অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যেন কিছুক্ষণ কী ভাবলে।
তারপর বললে–তা হলে বলছেন কিছু ভয় নেই?
না, যতক্ষণ উমিচাঁদ আছে ততক্ষণ কিছু ভয় নেই, আপনারা তোড়জোড় শুরু করে দিন, আমি থাকতে ভয় কী?
মিরজাফর সাহেব
আরে, মিরজাফর সাহেব তো আমার হাতের পুতুল। আমি যা বলব সে তাই করবে। বলুন তো এখানে আমার বাড়িতে তাকে ডেকে নিয়ে আসি-তা আনার ফ্রেন্ড কোথায় গেল? সে এল না?
কে ফ্রেন্ড?
কর্নেল ক্লাইভ।
অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের মুখে একটা তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল।
তার দ্বারা কিছু হবে না উমিচাঁদ সাহেব, তার আর কোনও পদার্থ নেই।
কেন?
সে এক নেটিভ ওম্যানের সঙ্গে লাভে পড়েছে—
দিশি মেয়ে? কোথাকার মেয়ে?
কোথাকার কোন কান্ট্রি গার্ল, আবার ম্যারেড। বিয়ে হয়ে গেছে ওম্যানটার। তাকে নিয়ে নিজের ঘরে তুলেছে। আমি তাকে নেটিভ গার্ল বলেছিলুম বলে আমার সঙ্গে মারামারি করেছে আর কোনও ভরসা নেই–
ছি ছি ছি শেষকালে লড়াই করতে এসে মেয়েমানুষের খপ্পরে পড়ল।
কথাটা শেষ হবার আগেই খবর এসে গেল। উমিচাঁদ সাহেবের খোদ খিদমদগার এসে কুর্নিশ করলে হুজুর, কর্নেল ক্লাইভসাহাব হাজির
ওই দেখো, এসে গেছে।
ইন্ডিয়ার মানুষদের এতদিনে চিনে ফেলেছিল ক্লাইভ সাহেব। ক্লাইভ জানত যারা কন্সপিরেটর তাদের কাছে নিজেকে ছোট করতে নেই। মাথা নিচু অলেই ষড়যন্ত্রকারীরা পেয়ে বসে। এরা কাউকেই ভালবাসে না। এরা নিজেরা ছোট বলেই পরকেও ছোট মনে করে। এরা নবাবের এনিমিই শুধুনয়, এরা ক্লাইভেরও এনিমি।
কিন্তু ঘরে ঢুকেই মুখময় হাসি ভরিয়ে তুলল।
হ্যালো উমিচাঁদ দি গ্রেট।
*
ততক্ষণে মেহেদি নেসারকে ডেকে পাঠিয়েছিল নবাব। মির্জার হাতে তখনও চিঠিটা ধরা আছে। শুধু মেহেদি নেসারই নয়, ইয়ারজানকেও ডেকে পাঠিয়েছে।
এটা কীসের চিঠি ইয়ার?
বড় হাসিমুখে এগিয়ে এল মেহেদি নেসার। নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা তাদের সন্দেহ করেছে। এতদিনের ইয়ারগিরির আজ বুঝি পরীক্ষা হয়ে যাবে। তবু মির্জাকে চিনতে তাদের বাকি নেই।
মির্জাকে ভোলাতে তারা জানে। মির্জার গুণও তারা জানে, মির্জার দোষও জানে। বাচপান থেকে একসঙ্গে উঠেছে বসেছে তারা, একসঙ্গে ফুর্তি করেছে, আবার কখনও ঝগড়াও করেছে। কিন্তু মির্জা কখনও সন্দেহ করেনি তাদের, বরং সন্দেহ করলেও অবিশ্বাসে উড়িয়ে দিয়েছে। যখন চারদিকে আরও শত্রু ছিল মির্জার, যখন নবাবি টলমল করত, তখনও পাশে দাঁড়িয়ে যারা উৎসাহ দিয়েছে, আশা জুগিয়েছে, দুশমনদের দূর করেছে, তারা মেহেদি নেসার, ইয়ারজান আর সফিউল্লা। কত রাত ভোর করে দিয়েছে একসঙ্গে, কত দিন খতম করে দিয়েছে একসঙ্গে। সেই সব কথা মনে রেখেই একদিন মেহেদি নেসার, ইয়ারজান আর সফিউল্লা মুর্শিদাবাদে নবাবের মতো কলিজা ফুলিয়ে বেড়িয়েছে। কারও পরোয়া করবার দরকার হয়নি। সেই তাদেরই আজ ভয়ে-সংকোচে-দ্বিধায় এসৌঁড়াতে হয়েছে। মির্জার সামনে আসামি হয়ে।
সেসব দিনের কথা কি মির্জা সব ভুলে গেল?
সেই যেদিন হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে দেখেছিল বজরার ভেতরে। ভারী খুবসুরত লেগেছিল চোখের চাউনিটা। শুধু কি হাতিয়াগড়ের রানিবিবি! কত লেড়কি, কত আওরাত, কত জেনানা, কত মহফিল! সব তো মির্জার জন্যে।
অথচ যেদিন থেকে হাতিয়াগড়ের রানিবিবি চেহেলসূতুনে এসেছে, সেইদিন থেকেই যেন সব ওলটপালট হয়ে গেছে নিজামতিতে। নানিবেগমও তাদের সন্দেহ করতে শুরু করেছে। মির্জাও তাদের সন্দেহ করতে শুরু করেছে। সেইদিন থেকেই সুখের দিন, সোয়াস্তির দিন চলে গেছে তাদের।
এটা কীসের চিঠি ইয়ার? এ করিম খাঁ কে?
সমস্ত মতিঝিলের মধ্যে যেন একটা অস্ফুট জিজ্ঞাসার চিহ্ন সবকিছু তোলপাড় করে ফেললে।
মেহেদি নেসার সেকথার সোজা উত্তর দিলে না।
আজ আমাদের তুই অবিশ্বাস করলি মির্জা?
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা নয় ইয়ার। আমার সব বিশ্বাস-অবিশ্বাস আজ আমাকে পাগল করে তুলেছে। আমার মসনদের ওপর ঘেন্না ধরে গেছে। কাকে বিশ্বাস করব আর কাকে অবিশ্বাস করব, আমি বুঝতে পারছি না। জানিস ইয়ার, শেষকালে কোনদিন শুনব নানিবেগম আমাকে খুন করবার জন্যে জহ্লাদ লাগিয়েছে তা শুনলেও হয়তো আজ আর তাজ্জব হব না
মেহেদি নেসার বললে–কিন্তু কেন এরকম হল ইয়ার?
কেন হল? হয়তো মসনদের খাতিরে হল। হয়তো মসনদ না পেলে কেউ আমার পেছু লাগত না, আমিও কারও পেছনে লাগতুম না। আমিই কি কম খুন করেছি, তোরাই বল?
মেহেদি নেসার বললে–তোর সঙ্গে আমার কথা বলতেও শরম লাগছে ইয়ার! ভাবছি আমি যা-কিছু বলব তুই তা-ই সন্দেহ করবি
তা করব! মিরজাফর এ-চিঠি লিখলে আমি অবাক হতুম না, এমনকী জগৎশেঠজি লিখলেও অবাক হতুম না। হিন্দুস্থানের কেউ লিখলেও অবাক হতুম না। বোধহয় নানিবেগম লিখলেও অবাক হতুম না! কিন্তু তা বলে তোরা?
মেহেদি, নেসার বললে–তা হলে এক কাম কর, আমি মাথা পেতে দিচ্ছি তোর সামনে, দুই আমাদের কোতল কর
বলে মেহেদি নেসার নবাবের সামনে নিজের মাথাটা নিচু করলে।
ঠিক যেমন ভাবে হোসেনকুলিকে কোতল করেছিলি তেমনি করেই কোতল কর। আমি হাসতে হাসতে বেহেস্তে চলে যাব
তা হলে এ করিম খাঁ কে, বল?
মেহেদি নেসার বললে–তার দরকার নেই। একবার যখন তোর মনে সন্দেহ হয়েছে তখন তার উত্তর পেলেও তোর সন্দেহ ঘুচবে না। তার চেয়ে তুই আমাদের খতম করে দে সফিউল্লা যেখানে গেছে আমরাও সেখানে চলে যাই
