কান্ত বললে–আমার কথা থাক এখন
কেন, তোমার কথা থাক কেন? তুমি কেন এই নরকের মধ্যে এলে?
কান্ত বললে–তোমার সঙ্গে অনেক কথা ছিল। কথাগুলো না বলতে পারলে আমার স্বস্তি হচ্ছিল না
কিন্তু আজ যে নবাব চেহেল্-সুতুনে রয়েছে। এখন কি আসতে আছে?
কান্ত বললে–নবাব তো চলে গেছে চেহেল সুতুন থেকে চলে গেছে
চলে গেছে মানে?
নবাব থাকলে কি আসতুম?
কী যা-তা বলছ? আমার চেয়ে তুমি বেশি জানো?
কান্ত বললে–আমাকে নজর মহম্মদ যে বললে। নজর মহম্মদ আজ সারাফত আলির দোকানে আরক কিনতে গিয়েছিল। তখন আমি আসতে চেয়েছিলুম চেহেল্-সুতুনে। কিন্তু ও বললে, নবাব আছে, আজ হবে না। আমি তো তাই হাল ছেড়ে দিয়েছিলুম। কিন্তু এক্ষুনি দৌড়োত দৌড়োত গিয়ে আমাকে খবর দিয়ে নিয়ে এল। বললে, নবাব নাকি হঠাৎ চেহে সুতুন ছেড়ে মতিঝিলে চলে গেছে
কেন?
কলকাতা থেকে রাজা মানিকচাঁদ এসেছে নবাবের সঙ্গে সলাপরামর্শ করতে, কলকাতায় ফিরিঙ্গি কোম্পানিরা লড়াই শুরু করে দিয়েছে!
মরালীর মাথায় যেন চেহেল্-সুতুনের ছাদটা ভেঙে পড়ল।
বললে–তুমি ঠিক বলছ?
আমাকে নজর মহম্মদ যা বললে–তাই-ই বলছি, আমি কী করে এত সব জানব বলো। আমার তো আবার বাইরে যাবার কথা ছিল কিনা নিজামতির কাজে
মুর্শিদাবাদের বাইরে? কী কাজে?
কত রকমের কাজ আছে, তার কি ঠিক আছে? তোমাকে যেমন হাতিয়াগড় থেকে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিলুম, এ-ও সেই রকম কাজ!
আবার কাউকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে আসবে নাকি?
না, তা নয়, এ অন্য রকমের কাজ। এসব কাজ সকলকে বলা নিয়ম নয়। আমাকে নিজামত থেকে কলকাতার উমিচাঁদের বাড়িতে গিয়ে একটা খবর আনতে যাবার হুকুম হয়েছে
মরালী কৌতূহলী হয়ে উঠল। বললে–কী খবর?
কান্ত বললে–সে-খবর তোমাকে বলা যাবে না। এসব ব্যাপার খুব গোপনীয়। আজকাল এমন সব কাণ্ড চলছে মুর্শিদাবাদে, যা কাওকে বলা যায় না। নবাবের বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র চলছে, আমরা খুব সাবধান হয়ে চারদিকে দেখাশোনা করছি
কীসের ষড়যন্ত্র?
কান্ত বললে–সে তোমার না-শোনাই ভাল। আর সে তোমাকে আমি বলবও না
মরালী কান্তর হাতখানা হঠাৎ ধরে ফেললে। বললে–না, তোমাকে বলতেই হবে। কে ষড়যন্ত্র করছে? কারা? খাজা হাদির নাম তুমি শুনেছ?
না।
করিম খাঁ?
কান্ত বললে–না। কিন্তু ওসব জেনে তোমার লাভ কী?নবাবকে কে মারল না-মারল, তা জেনে তোমার লাভ কী? তুমি চেহেল সুতুন থেকে বেরিয়ে চলো, তোমাকে আমি চেহেল সুতুন থেকে বার করে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে এসেছি। আমি নজর মহম্মদের সঙ্গে সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি যত টাকা লাগে, সব দেবে সারাফত আলি সাহেব
সারাফত আলি? যার আরকের দোকান আছে চকবাজারে? যার দোকানে আমি সেদিন তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম? সে কেন টাকা দেবে?
কান্ত বললে–সে বুড়ো আমাকে খুব ভালবাসে
তোমাকে ভালবাসে বলে আমাকে ছাড়াবার জন্যে টাকা দেবে কেন?
আমি যে তোমার কথা সূব বলেছি মরালী।
আমার কথা? আমার কথা কী বলেছ?
তোমার সঙ্গে আমার যা সম্পর্ক, সব কথা বলেছি।
মরালী আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল–তোমার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?
কান্ত হঠাৎ যেন বোবা হয়ে গেল।
বলো, কী সম্পর্ক তোমার সঙ্গে আমার থাকতে পারে, বলো?
কান্ত বললে–কেন, তোমার সঙ্গে কি আমার কোনও সম্পর্ক নেই?
সম্পর্কটা কীসের?
কান্ত বললে–আমার নিজের মুখ দিয়ে সেটা না-ই বা বলালে! তোমার কি কিছুই মনে নেই? একদিন তো তোমার সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক হত, যদি না
যদি না?
কান্ত বললে–সেকথা মনে পড়লেই আমার কষ্ট হয় মরালী! সে কথা আমি বারবার ভুলে থাকতেই তো চাই। কিন্তু ভুলতে পারি না যে মোটে! যখনই একলা থাকি তখনই মনে পড়ে যায়। সারাফত আলির দোকানের পেছনের অন্ধকার ঘুপচি ঘরের মধ্যে শুয়ে কেবল তোমার কথাই ভাবি! জানি, তোমার কথা ভাবা পাপ, তোমার কথা ভাবা অন্যায়; বুঝি, আজকে তোমার এই অবস্থার জন্যে আমিই দায়ী, কিন্তু কী করব বলো? একবার যে-দোষ করে ফেলেছি তার যে আর চারা নেই!
ওকী? অত কাছে সরে আসছ কেন?
আমাকে কি তুমি সত্যিই ক্ষমা করবে না?
মরালী বললে–ওকথা মুখে এনো না তুমি আর
তা হলে আমি কী নিয়ে থাকব? কী করে বাঁচব?
আমার কথা আর ভেবো না। জানো না আমি ম্লেচ্ছ হয়ে গেছি!
কান্ত আর থাকতে পারলে না। বললে–তা হোক, তবু তুমি আমার
ছিঃ। বলে মরালী কান্তর মুখখানা নিজের হাত দিয়ে চাপা দিয়ে দিলে। ওকথা যদি আর কখনও বলো তো তোমার সঙ্গে আর আমি দেখা করব না, আর কখনও আমি তোমাকে চেহেল্-সুতুনে আসতে দেব না নজর মহম্মদকে আমি বারণ করে দেব; শেষপর্যন্ত তাতেও যদি আসো তো আমি নানিবেগমকে বলে দেব–তুমি যাও এখন, যাও
হঠাৎ বাইরে দরজায় ধাক্কা পড়ল
ও মেয়ে, দরজা বন্ধ করলি কেন? কী হল?
মরালীর মুখখানা শুকিয়ে গেল।
ওই নানিবেগমসাহেবা এসেছে।
কে এসেছে?
মরালী বললে–চুপ। অত জোরে কথা বোলো না, নানিবেগমসাহেবা এসেছে। যাও, ওই সিন্দুকটার পেছনে লুকিয়ে পড়ো, শিগগির, দেরি কোরো না যাও যাও দাঁড়িয়ে দেখছ কী হাঁ করে? যাও, লুকিয়ে পড়ো
কান্ত বললে–দরকার নেই লুকিয়ে, দেখুক নানিবেগম।
কিন্তু দেখে ফেললে যে তোমার সর্বনাশ হবে, তোমাকে যে কোতল করবে।
কান্ত তবু ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। বললে–আমাকে কোতল করলে আমাকেই কোতল করবে, তোমাকে তো করবে না–আমার যা-হয় হয়ে যাক আজ, আমি আর পারছি না
