মরালী নানিবেগমের দিকে চেয়ে বললে–তুমি নিজে মেয়েমানুষ হয়ে আমাকে এই কথা জিজ্ঞেস করছ নানিজি? তুমি জানো না.মেয়েমানুষ কী চায়? তুমি জানো না মেয়েমানুষ কীসে খুশি হয়? তুমি নিজে মেয়েমানুষ হয়ে আমাকে এই কথা বলছ?
মরালীর কথা শুনে নানিবেগম কেমন হয়ে গেল যেন। আর যাওয়া হল না। বললে–না, তুই দেখছি ঠিক আমার লুৎফা মেয়ের মতো, কথায় কথায় কেঁদে ভাসিয়ে দিলে সংসার চলে? এ কি তোর। বাড়ি পেয়েছিস? এ কি তোর বাপের বাড়ি না শ্বশুরবাড়ি? তোদের মতন কাঁদতে পারলে আমি বেঁচে যেতুম তা জানিস? তোরা আমার দুঃখটা তো কখনও বুঝতে চেষ্টা করিস না। তোদের মতো আমারও। কি কান্না পায় না ভেবেছিস? আমার বুকটা হা-হা করে না মনে করেছিস? এই যে আজ চেহেল্-সুতুনে এতদিন আছি, আমার চোখে কেউ কান্না দেখেছে? কিন্তু কই, আমার তো কান্নার উপায় নেই। আমার নিজের পেটের মেয়েরা একটার পর একটা বিধবা হয়েছে, ঘসেটির মুখ পর্যন্ত আমার দেখবার হুকুম নেই, আর আজই ময়মানা আমার এখানে এসে উঠল! কই, আমার চোখ দিয়ে তো এক ফোঁটাও জল বেরোল না। তবে কি আমার চোখের ব জল শুকিয়ে গেছে?
মরালী তখন একদৃষ্টে নানিবেগমের দিকে চেয়ে আছে।
নানিবেগম বলতে লাগল–এই চেহেল্-সুতুনের ভেতরে যা ঘটতে দেখেছি, সব যদি ভাবতে বসি তো আত্মঘাতী হতে ইচ্ছে হবে, তাই তো কিছু আর ভাবি না মা। তাই তো কেবল কোরান নিয়ে দিনরাত থাকি, তাই তো সেইসব মনে পড়লেই খোদার নাম জপ করি আর নমাজ পড়ি। ওরে, এতদিন পাগল হয়ে যাইনি কেন, তা তো তোরা কেউ জিজ্ঞেস করিস না আমাকে? তুই তোর দুঃখের কথা বলছিস, কিন্তু আমারও তো দুঃখ থাকতে পারে, আমারও তো কষ্ট থাকতে পারে। তা তো কেউ জিজ্ঞেস করে না। সকলের নানিজি বলে কি আমি মানুষ নই বলতে চাস?
মরালী এবার নানিবেগমকে ছেড়ে দিলে।
বললে–তুমি যাও নানিজি, তোমাকে আমি আর আটকাব না, আমি সাজছি
নানিবেগম মরালীর চিবুকটা ধরে বললে–কিছু মনে করিসনে মা এত কথা বললুম বলে! এত কথা আমি বড় একটা বলি না। তুই কথা তুললি বলেই বলে ফেললুম! জীবনে আমি কিছুই পাইনি রে, তার তুলনায় তোরা অনেক কিছু পেইছিস আমার যখন বিয়ে হল আমিও অনেক জ্বালা সয়েছি, তখন একটা লোক পাইনি যার সঙ্গে দুটো কথা বলি, যার কাছ থেকে একটু আদর পাই। তোরা বাইরে থেকে এসেছিস, আমার দুঃখটা তোরা বুঝবিনে
মরালী বললে–না নানিজি, আমি আর তোমাকে এসব কথা বলব না–তুমি যাও, তোমাকে আর আটকে রাখব না–
তা হলে যা বললুম সেইসব কথা বলবি তো মির্জাকে?
সব বলব নানিজি!
কী বলবি?
বলব, ইয়ার বকশিদের কথায় জনাব যেন না ওঠেন বসেন। বলব, যার যা মান-মর্যাদা তাকে যেন তা দেন।
আরও বলবি, লোকে তাকে যে অত্যাচারী বলে সেটা মিথ্যে বলে না। তার মানে সারা মুর্শিদাবাদে তার যা কিছু কলঙ্ক সব তার ইয়ার বকশিদের জন্যে। আরও বলবি, এখন মির্জা বড় হয়েছে, এখন দেশের কথা তাকে ভাবতে হবে। ইয়ারবকশিদের কথা দেশের লোকের কথা নয়। এইসব কথা বলতে পারবি তো? বলতে পারবি তো যে, দেশের লোকেরা নবাবের নামে ছি ছি করে বেড়াচ্ছে, নবাবের নামে দোষ দিয়ে বেড়াচ্ছে, এটা মির্জার বোঝা উচিত! বলবি, নবাব আলিবর্দির নামে যেন মির্জা কলঙ্ক না লাগায়। নবাব আলিবর্দি খাঁ অনেক কষ্ট করে অনেক লড়াই করে অনেক তকলিফ করে এই মসনদ মজবুত করে রেখে দিয়ে গিয়েছিল। তার নাতি হয়ে মির্জা মসনদ যেন পরের হাতে তুলে না দেয়। বলতে পারবি তো মা এসব কথা? তোর বলতে সাহসে কুলোবে তো মা?
মরালী বললে–সাহস না থাকলে কি আমি সফিউল্লা খাঁ-কে খুন করতে পারি নানিজি?
তুই যদি বলতে পারিস মেয়ে তো তোকে আমি কী বলে যে আশীর্বাদ করব তা বলতে পারছি না। আমার এ অনেক সাধের চেহেল্ সুতুন রে। নবাব সুজাউদ্দিনের সময়কার এই সংসার, আমি কত কষ্টে একে বাগে এনেছি কী বলব! এককালে এই হারেমের মধ্যে মেয়েরা এসেছে আর শুকিয়ে মরে গেছে। এখন তো তোরা তবু লুকিয়েচুরিয়ে বাইরে যাস। আর আগে কত খোঁজার গর্দান গেছে সেই জন্যে! কত বেগম গলায় দড়ি দিয়েছে এর মধ্যে তার কি ইয়ত্তা আছে রে!
তারপর হঠাৎ যেন সচেতন হয়ে নানিবেগম বললে–তা হলে আমি আসছি, এতদিন পরে মির্জা এসেছে, আমার অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে, পিরালি খাঁ-কে বলে আসি বাবুর্চিখানায় কী বন্দোবস্ত হল! চলি মা তা হলে, আবার আসব পরে
বলে নানিবেগম চলে গেল।
মরালী আয়নাটা নিয়ে নিজের মুখখানা দেখলে একবার। তারপরেই কার পায়ের শব্দ হতেই পেছন ফিরে দেখে অবাক হয়ে গেছে মরালী।
একী, তুমি?
তাড়াতাড়িতে ভেতরে ঢুকে তখনও হাঁফাচ্ছে কান্ত। সে ভেতরে ঢুকেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
তুমি কেন আবার এলে এখানে? তুমি কি আবার বিপদে পড়তে চাও?
কান্ত বললে–নজর মহম্মদ আমাকে নিয়ে এসেছে,
কিন্তু আমি তো বলেছি, এখানে আসা ঠিক নয়। কেন এলে?
কান্ত বললে–শুনলুম আজকে নবাব চেহেল্-সুতুনে নিয়ে এসেছে তোমাকে, চকবাজারের রাস্তা দিয়ে তোমাদের তাঞ্জাম আসতে দেখলুম, তাই খুব ভয় হয়ে গেল
নবাব চেহেলসুতুনে এলে তোমার ভয়টা কীসের?
বলছ কী তুমি? ভয় হবে না? ভয় তো তোমার জন্যে!
মরালী বললে–আমার জন্যে শেষকালে তোমার নিজের জীবনটাও খোয়াবে নাকি?
