এখন সাধু কী করে সাজব! গেরুয়া কোথায় পাব? কমণ্ডলু কোথায় পাব? ওদের হরিনামের মালা কোথায় পাব?
উমিচাঁদ চুপি চুপি ধমকে উঠল। বললে–একেবারে বেল্লিক একটা তুই, মেহেদি নেসার বাজে লোককে চরের নোকরি দিয়েছে। আমি তো হিন্দু রে! আমার বাড়িতে তো সব আছে। গেরুয়া,কমণ্ডলু, হরিনামের মালা-বলে বোধহয় ওইসব আনতেই ঘরের বাইরে চলে গেল উমিচাঁদ সাহেব।
২.০৮ হালসিবাগানের উমিচাঁদ
সেদিন হালসিবাগানের উমিচাঁদ সাহেবের বাড়িতে যে-ঘটনা তখন ঘটেছিল মুর্শিদাবাদের মতিঝিলের মধ্যেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। সেই আত্মপ্রতিষ্ঠা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইন্ডিয়াতে এসে আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল কারবার করে। মুর্শিদাবাদের নবাবও আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল নতুন পাওয়া মসনদের ওপর নিজের অধিকার পাকা করে। উমিচাঁদ সাহেবও আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তার ফিরে পাওয়া ঐশ্বর্যের ওপর অধিষ্ঠিত হয়ে।
পৃথিবীর ইতিহাস এই আত্মপ্রতিষ্ঠারই ইতিহাস। একজন আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে, আর আশপাশের দশজন তাকে হয় সাহায্য করে নয়তো বাধা দেয়। কোনও সাহায্য উপকারে লাগে, আবার কোনও বাধা দুর্লঙঘ হয়ে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
নবাব মির্জা মহম্মদের যেন নতুন করে চোখের দৃষ্টি খুলে গেল। তা হলে কি কাউকেই বিশ্বাস করবার উপায় নেই সংসারে? একজনকে ধ্বংস করে মুক্ত হতে-না-হতে আর একজন শত্রু ওদিক থেকে গজিয়ে ওঠে।
নানিবেগম লক্ষ করছিল সমস্ত। মির্জার কথায় কিন্তু আশ্চর্য হল না। মির্জার সামনে নিচু হয়ে বসল।
বললে–ভেবে আর কী করবি মির্জা, চল আজকে চেহেল্-সুতুনে থাকবি চল
চেহেল্-সুতুনে আগে থেকেই সাড়া পড়ে গিয়েছিল। নবাব চেহেল্-সুতুনে আসবে শুনলেই সব আবহাওয়াটাই যেন বদলে যায়।
পেশমন বেগম খবরটা শুনেই সাজগোজ আরম্ভ করে দিয়েছিল। ময়মানা বেগম নতুন এসেছে। তার ঘর, তার আসবাব সবকিছুর ব্যবস্থা করতে হয়েছে পিরালি খাঁ-কে। সমস্ত দিন তাই নিয়েই কেটে গেছে, তারপর হঠাৎ খবর এল নবাব আসবে চেহেল্-সুতুনে।
রাত তখন হয়নি ভাল করে। চকবাজারে দোকানে দোকানে আলো জ্বলে উঠেছে। পিলখানা থেকে হাতির দল চরতে বেরিয়েছিল গঙ্গার ধারে। তারা সব দলে দলে ফিরে আসছে। সারাফত আলি দোকান খুলে আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গড়গড়ায় তামাকুর ধোঁয়া টানতে শুরু করেছে। হঠাৎ বাইরে নবাবের তাঞ্জাম দেখে যেন নেশা কেটে গেল।
বাদশা!
বাদশা আসতেই সারাফত আলি জিজ্ঞেস করলে–ও কার তাঞ্জাম রে? নবাবের না?
বাদশা বললে–জি হাঁ জনাব!
গড়গড়ার নল থেকে আরও লম্বা লম্বা ধোয়া টেনে সারাফত আলি নিজের রাগ চেপে রাখবার চেষ্টা করলে।
জিজ্ঞেস করলেও বাঙালিবাচ্চা কাহা—
বাদশা বললে–অন্দরে আছে
ডাক ওকে ডাক—
এসময় সাধারণত ডাকে না সারাফত আলি। তাই কান্ত একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল। কান্ত আসতেই মিঞাসাহেব জিজ্ঞেস করলে–কী করছিলি কান্তবাবু?
এমনি শুয়ে ছিলুম!
তোর কাজ কাম কিছু নেই? কেবল শুয়ে থাকবি দিনরাত? কী হয়েছে তোর?
কান্ত বললে–আমার কিছু ভাল লাগছে না মিঞাসাহেব।
তবিয়ত খারাপ?
কান্ত বললো হ্যাঁ
কেন? আরক খাবি?
কান্ত ভয় পেয়ে গেল। বললে–না মিঞাসাহেব, না–কদিন বিশ্রাম নিলেই ভাল হয়ে যাবে। আরক খাবার দরকার নেই
ততক্ষণ রাস্তার ওপর দিয়ে আগে আগে হাতির দল সার সার চলেছে। তার পেছনে দুটো তাঞ্জাম। পেছনে আবার হাতির সার। সমস্ত চকবাজারের রাস্তার ভিড় সরাতে সরাতে চলেছে হুকুমবরদার।
পেছনে কার তাঞ্জাম রে বাদশা?
নানিবেগমসাহেবার!
হুম! সারাফত আলি সাহেব নিজের মনের ভেতরেই যেন নিঃশব্দে গুমরে উঠল। হাজি আহম্মদের ঘরানা এখনও মিঞাসাহেবের কলিজা মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলেছে। বহু দিনের মনের রাগ যেন বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। দিনের পর দিন এই খুশবু তেলের দোকানের সামনে দিয়েই নবাব এসেছে-গেছে। কখনও গেছে কলকাতায় ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করতে, কখনও গেছে পূর্ণিয়ায় শওকত জঙের সঙ্গে লড়াই করতে। প্রত্যেক বারই লড়াই ফতেহ করে নবাবি ফৌজ বুক ফুলিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছে। আর সারাফত আলির বুকখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আর কতদিন ইস্তিজারি করবে সে!
কান্তও দেখছিল জলুসটা। নবাব তো মতিঝিলেই থাকত বরাবর। হঠাৎ আবার চেহেল্-সুতুনে চলেছে কেন? তা হলে মরালী কোথায় গেল? মরালীকে কি ছেড়ে দিয়েছে নবাব? কদিন থেকেই চকবাজারে বড় গোলমাল চলছিল। বড় ভয় পেয়ে গিয়েছিল কান্ত, যদি সত্যি সত্যিই মরালীর ফাঁসি হয়ে যেত! ভাগ্যিস মরালী ডেকে পাঠিয়েছিল তাকে। ভাগ্যিস কান্ত ঠিক সময়ে গিয়ে পড়েছিল। নইলে মেহেদি নেসার কী করত কিছু বলা যায় না!
সকালবেলা যখন হঠাৎ তাকে কোতোয়াল ছেড়ে দিলে তখনও বুঝতে পারেনি। নবাব নিজে তাকে দেখে ফেলেছে। অথচ নিজের জীবন দিয়েই সে বাঁচাতে গিয়েছিল মরালীকে। মরালীকে বাঁচাতে গিয়ে সে হয়তো মেহেদি নেসারের হাতেই খুন হয়ে যেত। খুন যে হয়নি সে তার কপাল।
তারপর মতিঝিলে যাবার সময় পুরকায়স্থ মশাইও তাকে দেখতে পেয়েছিল। হাতে হাতকড়া বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল তাকে। নেয়ামত যখন তাকে চলে যেতে বললে–তখন যেন বিশ্বাসই হয়নি।
কেন? আমাকে ছেড়ে দিলে কেন নবাব?
