বলে মির্জার সামনে তেমনি করেই মাথা নিচু করে রইল।
ওঠ
মির্জা হাত ধরে টেনে ওঠালে। বললে–দ্যাখ ইয়ার, যখন নবাব হইনি তখন বেশ ছিলাম রে, এখন কেবল সকলকে সন্দেহ হয়। রাগের ঝেকে সেদিন জগৎশেঠকেই চড় মেরে বসেছিলুম! এখন নবাব হয়ে আমার এ কী হল বল তো!
বলতে বলতে কেমন করুণ হয়ে উঠল মির্জার গলাটা।
এখন কবে যে প্রাণভরে ঘুমিয়েছি তাও মনে পড়ে না। এখন একটু ঘুমোব ভেবেছিলুম, তাও হল না। কোথা থেকে কী একটা চিঠি এসে সব গোলমাল বাধিয়ে তুলল–
বলে চিঠিটা নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দিলে।
বললে–যা যা ভাগ তোরা, ভাগ এখান থেকে ভাগ, আমি ঘুমোব এখন
মেহেদি নেসার, ইয়ারজান দু’জনেই চলে গেল দরবার ছেড়ে চলে যেতেই নানিবেগম ভেতরে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে মরিয়ম বেগম।
নানিবেগম বললে–কী হল, চিঠি ছিঁড়ে ফেললি?
মির্জা বললো নানিজি, ওদের ছেড়ে দিলুম
তোকে খুন করবার জন্য ওরা সড় করছে আর তুই ওদের ছেড়ে দিলি মির্জা! এই চিঠির জন্যে ওরা এত টানা-াচড়া করছে, আর তুই কিছু বললিনে?
মির্জা বললে–আমার দেমাগটা বড় খারাপ হয়ে আসছে নানিজি।
তা দেমাগ খারাপ বলে খুনিদের মাফ করে দিবি তুই?
মির্জা বললে–খুন তো আমিও আগে অনেক করেছি নানিজি! তাতে কি আমার দুশমন কমেছে? এই তো শওকতকে খুন করে এলুম, তুমি কি ভাবছ তাতে আমার দুশমন কমবে? এখন আমার বড় ঘুম পেয়েছে নানিজি, আমি একটু ঘুমোব এখন
তা হলে নবাবি নিলি কেন?
আমি ভুল করেছি নানিজি!
তা হলে নবাবি ছেড়ে দে, দুশমনের মোকাবিলা না করতে পারলে নবাবি ছেড়ে দিয়ে ফকিরি নে—
মির্জা বললে–না নানিজি, ওদের কিছু কসুর নেই, ওদের তুমি দোষ দিয়ো না, ওরা আমার পুরনো ইয়ার
নবাবের ইয়ারের কি অভাব হয় রে মির্জা! দুশমনরাই তো ইয়ার সেজে আসে!
মির্জা এবার সোজা হয়ে বসল। বললে–কিন্তু বলতে পারো নানিজি, কাকে আমি বিশ্বাস করব? ওদেরও যদি আমি ছেড়ে দিই তো কাদের নিয়ে আমি থাকব? ঠগ বাছতে গিয়ে যে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে!
এতক্ষণ মরালী চুপ করে ছিল। জিজ্ঞেস করলে–জাঁহাপনা কি আমার দেওয়া চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছেন?
হ্যাঁ, ওই যে পড়ে আছে।
তা হলে চিঠিতে যা লেখা ছিল সব ভুল?
হ্যাঁ বিবিজি, সব ভুল। ওরা কখনও ও-চিঠি লেখাতে পারে না।
তা কীসে বুঝলেন জাঁহাপনা?
নবাব বললে–করিম খাঁ বলে কেউ নেই। মেহেদি নেসারের কোনও দুশমন আছে, ওটা তারই কাজ। ওরা আমার ইয়ার, ওদের আমি ভালবাসি, এটা অনেকের সহ্য হয় না
তা যদি হয় তা হলে এ-চিঠি কার লেখা?
বলে মরালী আর একটা চিঠি তার ওড়নির আড়াল থেকে বার করলে। করে নবাবের দিকে নিচু হয়ে এগিয়ে দিলে।
এ-চিঠি আবার কোথায় ছিল?
মরালি বললে–সফিউল্লা খাঁ সাহেবের জামার ভেতরে। এটা আলাদা করে রেখেছিলাম।
মির্জা মহম্মদ তাড়াতাড়ি চিঠি নিয়ে পড়ে বললে–একী! উমিচাঁদ সাহেব? উমিচাঁদও এদের দলে?
নানিবেগমসাহেবা চিঠিটার ওপর ঝুঁকে পড়ল উদগ্রীব হয়ে।
*
অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস আজকের বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস নয়। ইতিহাস বদলায় কিন্তু ইতিহাসের বাইরের বোরখার চেহারাটা হয়তো একই থাকে। আজকের প্রাইম মিনিস্টার সেদিনের নবাব। আজকের মিনিস্টার সেদিনের মেহেদি নেসার। তবুনবাবদের কিন্তু পরিবর্তন নেই, মেহেদি নেসাররাও অজর-অমর। তারা আসে, নবাবি করে, বক্তৃতা দেয়, লড়াই করে, ষড়যন্ত্র করে, খোশামোদ করে, ঘুষ খায়, তারপর আবার একদিন ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে কোথায় হারিয়ে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, কেউ তাদের মনে রাখে না। দু-একটা রাস্তার নাম, বাড়ির নাম, কি প্রতিষ্ঠানের নামে শুধু তারা বেঁচে থাকে। তারপর আবার শুরু হয় আর একজনের পালা। তখন আবার সেই একই নিয়মে ইতিহাস এগিয়ে চলে। যে-নিয়মে সেই মহারাজ অশোক এসেছে গেছে, সেই নিয়মেইনবাব সিরাজউদ্দৌলা এসেছে গেছে, মেহেদি নেসাররাও এসেছে গেছে, সেই নিয়মেই আবার আপনি আমি সবাই এসেছি আবার একদিন যাবও।
তবু বলছি ইতিহাস বদলায়।
আপনি আমি চাইলেও বদলায়, না-চাইলেও বদলায়।
বদলায় বলেই যুগে যুগে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে আসে উদ্ধব দাসরা। উদ্ধব দাস লিখে গেছে
বিধির বিধান রবে, কেবা আর রবে ভবে।
চলে যেতে হবে সবে না-হইতে শেষ ॥
বিপুল পৃথিবী তার, রবে মাত্র সারাৎসার,
কে বোঝে রহস্য কার এবম্বিশেষ ॥
কাব্য রচি কাটে দিন, আমি অতি দীন হীন,
তব পদে চিরদিন ভক্তি মম আশ।
ওহে প্রভু কল্পতরু, হে গোবিন্দ কৃপাঙ্কুর।
লিখিতং কাৰ্যঞ্চাগে শ্রীউদ্ধব দাস ॥
কাব্য লিখবে যে তুমি দাসমশাই, তা হলে এত ঘুরে বেড়াও কেন তুমি!
মোল্লাহাটির মধুসূদন কর্মকার কথাটা জিজ্ঞেস করেছিল একদিন। যে-লোকটাকে তার বউ পর্যন্ত নিলে না, দেখা হওয়ার পর তাড়িয়ে দিলে, তার তুল্য দুঃখী কেউ আছে এটা যেন কেউ কল্পনাই করতে পারত না।
মধুসূদন বলত–রায় গুণাকর তো রাজার সভায় ছাদের তলায় বসে অন্নদামঙ্গল লিখেছিল, তাই অত ভাল লেখা হয়েছিল কিন্তু তোমার কাব্য অত ভাল হবে না, তুমি যে কেবল ঘুরে বেড়াও–
উদ্ধব দাস বলত–আমার তো আর রাজাকে খুশি করবার জন্যে লেখা নয় গো
তবে কাকে খুশি করবার জন্যে?
রাজার রাজাকে খুশি করতে পারলেই হল।
রাজার রাজা? সে আবার কে গো? বাদশা?
দুর বোকা।
মধুসূদন বুঝতে পারেনি। বলেছিল–ও বুঝেছি–ভগবান—
