শোভারাম বলেছিল–দয়া করে দায় উদ্ধার করবেন হাশেমসাহেব, বুঝতেই তো পারছেন আমার কন্যাদায়–
এরকম চলে। হাশেম আলি হাতিয়াগড়ের পুরনো লোক। দায়ুদ খাঁ’র আমলে বাংলাদেশে এসেছিলেন তার পূর্বপুরুষরা। তারপর মোগল আমলে সরকারি চাকরি চলে যাবার পর থেকে বংশপরম্পরায় ব্যাবসা শুরু করেন। সেই থেকে বংশ-পরম্পরায় এঁরা হাতিয়াগড়ে তুলোর ব্যাবসা করেন। একেবারে বাঙালি হয়ে গেছেন।
বললেন–যাব বই কী শোভারাম, নিশ্চয়ই যাব–তোমার মেয়ের বিয়েতে যাব না!
আবার হাশেম সাহেবের বাড়ির কোনও উৎসবেও অমনি করে শোভারামের বাড়িতে এসে তিনি গলবস্ত্র হয়ে নেমন্তন্ন করে যান। বলেন–এসো কিন্তু ঠিক শোভারাম, বুঝতেই তো পারছ আমার কন্যাদায়–
নিমন্ত্রণ পরস্পর পরস্পরকেই করে। যায়ও। তবে খাওয়াটা চলে না। নিমন্ত্রণে আপত্তি নেই। আপত্তিটা খাওয়ায়। সেই হাশেমসাহেব এসেছিলেন শোভারামের মেয়ের বিয়েতে। শোভারামের খড়ের চালের ঘর। তিনখানা ঘর, সামনে উঠোন, উঠোনটা ঘিরে লোকজনের আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়েছিল। হাশেমসাহেব এসেছিলেন জাব্বাজোব্বা পরে। যেমন ভাবে আসার রীতি। সকলকে আদাব জানালেন। আয়োজন কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলেন। ছোটমশাই এসেছেন কিনা তাও জিজ্ঞেস করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন–বর এসেছে নাকি?
আজ্ঞে এই এল বলে। সেই অনেক দূর থেকে আসবে কিনা, তাই একটু দেরি হচ্ছে—
বর কোথায় থাকে?
আজ্ঞে ফিরিঙ্গি কোম্পানির দফতরে চাকরি করে। বিয়ের লগ্ন তো সেই দুই পহরে, তাই একটু দেরি হচ্ছে আর কী–
ভাল ভাল, বেশ–বলে হাশেমসাহেব সব শুনে গেলেন। মুসলমানপাড়া থেকে আরও কয়েকজন এসেছিলেন তারাও নিয়ম রক্ষা করে গেলেন। উঠোনের ওপর তখন খাওয়ার হুড়োহুড়ি চলছে। শোভারাম আয়োজন করেছে ভাল। পাকা ফলার কাঁচা ফলার দু’রকমের বন্দোবস্তই করেছে।
পুরকায়স্থ মশাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে।
কী গো সচ্চরিত্র, তোমার বর কোথায়?
বর আসছে বিশ্বাসমশাই, আপনি কিছু ভাববেন না, বাবাজির সাহেবের গদিতে মালখালাস করতেই দেরি হয়ে গেল, তাই আমি তড়িঘড়ি চলে এলাম, পাছে আপনি আবার ভাবেন!
তা বর কার সঙ্গে আসছে?
নাপিত বেটাকে রেখে এসেছি, নৌকোও তৈরি হয়ে আছে। আমি বাবাজীবনকে বলে এসেছি দরকার হলে কাজকম্ম ফেলে তুমি চলে আসবে। চাকরি তোমার অনেক হতে পারে, বিয়েটা তো আর রোজ রোজ হয় না কারও–
পুরকায়স্থ মশাই এক জায়গায় চুপ করে থাকার মানুষ নয়। আজ যাচ্ছে মুর্শিদাবাদে, তারপর দিনই আবার ঢাকা। আবার তার পরই বর্ধমান। হাতে খাতাপত্র, খালি-পা। সোজা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যেখানে একটু আশ্রয় মিলল সেখানেই রাতটা কাটিয়ে নিলে। তারপর আবার রওনা। নৌকোর মাঝিদের ডেকে হয়তো তাতেই উঠে পড়ল। তারপর সে-নৌকো যেখানে যাবে সেখানেই গিয়ে ওঠা। এমনি করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলে সচ্চরিত্র।
তবু ভয় গেল না শোভারামের। জিজ্ঞেস করলে–বাবাজীবন ঠিক আসবে তো? মেয়ের বিয়ে আমার, বুঝতেই তো পারছ–
সচ্চরিত্র বললে–ঘটকালি করে করে আমার টাক পড়ে গেল বিশ্বাসমশাই, আর আমাকে আপনি শেখাচ্ছেন–
তা হলে তুমি এগিয়ে যাও সচ্চরিত্র, একটু এগিয়ে গিয়ে দেখো বর আসছে কি না—
তা হলে চটপট খাওয়াটা খেয়ে নিয়ে তারপর না হয় দেখছি! কী আয়োজন হয়েছে?
শোভারাম রেগে গেল। বললে–আগেই তোমার খাওয়া? বিয়ে না হতেই তোমার খাওয়ার দিকে নোলা?
ওদিকে তখন চিঁড়ে-দই পড়ে গেছে। হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তেলিপাড়ার লোক। সেই দিকে চাইতে চাইতে সচ্চরিত্র খাতা বগলে করে ছাতিমতলার ঢিবির দিকে বেরিয়ে গেল।
চালাঘরের ভেতরে তখন পাড়ার মেয়েরা মরালীকে নিয়ে পড়েছে। সকালবেলা গায়েহলুদ হয়ে গেছে। তখন থেকেই মেয়েদের ভিড়। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে সবাই। এখন বিয়ের কনে হিসেবে সবাই নতুন করে দেখছে।
কী গো, কনে কোথায়?
কথাটা কানে যেতেই সবাই পেছন ফিরল। ওই দুগগা এসেছে। দুর্গাবালা। ছোটমশাইয়ের বড়রানির
নয়ানপিসি বললে–হ্যাঁগো দুগগা, এই তোমার আসবার সময় হল গা?
দুগগা বললে–আমার কি একটা ঝামেলা দিদি, বড়রানিকে দুধ খাইয়ে এখন এলাম–দুগগাকে তোমাদের বলতে হবে না, দুগগা সকালবেলা এসে কনেকে নিয়ে রাজবাড়িতে ছোটমশাইকে দেখিয়ে নিয়ে এসেছে–
ছোটমশাই মুখ দেখে কী দিলে?
ছোটমশাই একজোড়া কঙ্কণ গড়িয়ে রেখেছিল। বড়মশাইয়ের আমলের নফর শোভারাম। তার মেয়ের বিয়েতে ভাল কিছু না দিলে চলে না। ছোটমশাইয়েরও এখন আর সে-অবস্থা নেই। নবাব সরকারের খাজনা আরও বেড়ে গেছে। খালসা সেরেস্তায় কানুনগোর ডাক পড়ে এখন। ছোটমশাইয়ের জমিদারি থেকে পুণ্যাহের দিন নবাব-সরকারের লোক যায়। গুণে গুণে মোহর দিয়ে নবাবের পায়ে নজর-পুণ্যাহ দিতে হয়। আর নজরানা কি একরকমের। মাথট চাই। আলগা খাজনা চাই। বয়খেলাৎ চাই। পোস্তাবন্দি চাই। তারপর আছে পাটোয়ারি, কানুনগো, মুনশি, মুহুরির পাওনা। নবাব সরকারের খাজনা দিতে গেলে শুধু মুখের কথায় হবে না। নবাবি কেল্লার সামনে আর লালবাগে ভাগীরথীতে পোস্তা বাঁধতে হবে–তার জন্যে পোস্তাবন্দি দাও। নবাবের ছেলের শাদি, নাতির শাদি, নাতনির শাদি হবে, সব খরচা দিতে হবে জমিদারদের। অথচ বড়মশাইয়ের সময়ে আগে শুধু ছিল আবওয়া খাসনবিশি। খালসা সেরেস্তার আমিন মুৎসুদ্দিদের পার্বনির নাম করে সেটা নেওয়া হত। তারপর দফায় দফায় বাড়তে লাগল। শেষে কিছু আর বাদ রইল না। কত রকমের আবওয়াব। কত তার দাপট। সরকারি পিলখানার খরচ হিসেবে দাও মাথট পিলখানা। হ্যাঁন ত্যান–কত কী!
