিলে–
মরালী আর পারলে না। কান্তকে ধরে সোজা সিন্দুকের পেছনে নিয়ে গেল। তারপর সেখানে তাকে তার ঘাড় গুঁজিয়ে বসিয়ে দিয়ে বললে–লক্ষ্মীটি, এখানে চুপ করে বসে থাকো, নানিবেগম চলে গেলে তারপর উঠে এসো; তোমার পায়ে ধরছি, উঠো না এখান থেকে। তোমাকে দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার
তারপর দরজাটা খুলে দিয়ে বললে–কী নানিজি?
নানিবেগমের মুখখানা কাঁদোকাঁদো হয়ে গেছে। বললে–ওরে, আমার মির্জা মতিঝিলে চলে গেছে রে, আমি ওদিকে বাবুর্চিখানায় খানার বন্দোবস্ত দেখতে গেছি, আর এদিকে মির্জা কখন মতিঝিলে চলে গেছে টেরই পাইনি, পিরালি খাঁ হঠাৎ এসে এখন আমায় খবর দিলে?
তা হলে কী হবে নানিজি?
আমি তো তাই মতিঝিলে যাচ্ছি। শুনলাম নাকি রাজা মানিকষ্টাদ এসেছে জরুরি খবর নিয়ে! ফিরিঙ্গি কোম্পানি নাকি লড়াই শুরু করেছে কলকাতায়। এই কাল সবে লড়াই থেকে মির্জা ফিরে এল। সোজা তো পূর্ণিয়া থেকে কলকাতায় চলেই যাচ্ছিল, আমিই বলে কয়ে মুর্শিদাবাদে আনিয়েছিলাম। কখন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছি আর সঙ্গে সঙ্গে কখন মতিঝিলে চলে গেছে।
আমিও তোমার সঙ্গে মতিঝিলে যাব নানিজি?
যাবি তুই? তা হলে তো ভালই হয়, তা হলে তো আমি বেঁচেই যাই! আমি একলাই যাচ্ছিলুম, আমার সঙ্গে কেউ যেতে চাইলে না, তাই তোর কাছে এলুম। এখন যাবি তো চল
মরালী বললে–তুমি চলো, আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি
নানিবেগমসাহেব আর দাঁড়াল না। তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গেল। মরালী সিন্দুকটার কাছে গিয়ে বললে–এসো, বেরিয়ে এসো
কান্ত আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এল।
মরালী বললে–এবার বাইরে চলে যাও
কান্ত বললেন, আমি যাব না কিন্তু নানিবেগম যদি এসে তোমায় দেখে ফেলে তা হলে কিন্তু তোমায় আমি বাঁচাতে পারব না—
কান্ত বললে–আমি বাঁচতে চাইও না
বাঁচতে চাও না বলে কি এইরকম করে খোঁজার হাতে কোতল হবে?
কান্ত বললে–আমি তোমাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে চাই–তুমি না গেলে আমি যাব না।
মরালী বললে–কিন্তু এখন তো আর আমার যাওয়া চলে না
কেন?
আমার অনেক কাজ আছে, এখানে নবাবের বিরুদ্ধে অনেকে ষড়যন্ত্র করছে, আমি তাদের সকলের কথা টের পেয়েছি, তাদের ধরিয়ে দিতে হবে। সেকাজ শেষ না-হলে আমার যাওয়া হবে না।
তা হলে নবাবের স্বার্থই তোমার কাছে বড় হল? যেনবাব তোমার ওপর অত্যাচার করে তারই ভাল করতে চাও তুমি? যে-নবাবের ধ্বংস চায় সবাই তারই জন্যে তুমি এখানে থাকতে চাও? তুমি কি মনে করো সত্যিই তুমি নবাবকে বাঁচাতে পারবে?
মরালী রেগে উঠল।
বললে–তুমি যেনবাবের নামে এত কথা বলছ, তুমি নবাবকে চেনো? তুমি নবাবের সঙ্গে কথা বলেছ কখনও?
হঠাৎ দরজা খুলে যেতেই নানিবেগম ঘরে ঢুকে পড়েছে। কী যেন বলতে চেয়েছিল নানিবেগম। কিন্তু কান্তকে দেখেই থমকে দাঁড়াল।
বললে–এ কে?
নানিবেগম কান্তর দিকে তাকাল। কান্ত মরালীর দিকে তাকাল। মরালী নানিবেগমের দিকে চেয়ে কী যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল।
নানিবেগম মরালীর দিকে চেয়ে আবার জিজ্ঞেস করলে–এ কে?
মরালী এগিয়ে এসে বললে–নানিজি, এ আমার চেনা লোক, আমাদের দেশের
এখানে এর ভেতরে কে নিয়ে এল?
মরালী বললে–তুমি ওকে কিছু বলতে পারবেনা নানিজি, তোমার পায়ে পড়ি নানিজি, ওকে কিছু বোলো না তুমি। আমিই ওকে ডেকে নিয়ে এসেছি এখানে, আমারই কাজে ও এসেছে
কান্ত তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
মরালী বললে–আমি অনেকদিন আমার বাবার খবর পাইনি, তাই এর কাছেচকবাজারে খবর আনতে গিয়েছিলুম, এ আমার দেশ থেকে খবর এনে দেবে বলেছিল। তুমি ওকে কিছু বোলোনা নানিজি।
কিন্তু ওকে কে নিয়ে এল এখেনে?
তাও তুমি জানতে চেয়ো না।
নানিবেগম বললে–না, তুই বল আমাকে, কে নিয়ে এল ওকে এখনো কী করে নিয়ে এল? এত খোঁজা রয়েছে, এত পাহারাদার, খিদমদগার রয়েছে, তারা মোটা মোটা তলব নিচ্ছে কী জন্যে? আমি তাদের একজনকে এখনই ডাকছি…
বলে বাইরেই চলে যাচ্ছিল নানিবেগম, কিন্তু মরালী নানিবেগমের হাতটা ধরে ফেললে। বললে—না নানিজি, তুমি যেতে পারবে না–
তা হলে বল আর কখনও ভেতরে নিয়ে আসবি না বাইরের লোককে?
মরালী বললে–নিয়ে আসব না
তা হলে এখুনি ওকে বাইরে পাঠিয়ে দে! এখুনি বাইরে পাঠিয়ে দে–আমি ডাকছি পিরালিকে
মরালী বললে–না নানিজি, পিরালিকে ডাকতে হবে না তোমাকে, আমিই সব ব্যবস্থা করব। যে নিয়ে এসেছিল ওকে, সে-ই ওকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে আসবে
নানিবেগম এবার কান্তর দিকে ফিরে বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবার বাবা কেমন আছে, তুমি জানো কিছু?
কান্ত বললে–এখন তবিয়তটা কিছু খারাপ আছে বিবিজির বাবার
কী হয়েছে?
মাথাটা একটু খারাপ হয়ে গেছে। বিবিজিকে দেখবার জন্যে ছটফট করছে দিনরাত। রানিবিবি চেহেল্-সুতুনে আসবার পর থেকেই ওইরকম হয়েছে, মেয়েকে কেবল দেখতে চাইছে ।
মরালী বললে–এ না থাকলে আমাকে কোতোয়ালির মধ্যে মেহেদি নেসার সাহেব খুন করেই ফেলত নানিজি,এ না থাকলে সেইদিনই মারা যেতুম। সেই জন্যেই তো নবাব একে সেদিন খালাস করে দেবার হুকুম দিলেন নানিজি!
