নানিবেগম একবার ময়মানা বেগমের ঘরে গিয়েছিল। ময়মানা তখনও চুপ করে বসে ছিল। তার মহলে কোনও ঘটা নেই, কোনও জাঁকজমক নেই। ছেলে শওকত জঙের সঙ্গে সঙ্গে যেন ময়মানার সব সাধ সব আকাঙ্ক্ষা খতম হয়ে গেছে।
কী রে ময়মানা? তোর মহলে আঁধিয়ার কেন রে? রোশনি জ্বালাবি না?
সেই যে ময়মানা এসেছে চেহেল্-সুতুনে, তারপর থেকে তার মুখে আর হাসি দেখেনি কেউ। সে চেহেল্-সুতুনের এক কোণে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।
সেখান থেকে নানিবেগম গেল লুৎফুন্নিসার মহলে।
কী রে, তুই এখনও সাজিসনি?
সাজব কেন নানিজি?
যদি মির্জা তোকে ডাকে আজ! সাজ সাজ, আর ওয়াকত নেই
বলে নানিবেগম তাড়াতাড়ি মরিয়ম বেগমের মহলে গিয়ে ঢুকল।
মরালী তখন তৈরি হয়েই ছিল। নানিবেগম ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল। নবাব মির্জা মহম্মদের কাছে মেয়ে যাবে এমনি করে? এই পোশাকে?
মরালী বললে–তা হোক নানিজি, তোমার নাতি আমার সঙ্গে শুধু তো কথাই বলবে, আর কিছু তো করবে না, গান গাইতেও বলবে না, নাচতেও বলবে না আর আমি তো ওসব জানিও না
কিন্তু আমার নাতি হলে কী হবে, সে তো মুর্শিদাবাদের নবাব।
মরালী বললে–না নানিজি, আমাকে তুমি আজকে সাজতে বোলোনা। অন্য সব বেগমরা সাজুক। তোমার নাতি তো কখনও চেহেল্-সুতুনে আসে না, এতদিন পরে এসেছে, তার জন্যে তো বাবুর্চিখানাতে অনেক এলাহি রান্না হচ্ছে, সে-গন্ধও পাচ্ছি। কিন্তু এখন কি মজলিস করবার সময়?
নানিবেগম হাসল।
ওরে,নবাবদের জীবনে কখনও ফুরসত হয় না। তোর নানাজির কি কখনও মজলিসকরবার ফুরসত হয়েছিল? তবু আমি সাজতুম। যখন লড়াই করতে যেত তোর নানাজি, তখন আমি কেন সঙ্গে যেতাম? ওই জন্যেই তো যেতাম। সব বেগমদেরও বেছে বেছে নিয়ে যেতাম। যারা গান গাইতে জানত, নাচতে জানত, তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতাম তো ওই জন্যেই। তবু যদি নবাব একটুখানির জন্যে শান্তি পায়, তবু যদি মুখে একটু হাসি ফোটে নবাবের
কথাটা যেন পছন্দ হল মরালীর।
বললে–আচ্ছা, নানিজি, এখন কি নবাবের কাছে কেউ আছে?
তা জানি না, মির্জা তোকে ডেকে পাঠাবে এখুনি, সেই জন্যেই তো তোকে তৈরি হয়ে থাকতে বলছি। মির্জার মেজাজ তো কারও বোঝবার সাধ্যি নেই। কখন যে কী মেজাজ থাকে ওর, কে বলতে পারে?
তারপর একটু থেমে বললে–তোকে একটা কথা বলছি মা, তুই মির্জাকে বলবি
কী বলব?
বলবি, ইয়ারবকশিদের কথা যেন কানে না শোনে মির্জা, ওরাই হয়েছে ওর কাল। জানিস, মির্জার সব ভাল, শুধু এই ইয়ারবকশিদের কথায় যদি না উঠতবসত তো ওরও ভাল হত, বাংলা মুলুকেরও ভাল হত
তা আমার কথা কেন শুনবে তোমার মির্জা, নানিজি! আমি কে?
নানিবেগম বললে–শুনবে রে শুনবে; ও আমার কথা শোনে না, ও ওর মার কথা শোনে না, ও ওর নিজের বউয়ের কথা পর্যন্ত শোনে না, কিন্তু তোর কথা শুনবে।
তুমি বলছ কী নানিজি! আমার কথা শুনবে?
হ্যাঁ, তুই যে ওর জান বাঁচিয়েছিস রে! তুই যদি আজ ওই খতনা দেখাতিস, তা হলে কি ও তোকে খালাস করত? দেখলি না তোকে নিয়ে মতিঝিলে গেল, তোর কথায় তোর পেয়ারের লোকটাকে বেমালুম খালাস করে দিলে। তোর কথায় মেহেদি নেসার, ইয়ারজানদের ডেকে পাঠালে? তুই ওই খত্ না দেখালে ও কি বিশ্বাস করত তোর কথা?
মরালী জিজ্ঞেস করলে–তা হলে কী বলব আমি নানিজি?
বলবি, নবাব, আপনি আপনার ওই ইয়ার বকশিদের কথায় আর উঠবেন বসবেন না। ওরাই আপনার শত্রু! আপনি বুটমুট মোহনলালকে মিরবকশি করে দিলেন বলে মিরজাফরজি আপনার শত্রু হয়ে গেল। বলবি, আপনি নানিজির পুরনো আমলের আমির-ওমরাওদের কেন অপমান করতে গেলেন? তাই তো তারা আপনার দুশমন হয়ে গেল। এসব বলতে পারবি না?
মরালী বললে–কিন্তু এসব কথা তো তুমিও বলতে পারো নানিজি!
নানিবেগম বললে–না রে না, আমি বললে–শোনে না, তোর কথা শুনবে।
আমার কথা শুনবে, আর তোমার কথা শুনবে না? নবারে কাছে তোমার চেয়ে আমিই বড় হলুম আজ?
নানিবেগম বললো রে মেয়ে, হ্যাঁ। এতদিন চেহেল্-সুতুনে আছি, আমি বুঝতে পারি কে কার কথা শোনে। আমি চোখ দেখলে যে বলে দিতে পারি!
মরালী কেমন অবাক হয়ে গেল।
বললে–তুমি ঠিক বলছ নানিজি, আমার কথা নবাব শুনবে?
হ্যাঁ রে মেয়ে, হ্যাঁ। তোকে মির্জার নজরে লেগেছে। যে তোকে একবার দেখবে তারই নজরে লাগবে! সাধে কি আব তোর গুণ গাইছি মা!
মরালী নানিজির হাত দুটো ধরে ফেললে। বললে–কেন নানিজি? কেন আমার ওপর লোকের নজর লাগে? কী জন্যে? আমার মধ্যে কী আছে?
নানিবেগম বললে–ছাড়, ছাড় আমাকে আমি আসছি, তুই তৈরি হয়ে নে
না, ছাড়ব না তোমাকে, তুমি আমাকে বলে যাও
কী বলব?
কেন আমাকে সকলের ভাল লাগে? আর, যদি আমাকে লোকের এত ভালই লাগে তা হলে আমার কপালে এত কষ্ট কেন? কেন আমি সুখী হতে পারলাম না জীবনে? আমি কী অপরাধ করেছিলুম?
নানিবেগম মরালীর মুখটা নিজের বুকের মধ্যে জাপটে ধরল।
ওমা, কাঁদছিস তুই? একেবারে কেঁদে ফেললি?
মরালী মুখটা তুলল। চোখ দুটো তার জলে ভরে গেছে। বললে–তুমি তো জানো নানিজি, এখানে আসা পর্যন্ত তুমি তো আমাকে দেখছ? আমি কারও কোনও ক্ষতি করেছি? কেন তোমরা জুবেদাকে অমন করে শাস্তি দিলে?ও কীকরেছিল? আর আমিই বাকী পাপকরেছি যে ভগবান আমাকে এই শাস্তি দিলে?
নানিবেগম মরালীকে সাত্বনা দিতে লাগল।
বললে–চুপ কর মা, চুপ কর। কাদিসনে। তোর কীসের কষ্ট? আমি তো আছি, তোর যখন যা কষ্ট হবে আমাকে বলবি তুই, আমি তার বিহিত করব! তোর খাবার কিছু কষ্ট হচ্ছে? তোর পরার কষ্ট হচ্ছে? তোর খেদমতের কষ্ট হচ্ছে?
