তারপর একটু গলাটা নিচু করে বললে–তোর কাছে যে-জন্যে এসেছি তাই বলি–উমিচাঁদ সাহেবের কাছে যেতে পারবি? কলকাতায়, হালসিবাগানে?
কেন?
মেহেদি নেসার সাহেব উমিচাঁদ সাহেবের কাছে আদমি পাঠিয়েছিল, সে এখনও ফিরে আসছে না। খবর মিলছে না কিছু। তুই যেতে পারবি?
কে সে? কোন লোক? কাকে পাঠিয়েছিল?
দরবার খাঁ, ফকির সেজে গিয়েছিল উমিচাঁদ সাহেবের কাছে।
কেন গিয়েছিল?
সে তোর জানবার দরকার কী? তুই শুধু জেনে আসবি দরবার খাঁ বলে কোনও লোক ফকিরের পোশাকে উমিচাঁদ সাহেবের হাবেলিতে ঢুকেছে কি না।
কান্ত বললে–সে আমাকে বলবে কেন?
তুই মেহেদি নেসার সাহেবের পাঞ্জা নিয়ে যাবি। তোর ডর কী? তুই উমিচাঁদ সাহেবকে মেহেদি নেসার সাহেবের পাঞ্জা দেখাবি, তা হলেই বলবে সব।
চলতে চলতে অনেক দূর চলে এসেছিল দু’জনে। নবাবের তাঞ্জামের জলুস তখন চেহেল্-সুতুনে ঢুকে পড়েছে। হাতির দল চেহেল্-সুতুন থেকে বেরিয়ে আবার মতিঝিলে চলে গেছে। রাস্তার ধারে সেই গণতকারটা একমনে কার হাত দেখছিল আর পাথরের ওপর কী ব লিখছিল।
কান্ত বললে–ওই দেখ, ওকে কাল আমার হাত দেখিয়েছিলুম রে—
বশির মিঞাও দেখলে। বললে–ওর কাছে গিয়েছিলি কেন?
মনটা খারাপ ছিল খুব। ভাবছিলাম জীবনে তো কিছুই হল না। কলকাতার সেই বেভারিজ সাহেবের গদিতে জীবন শুরু হয়েছিল, কত আশা ছিল জীবনে তখন। তারপর এখানে চলে এলাম। বিয়ে করতে গিয়ে গণ্ডগোল হয়ে গেল। তাই ভাবলাম হাতটা দেখাই। দেখি না ভাগ্যে কী লেখা আছে। গিয়ে দেখালাম
কী বললে?
বললে, যার সঙ্গে আমার বিয়ে হবার কথা ছিল, তার সঙ্গেই আমার নাকি আবার বিয়ে হবে ভাই।
আর কী বললে? আর কিছু বলেছে?
আর বললে, জলই আমার শত্রু। কখনও যেন জলের কাছে আমি না যাই।
বশির মিঞা বললে–একবার তো জলে ডুবে গিয়েছিলি তুই?
ডুবে যাইনি ঠিক। বর্গিদের হামলার সময় আমি বুড়িগঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলুম। প্রায় ডুবে যেতুম। অনেক কষ্টে সুতোনুটির ঘাটে উঠেছিলুম, তাই বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে না-হয় হল। না-হয় নৌকোয় কখনও যাব না। কিন্তু একবার যার অন্য লোকের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে, তার সঙ্গে আবার বিয়ে হবে কী করে? তোদের মতো আমাদের হিন্দুদের তো নিকে হয় না। তালাকও হয়
দুর, ওসব বুজরুকি। ও-লোকটা বুজরুক। ওসব নিয়ে কিছু ভাবিসনি।
কান্ত বললে–ভাবব না তো ভাবি, কিন্তু ভাবনাটা কিছুতেই যে মন থেকে দূর করতে পারি না!
কেন, তুই কি এখনও তার কথা ভাবিস?
কান্ত বললো, ভাবি, কেবল ভাবি
তা হলে এক কাজ কর না। যে-লোকটার সঙ্গে তার সাদি হয়েছে সে তো পাগলা। তাকে তো তার বউ তাড়িয়ে দিয়েছে। সেদিন মোল্লাহাটিতে আমার সঙ্গে উদ্ধব দাসটার দেখা হল তো। সে নিজেই তো বললে–তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে তার বউ, তার সঙ্গে দেখাই করেনি। তা তুই কলমা পড়ে মোছলমান হয়ে যা না! হবি?
মুসলমান হব?
হনা। হতে দোষ কী! হলে তো তোর নোকরিরও সুবিধে হবে, সাদিরও সুবিধে হবে। উদ্ধব দাসের বউও মুসলমান হবে, তুইও মুসলমান হবি, হয়ে আবার সাদি করবি তোরা। তুই তো কলকাতায় যাচ্ছিস উমিচাঁদ সাহেবের হাবেলিতে। ওখান থেকে কামটা সেরে সোজা বরানগরে যাবি, গিয়ে বলবি তোর বউকে মোছলমান হতে! আর আমি এদিকে মওলভি সাহেবকে ভি সব বলে ঠিক করে রাখব। কিছু ভাবিসনি, যা। মন খারাপ করিসনি। যা, আমার কাজ আছে আমি চললুম।
কান্ত তখনও কিছু কথা বলছিল না।
বশির মিঞা বললে–কী রে, সব বন্দোবস্ত তো করে দিলুম, আবার কী ভাবছিস?
কান্ত হঠাৎ বললে–আচ্ছা, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে যে আজকে নবাব চেহেসতুনে নিয়ে গেল, এর মতলবটা কী? কী করবে নবাব?
বশির মিঞা হাসল, বললে–কী আবার করবে? যে-জন্যে রানিবিবিকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে এসেছিল তাই করবে?
কী জন্যে নিয়ে এসেছিল?
বশির মিঞা বললে–ফুর্তি করবার জন্যে! সেই ফুর্তি করবে!
ফুর্তি করবে মানে?
বশির মিঞা বললে–তোকে আমি আর বোঝাতে পারব না–ফুর্তি করবে মানে মহফিল করবে, মজলিস করবে!
আর কী করবে?
বশির মিঞা বিরক্ত হয়ে গেল। আর একথার উত্তর দিলে না। চলে যেতে যেতে বললে–তোর মাথায় বিলকুল গোবর পোরা, তোর কিচ্ছু হবে না। আমি চলি, আমার কাম আছে। কাল ভোরবেলা তৈয়ার থাকবি–যা–
বলে বশির মিঞা চলে গেল। কিন্তু কান্তর পা দুটো তখন কে যেন শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলেছে। সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। সেই চকবাজারের রাস্তার ওপর। তার যেন নড়বার ক্ষমতাটাও হারিয়ে ফেলেছে সে।
*
চেহেলসূতুনে সেদিন আর কারও বিশ্রাম নেই। বহুদিন পরে নবাব মির্জা মহম্মদ চেহেল সূতুনে এসেছে। এসে রাত কাটাবে বেগমমহলে। বাবুর্চিখানায় শোরগোল পড়ে গেছে। জাফরান দিয়ে মোরগ-মুশল্লাম, বিরিয়ানি আর কাবাব বানানো হয়েছে। নবাবের বড় পেয়ারের খানা সব। নানিবেগমসাহেবা জানে মির্জা কী খেতে ভালবাসে। ছোটবেলা থেকে নানিবেগমের সঙ্গে সঙ্গে কাটিয়েছে মির্জা। মির্জা হাঁ করলে নানিবেগম বুঝতে পারে নাতি কী চায়।
পিরালি খাঁ পোশাক বদলিয়েছে। নজর মহম্মদ, বরকত আলি সবাই আজ তটস্থ। বব্বু বেগম, তক্কি বেগম, পেশমন বেগম অনেক দিন পরে আবার সাজতে বসেছে ঘরে ঘরে। অনেক দিন পরে আবার ইনসাফ মিঞা অসময়ে নহবত শুরু করেছে। শাগরেদ তবলাটা বেঁধে নিয়ে চাটি দিয়ে পরখ করে নিয়েছে সুরটা। গোসলখানায় গরম পানির ফোয়ারা খুলে দিয়েছে ভিস্তিওয়ালা। সমস্ত চেহেল্-সুতুনটা যেন আবার সরগরম হয়ে উঠেছে নবাবের পায়ের ধুলো পেয়ে।
