দুর বোকা! ভগবান আছে না ছাই আছে! কচু আছে, ঘেঁচু আছে–
তা হলে রাজার রাজা কে?
উদ্ধব দাস বলেছিল–আরে বুঝলিনে বোকাঁচাঁদ, আমার রাজার রাজা হচ্ছে মানুষ মানুষ ভগবান। সেই মানুষ-ভগবানকে দেখবার জন্যেই তো কাহা কাহা ঘুরে বেড়াই কর্মকারমশাই। ছাদের তলায় বসে থাকলে কি আর মানুষ ভগবানকে দেখা যায়? মানুষ-ভগবান গঙ্গায় নৌকে ঠেলে, মাঠে লাঙল চষে, পথে মোট বয়।
মানুষ-ভগবান কথাটা কেউ শোনেনি। হিন্দু, মুসলমান, বোস্টম, কর্তাভজা, সহজে, সাহেবধনী, বাউল, বলরামভজা, কত রকম ভগবান-ভজার দল কত রকম কথা বলে বেড়ায়, কিন্তু উদ্ধব দাসের কথার সঙ্গে কারও কথা মেলে না।
তা তোমার মানুষ ভগবানকে পুজো করো তুমি?
করিনে? ওরে বাবা, না করলে বেগম মেরী বিশ্বাস’কাব্য লিখব কী করে? এ তো মানুষ ভগবানকে নিয়েই লেখা।
কখন তার পুজো করো?
সব সময়েই করি।
উদ্ধব দাস বলত–কী রকম করে পুজো করি শুনবে? শয়নে-স্বপনে-নিদ্রে সব সময়েই পুজো করি। তবে শোনন, আমার পুজো কী রকম মন দিয়ে করি
(যেমন) বারিগত মীন দাতাগত দীন।
নদীগত তরী ভক্তিগত হরি।
কনগত পশু মাতৃগত শিশু।
স্বামীগত সতী ক্রিয়াগত গতি।
জলগত মকর চন্দ্রগত চকোর।
বৃক্ষগত লতা জিহ্বাগত কথা।
আহারগত কায়া ধর্মগত দয়া।
অর্থগত নর পিত্তগত জ্বর।
অর্জনগত ধন আশাগত মন
ধনগত মান
তেমনি আমার কাব্যগত প্রাণ ॥
বলেই হাঃ হাঃ করে হেসে কুটোকুটি হয়ে পড়ে উদ্ধব দাস! তারপর উদ্ধব দাস চলে গেলে হরিচরণ সোজা এসে ঢুকল। বললে–দিদি গো, পাগলাটা চলে গেছে
দুর্গা জিজ্ঞেস করলে তোমার সাহেব কোথায়?
কর্নেল ক্লাইভ বরানগরে এসে যেন একটু শান্তি পেয়েছিল। এতদিন মাদ্রাজে ছিল। সেখানে কেল্লার মধ্যে বসে বসে শুধু বই পড়েছে আর লড়াই করেছে। কিন্তু ফলতায় আসার পর থেকেই দেশটাকে যেন আরও ভাল লাগছে। অনেকদিন দূর থেকে দেখেছে রানিবিবিকে। মনে হয়েছে, বড় অদ্ভুত মেয়েটা। মাথায় যাদের সিঁদুর থাকে তারা ম্যারেড লেডি সেটা জেনে নিয়েছে। কিন্তু ম্যারেড হলেও কেন হ্যাঁজব্যান্ডের কাছে গেল না। অথচ অত ভাল হাজব্যান্ড! সারা ওয়ার্লডই লোকটার সংসার। এ ওয়ার্লড-সিটিজেন। মনে হল এই পোয়েটটা তার নিজের মনের কথাটাই বলে গেল। ইন্ডিয়ায় এসে যদি কোনও লাভ হয়ে থাকে তো তা ওই।
ক্লাইভ সাহেবও গিয়ে ডাকলে–দিদি
দুর্গা এল। বললে–কী সাহেব?
ওই পোয়েটটা কিন্তু ভাল লোক দিদি। আই লাইকড দ্যাট পোয়েট। কিন্তু ওকে তোমরা ঘরে ঢুকতে দিলে না কেন? ও কী করেছে?
দুর্গা আর কী বলবে। সাহেবকে কী করে বোঝাবে যে ও-লোকটা তার জামাইও নয়, কেউই নয়। ও লোকটা একটা বাউন্ডুলে পাগল।
দুর্গা বললে–ওর কথা থাক বাবা, তুমি আমাদের কোথাও পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দাও, আমরা আর এখেনে থাকতে পারছিনে–
কেন? এনি ট্রাবল? কোনও কষ্ট হচ্ছে?
তা কষ্ট হবে না? বাড়ি-ঘর ছেড়ে এসে এখেনে পড়ে থাকতে কারও ভাল লাগে? আমাদের কি ঘর-সংসার নেই?
সাহেব বললে–আমার তো এখানে বেশ ভাল লাগছে দিদি, তোমাদের সঙ্গে থাকতে আমার খুব ভাল লাগছে। দেশে আমার তো বাবাও নেই, মাও নেই
মা বাবা কেউ নেই? মারা গেছেন বুঝি, আহা—
সাহেব হাসল। বললে–না দিদি, মা বাবা থেকেও নেই আমার।
কেন?
আমার বাবা যে মাতাল, আমার মা তাই বাবার সঙ্গে থাকে না। আমার মা মাসির কাছে থাকত, আমিও সেখানে থাকতুম–
অত বড় দুর্ধর্ষ সাহেব দুর্গার সঙ্গে যখন গল্প করত তখন যেন অন্য মানুষ হয়ে যেত। দুর্গার মনে হত যেন সে ঘরের ছেলে। কোথাকার কোন সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে এখেনে যুদ্ধ করতে এসেছিল, নবাবকে খুন করে ফেলতে এসেছিল; কিন্তু মানুষটাকে দেখে তা যেন বোঝা যেত না। তিন বছর বয়েস পর্যন্ত মা’র সঙ্গে মাসির সঙ্গে কাটিয়েছে, তারপর আর দেখা হয়নি। মা তাকে দূরে পড়তে পাঠিয়েছে। ইস্কুলে।
তারপর থেকে আর বাড়ি কাকে বলে তা জানি না দিদি। কাকে বলে ভাই, কাকে বলে বোন তাও জানি না। তাই এই যে কদিন তোমরা আছ এখেনে, মনে হচ্ছে যেন নিজের দেশেই আছি, নিজের বাড়িতেই আছি। আমার তাই খুব ভাল লাগছে দিদি, তোমরা চলে গেলে আমার খুব কষ্ট হবে
দুর্গা বললে–আমাদেরও তো তেমন খারাপ লাগত না বাবা—কিন্তু
কিন্তু কী?
কিন্তু তোমরা যে বাবা ম্লেচ্ছ, তোমরা যে বাবা মোছলমানদের মতো গোরু খাও, গোরু খৈলে আর কেমন করে থাকি বাবা তোমাদের এখেনে–
বিফ? তোমরা বিফ খাও না?
দুর্গা বললেও নাম কোরো না বাবা, শুনলে আমার মেয়ে বমি করে ফেলবে।
তা বিফ আমি খাব না। তোমরা যদি চাও আমি গোরুর মাংস খাওয়াও ছেড়ে দিতে পারি, আমার কোনও অসুবিধে হবে না দিদি। আমি ফিশ খাব, আমি এগস খাব, ফাউলকারি, চিকেনকারি…
মুরগি? না বাবা, ও সব মোছলমানেরা খায়, আমরা ওসব খাইনে–
সাহেব বললে–তোমরা ফাউল-চিকেন কিছুই খাও না? তা হলে মাটন? মাটন খাও তো? আমি তাই-ই খাব–
না বাবা, তা কেন খাবে না। আমাদের জন্যে তুমি কেন অত কষ্ট করতে যাবে? আমরা দু’দিন আছি, দুদিন পরেই চলে যাব আমাদের সঙ্গে তোমার কীসের সম্পর্ক বাবা?
সাহেবের মুখটা যেন কেমন ম্লান হয়ে গেল।
বললে–ঠিক আছে, আমি তো তোমাদের ওপর জোর করতে পারি না
দুর্গা বললে–আমি তো সে কথা বলিনি বাবা। আমাদের কপালে যেকদিন কষ্ট আছে সে ক’দিন তো এখেনে থাকতেই হবে। আমাদের জন্যে তোমারও তো কষ্ট হচ্ছে, সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
