নেয়ামত বলেছিল–মরিয়ম বেগমসাহেবা নবাবকে বলে আপনাকে ছাড় করিয়ে নিয়েছে।
মরিয়ম বেগমসাহেবা?
যেন কথাটা বিশ্বাস করবার মতো নয়। প্রথমটা তাই একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিল কান্ত। কিন্তু তারপর আর ভাববার সময় পায়নি। কোতোয়ালের পাহারাদাররা হাতের বাঁধন খুলে দিতেই সিঁড়ি দিয়ে নীচেয় নেমে এসে একেবারে পুরকায়স্থ মশাইয়ের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাইও হঠাৎ এই ব্যাপারে বোধহয় আকাশ থেকে পড়েছিল।
কী বাবাজি, তুমি কি শেষকালে এই কাজ করলে?
কান্তর মনটা ভাল ছিল না। তবু জিজ্ঞেস করলে–কী কাজ?
ওরা না হয় ম্লেচ্ছ, শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে না-হয় চরিত্রটি খারাপ করে বসেছে, তা বলে তুমি কেন বাবাজি এসব শ্লেচ্ছ কাণ্ডের মধ্যে এলে? তুমি তো ভদ্রসন্তান বলে জানতুম।
ওদিক থেকে কার যেন পায়ের শব্দ এল। আর কথা বলবার সাহস হল না। নবাব মতিঝিলে এসেছে। বলে মুর্শিদাবাদের আমির-ওমরাও সবাই তটস্থ হয়ে উঠেছে। লোকজন, সেপাই-সাত্ত্বি, খিদমদগার, হুকুমবরদার, সবাই এদিক-ওদিক করছে। তার মধ্যে কখন কে দেখে ফেলবে তখন আরও মুশকিলে পড়বে। তাই বেশিক্ষণ আর দাঁড়ায়নি সেখানে। সোজা ফটক পেরিয়ে রাস্তায় চলে এসেছিল। তারপর সেখান থেকে সেই যে সে নিজের ঘরে এসে ঢুকেছে আর বেরোয়নি।
সত্যিই তো, কেন সে এখানে এখনও পড়ে আছে। এর চেয়ে তো নিজের দেশে চলে গেলেই পারত। সেখানে হয়তো কলকাতার মতো জাঁকজমক নেই, মুর্শিদাবাদের মতোনবিআনা নেই, কিন্তু শান্তি তো আছে।
হঠাৎ বশির মিঞা এসে হাজির হল।
এই ইয়ার, এদিকে আয়।
কান্ত দোকান থেকে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। তখনও জলুসটা চলেছে চেহেল্-সুতুনের দিকে।
কাছে যেতেই বশির বললে–আয় আমার সঙ্গে, একটা বাত আছে—
বলে রাস্তার এক কোণে নিয়ে গেল। সমস্ত লোকজন তখন হাঁ করে জলুস দেখছে। বশির এক ধারে টেনে নিয়ে গিয়ে বললে–তোর নামে সব কী শুনলুম? তুই কী করেছিস?
কান্ত বললে–রানিবিবি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল কোতোয়ালিতে, তাই গিয়েছিলুম।
কে ডেকেছিল তোকে?
রানিবিবি। সফিউল্লা খাঁ সাহেবকে যে খুন করেছিল।
কাকে দিয়ে ডেকেছিল? তাকে চিনিস?
না।
তাকে চিনিয়ে দিতে পারবি?
না, ভাল করে চিনে রাখিনি।
বশির মিঞা যেন খুব চিন্তিত হয়ে উঠেছে। বললে–শালার সব গোলমাল হয়ে গেল। হইচই পড়ে গেছে চারদিকে। তোর নোকরি হয়তো আর রাখতে পারব না। তবে কোশিস করব। তুই কিছু। ঘাবড়াসনি।
কথাটা শুনে কান্ত মুখ ফেরাল।
আমার চাকরি চলে যাবে? কেন?
তুই কী সব লটঘট করেছিস মেহেদি নেসার সাহেবের সঙ্গে। আমার ফুপা মনসুর আলিকে মেহের সাহেব বলছিল। আমি হাতিয়াগড়ে গিয়েছিলুম ডিহিদারের সঙ্গে দেখা করতে, এর মধ্যে তামাম সব কুছ বদলে গেছে!
কান্ত বললে–আমিও আর চাকরি করব না ভাই। এ চাকরি করার ইচ্ছেও আমার নেই
কেন, চাকরি করবি না তো খাবি কী?
খাবার ভাবনা নেই আমার। বুড়ো মিঞাসায়েব যতদিন আছে ততদিন আমাকে সেই খাওয়াবে। আর তা ছাড়া মুর্শিদাবাদ আমার আর ভালও লাগছে না, আমি দেশে চলে যাব, বড়চাতরায় সেখানে আমাদের বাবুদের সেরেস্তায় একটা যা-হোক কাজ জুটিয়ে নেব।
তারপর একটু থেমে বললে–শুধু একটা কারণের জন্যে যেতে পারছি না–
কী?
ওই রানিবিবির জন্যে।
মরিয়ম বেগম?
হ্যাঁ।
মরিয়ম বেগমসাহেবার জন্যে তোর কী পরোয়া?
মরিয়ম বেগমসাহেবার যদি ফাঁসি হয়ে যায়? শুনছি ফাঁসি হবে নাকি?
বশির জিজ্ঞেস করলে-ফাঁসি হলে তোর কী? মরিয়ম বেগম তোর কে? তোর বিবি না তোর জরু?
ওকথা বলিসনি! তুই তো জানিস, আমিই মরিয়ম বেগমকে চেহেল্-সুতুনে এনে দিয়েছি! আমিই তো তার জবাবদার। মরিয়ম বেগমসাহেবার যদি ফাঁসি হয় তো তার জবাবদারি তো আমারই।
কে তোর জবাব চাইবে? কাজিসাহেব, না কোতোয়াল, না নিজামত!
ওদের কথা ছেড়ে দে! আমার বিবেক বলে কিছু নেই, মাথার ওপর ভগবান বলে কেউ নেই বলতে চাস? স্বর্গে গেলে আমার কাছে জবাবদহি চাইবে না ভগবান?
বশির মিঞা হেসে উঠল।
রেখে দে তোর ইমানদারি! ইমানদারি নিয়ে ধুয়ে খাবি? ইমানদারি নিয়ে দুনিয়া কখনও চলে? কখনও চলেছে? ইমানদারিতে দিল্লির বাদশাগিরি চলছে? ইমানদারিতে নিজামত চলছে?
কান্ত বললে–ইমানদারি না থাকলে কিছুই চলবে না জেনে রাখিস। এই তোর নিজামতিও চলবে । ইমানদারিই হচ্ছে আসল জিনিস। ইমানদারি আছে বলে এখনও আকাশে চন্দ্র সূর্য উঠছে, ইমানদারি আছে বলেই এখনও তুই-আমি সবাই বেঁচে আছি।
দুর গাধা কোথাকার! তুই কিচ্ছু জানিস না।
কান্ত বললেও নিয়ে তোর সঙ্গে তর্ক করতে চাই না ভাই। তুই কী বলতে এসেছিলি, বল
বশির বললেনা রে, তোর ভয় নেই, তোর পেয়ারের রানিবিবির ফাঁসি হবে না।
হবে না? কেন?
নবাব খুদ নিজে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল, দেখলি না? ওই যে জলুস গেল? সামনের তাঞ্জামে নবাব আর পেছনের তাঞ্জামে নানিবেগম আর মরিয়ম বেগমসাহেবা। রানিবিবির মুসিব্বতটা ভাল রে ইয়ার, এক ঝটকায় নবাবের নেকনজরে পড়ে গেছে।
তা হলে ফাঁসি হবে না আর?
ফাঁসি হবে কী রে! হলে কোতোয়াল সাহেবের ফাঁসি হবে, মেহেদি নেসার সাহেবের ফাঁসি হবে, ইয়ারজান সাহেবের ফাঁসি হবে, তামাম মুর্শিদাবাদের সকলের ফাঁসি হতে পারে। লে মরিয়ম বেগমসাহেবার কৌন ফাঁসি দেবে?
