না দিদি, আমার কোনও কষ্ট নেই, তোমাদের যদি কষ্ট না হয় তো আমার কিছু কষ্ট নেই। একদিন তোমরা থাকাতে তবু হোম-লাইফ এনজয় করতে পাচ্ছি
দুর্গা বললে–তা যদি বললো তা হলে ওই ছাইপাঁশগুলো আর কেন খাও?
কীসের কথা বলছ?
ওই যে মদ! কী বিটকেল গন্ধ বেরোয় রোজ
কেন? মদ তো আমরা সবাই খাই। আমার বাবা তো পিপে-পিপে মদ খেত
তা খাক, আমার মেয়ের বাপু বমি আসে ওই গন্ধ নাকে গেলে!
সাহেব বললে–তাই নাকি? তা এতদিন বলোনি কেন? আগে জানলে আমি খেতাম না দিদি
না বাছা, খেয়ো না তুমি। ও কি ভদ্দরলোকে কেউ খায়? আমাদের গাঁয়ের ছোটলোকেরা খায় ওসব, খেয়ে বাড়িতে এসে বউদের গালাগাল দেয় আর মারধর করে
সাহেব বললে–তা বেশ তো খাব না, তোমাদের যদি খারাপ লাগে তো তাও খাব না, প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে, কিন্তু হোক কষ্ট, না-খেলে তোমরা থাকবে তো?
ওমা, দুর্গা বললে–তা কি কথা দিতে পারি বাছা! আমরা আমাদের ঘর-সংসার ছেড়ে তোমার বাড়িতে পড়ে থাকব সেকথা কেমন করে দেব?
না না, তা আমি বলছি না। তোমাদের বাড়ি যাবার বন্দোবস্ত তো আমিই করে দেব, তোমাদের বাড়িতে না-পাঠিয়ে কি চিরকাল তোমাদের আটকে রাখব? সেকথা তো আমি বলিনি।
সত্যিই কর্নেল ক্লাইভের সেক’দিন কেমন মনে হয়েছিল ওরা তার বাড়িতে থাকলেই যেন ভাল হয়। নবাবের সঙ্গে ওয়ার-ফেয়ার করতে এসে এ কী হল তার। তবে কি সে ছোটবেলা থেকে যে ফ্যামিলি লাইফের আস্বাদ পায়নি, এ সেই ফ্যামিলি-লাইফের লোভ?
কথা বলতে বলতে কখন যে দেরি হয়ে গিয়েছিল তার খেয়াল ছিল না। উমিচাঁদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সঙ্গে, সেকথাটাও বেবাক ভুলে গিয়েছিল। খেয়াল হতেই উঠে পড়ল। বললে–উঠি দিদি, একটা কাজের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম
কিন্তু কলকাতার কেল্লায় গিয়ে শুনলে, ওয়াটসন তার জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে করে শেষকালে নাকি একলাই বেরিয়ে গিয়েছে। রবার্ট আর নামল না ঘোড়া থেকে। সোজা চলল হালসিবাগানের দিকে। বন-জঙ্গল ঢাকা রাস্তা, উমিচাঁদের বাড়িটাও এমন জায়গায় করেছে যে সহজে যাওয়া-আসার উপায় নেই। ফিরিঙ্গিদের ছোঁয়াচ এড়িয়ে আছে। অনেকদিন ওয়াটসন বলেছে লোকটাকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
ক্লাইভ বলেছিল–উমিচাঁদ যদি আমাদের কাজে লাগে তো বিশ্বাস করতে আপত্তি কী?
না রবার্ট, ইন্ডিয়ানদের বিশ্বাস কোরো না, ডোন্ট বিলিভ দেম, দে আর লায়ার্স!
এইসব কথা শুনলেই ক্লাইভের রাগ হয়ে যেত। ইন্ডিয়ানরা সবাই লায়ার, এটা হতে পারে না। মিথ্যেবাদী সত্যবাদী সব দেশেই আছে। সমস্ত জগতটাকেই একেবারে লায়ার বলে দোষ দিচ্ছ কোন অপরাধে?
এই যে নবাব সকলকে বারণ করে দিয়েছে ইংরেজদের যেন কেউ জিনিসপত্র না বেচে, কিন্তু সবাই তো এসে লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের চাল-ডাল-মাছ-মাংস বিক্রি করে যায়! লন্ডনে কোম্পানির হেড অফিস থেকে কেবল চিঠি আসছিল–তোমরা বেঙ্গল ছেড়ে চলে এসো। ওখানে তোমাদের আর থেকে কোনও লাভ নেই। আমাদের অকারণে অনেক টাকাকড়ি নষ্ট হচ্ছে, আর নষ্ট কোরো না।
উমিচাঁদের বাড়ির সামনে আসতেই গেটের দারোয়ানটা সেলাম করলে।
ওয়াটসন সাব আয়া হ্যায়?
জি হাঁ।
দরোয়ানটা ফিরিঙ্গি কোম্পানির সাহেব দেখলে একটু বেশি খাতির করে। একেবারে সোজা টেনে নিয়ে গেল ভেতরে। বিরাট গদি-পাতা আসর উমিচাঁদের। লোকটা মালটি-মিলিওনেয়ার। আগে কখনও আসেনি ক্লাইভ এ বাড়িতে। কিন্তু শুনেছিল সব। চারদিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। এত বড় বাড়ি, এত ট্রেজার উমিচাঁদের!
কী দেখছ সাহেব?
ক্লাইভ বসল গদিতে। বললে–তুমি খুব রিচ লোক আমি জানতুম, কিন্তু এত রিচ জানতুম না–
উমিচাঁদ সেকথার ধার দিয়ে গেল না। বলল-ইচ্ছে করলে তোমরাও আমার মতো বড়ুলোক হতে। পারো
কী করে?
আমি যেমন করে হয়েছি।
কী করে বড়লোক হয়েছ তুমি?
উমিচাঁদ দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললে–সেই কথাই তো এতক্ষণ বলছিলুম তোমার ফ্রেন্ডকে। কিন্তু একটা কথা কর্নেল ক্লাইভ, তুমি কি সত্যিই বড়লোক হতে চাও? মালটি-মিলিওনেয়ার হতে চাও?
অ্যাডমিরাল চুপ করে বসে ছিল একপাশে। রবার্ট তার দিকে চাইলে।
তা হলে এ-দেশের মেয়েমানুষের দিকে নজর দিয়ো না। আগে ঠিক করে নাও, টাকা চাও, না মেয়েমানুষ চাও–এ-দেশে টাকা দিলে অনেক মেয়েমানুষ পাবে। যেমন নবাববাদশারা টাকা দিয়ে হারেমের মধ্যে মেয়েমানুষ কিনে রেখেছে। কিন্তু টাকা উপায় করতে গেলে আমার মতো হতে হবে
ক্লাইভের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল হঠাৎ। বললে–হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট? তুমি কী বলতে চাও বুঝিয়ে বলল।
তুমি তোমার ক্যাম্পে মেয়েমানুষ পুষেছ শুনলুম! কে বললে? ওয়াটসন? অ্যাডমিরাল ওয়াটসন তখনও চুপ করে বসে ছিল একপাশে। ক্লাইভ তার দিকে চাইলে। মিস্টার উমিচাঁদ, অন্য কেউ একথা বললে–আমি তাকে আমার বন্দুক দিয়ে গুলি করে মারতুম। কিন্তু তুমি ইংরেজ কোম্পানির ফ্রেন্ড, বেঙ্গলের নবাবেরও ফ্রেন্ড, তাই কিছু বললুম না, অন্য কথা বলো, লেট আস কাম টু আওয়ার ওয়র্ক
বলে রাগে গোঁ গোঁ করে ফুলতে লাগল ক্লাইভ। মনে হল যেন জীবনে কখনও এত রেগে ওঠেনি সে। ইন্ডিয়ায় আসার পর থেকেই বরাবর দেখে আসছে, এখানকার ইংলিংশম্যানেরা যেন অন্য রকম। এখানে তারা নিজের দেশকে যেন সবাই ছোট করে।
