সেদিন সন্ধের সময় উমিচাঁদের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল এক ফকির।
ফকিরই বটে। একেবারে ঠিক ফকিরের মতো চেহারা। গায়ে তালি-মারা আলখাল্লা, গলায় স্ফটিকের মালা। হাতে আঁকানো-কোনো লাঠি। গুনগুন করে আল্লার নাম করে ভিক্ষে চাইতে এল। তারপর ভিক্ষে নিলেও। কিন্তু চলে গেল না।
গোমস্তা খুব খাতির যত্ন করে ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর ভেতরে কোথায় গিয়ে যে ঢুকল তা বাইরের কেউ আর দেখতে পেলে না।
কিন্তু উমিচাঁদ সাহেবের কাজ হাসিল হয়ে গেল সেইদিনই। একেবারে সাহেবের খাসকামরার ভেতরে দরজা বন্ধ কুঠুরিতে বড় চুপিসারে কথা হতে লাগল দুজনে।
কেউ দেখতে পায়নি তো তোমাকে?
না হুজুর, দেখতে পেলেও চিনতে পারেনি কেউ, আমি মোল্লাহাটি হয়ে ঘুরে এসেছি। মেহেদি নেসার সাহেব আমাকে তাড়াতাড়ি সব জানাতে বলেছে। সব জানাজানি হয়ে গেছে হুজুর।
কী জেনেছে?
নবাবকে নানিবেগম সব জানিয়ে দিয়েছিল চিঠি লিখে। সেই চিঠি পেয়েই একেবারে কোতোয়ালিতে এসে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে মেহেদি নেসার সাহেবকে। সে-চিঠি এখন নবাবের হাতে চলে গেছে।
সেখানে তো করিম খাঁ’র নাম আছে। আমি তো আমার নাম দিইনি সে-চিঠিতে।
তা জানি না হুজুর। সেই খবরটা আপনাকে বলতে এলাম! মেহেদি নেসার সাহেব আমাকে পাঠালেন হুজুরের কাছে, সেখানে আপনার নিজের নাম লিখেছেন কিনা জানতে
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আমার নিজের নামওয়ালা চিঠি আছে, কিন্তু সেটা ও-চিঠির সঙ্গে নেই
সে চিঠিতে কী লেখা ছিল?
আমাদের মতলব লেখা ছিল তাতে। নবাবকে কোনওরকমে কলকাতায় এনে তারপর যেমন করে হোসেনকুলি খাঁ-কে মারা হয়েছে, তেমনি করে মারা হবে। লোক তৈয়ার আছে–
এসব কথা চিঠিতে লেখা আছে?
আছে, কিন্তু সফিউল্লা সাহেবের কাছে যে চিঠি আছে তাতে নেই। এ চিঠিখানা সফিউল্লা সাহেবকে রাস্তাতেই খাজা হাদিকে দিতে বলে দিয়েছি। খাজা হাদি তো আমাদের লোক, সেই সব ব্যবস্থা করবে যে
খাজা হাদিকে সে-চিঠি দেওয়া হয়েছিল আপনি ঠিক জানেন হুজুর?
নিশ্চয় দিয়েছে। সে-চিঠি সফিউল্লাসাহেব মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাবে কেন?
তা হলে আমি চলি হুজুর। এইটে জানতেই আমাকে পাঠিয়েছিল নেসার সাহেব।
কথা শেষ হবার আগেই খিদমদগার এসে খবর দিলে, ওয়াটসন সাহেবের লোক এসেছে।
তুমি পাশের কামরায় যাও, ফিরিঙ্গি কোম্পানির বড়সাহেব এসেছে, তোমাকে দেখতে পাবে মেহেদি নেসার সাহেবকে বলবে, কী হল যেন আমাকে জানান তিনি। আমি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি
বিরাট প্রাসাদ উমিচাঁদ সাহেবের। পাঞ্জাবি আড়তদার। তামাম হিন্দুস্থান ছড়িয়ে আছে তার কারবার। একদিন এই বাড়িই পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উমিচাঁদ আবার তা সারিয়ে নিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে। এই ক’দিনের মধ্যেই আবার সামনের বাগানে ফুলগাছে ফুল ফুটিয়েছে মালি। সমস্ত সম্পত্তি গুরুগোবিন্দ নানকের নামে চালালেও দেয়ালের গায়ে মধ্যিখানে বড় বড় অক্ষরে গণেশায় নমঃ’ লেখা। বাংলার অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাসে এ এক অদ্ভুত পুরুষ।
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন অত্যন্ত সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলে–কী হল উমিচাঁদ সাহেব? এ-ঘরে কেউ এসেছিল নাকি?
কই, না!
মনে হল যেন কেউ এতক্ষণ এ-ঘরে ছিল!
ভুল অ্যাডমিরাল, ভুল। আপনি বড় ভয় পেয়ে গেছেন তাই এই ধারণা। আমি তো আপনার জন্যেই। অপেক্ষা করে বসে আছি।
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যেন এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হল। তারপর ভাল করে আয়েশ করে বসল।
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আমার এখানে আসতে আপনার কোনও ভয় করবার দরকার নেই। নবাব আর কাউকে বিশ্বাস করুক আর না করুক, আমাকে নিজের লোকের মতো বিশ্বাস করে, এ সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন
শুনলাম মুর্শিদাবাদে নাকি কী সব ট্রাবল হয়েছে।
কোত্থেকে শুনলেন?
আমাদের স্পাইয়ের মুখের খবর। শুনলাম কোন একটা বেগম নাকি মার্ডার করেছে সফিউল্লা খাঁ সাহেবকে। তার কাছে নাকি ভ্যালুয়েবল ডকুমেন্ট ছিল, সেটাও ধরা পড়েছে। তাতে নাকি মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, আপনি সবাই জড়িয়ে পড়েছেন।
ফুঃ
গুরুগোবিন্দ নানকের ভক্ত এক ফুয়ে ওয়াটসনের সব সন্দেহ হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে।
বললে–এটা জেনে রাখবেন, আমার বিরুদ্ধে যে যা-কিছু বলুক, নবাব আমাকে কখনও অবিশ্বাস করবে না
কেন?
সে চালাকি শেখা চাই অ্যাডমিরাল। সেটা আমি কাউকে শেখাই না। নইলে কোটি কোটি টাকা এই একটা জীবনে আয় করতে পারি? কারবার করে খাই, লোকচরিত্র জানব না?
তা হলে কী হবে?
কীসের কী হবে?
সে ডকুমেন্ট ধরা পড়লে কী হবে?
কিছুই হবে না। আপনারা অত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আপনারা যদি নবাবকেনা-হটাতে পারেন তা হলে কেন আবার ফিরে এলেন? ফলতায় থাকলেই পারতেন? আমরা নিজেরাই সরাব।
ওয়াটসন অবাক হয়ে গেল আপনারা নিজেরাই সরাবেন?
আমরা সরাতে পারি না ভাবছেন? নবাব যাকে-তাকে যখন-তখন অপমান করবে, যার-তার বউকে ধরে হারেমে পুরবে, যা-খুশি তাই করবে, তা হলে আমরা আছি কী করতে?
অ্যাডমিরাল কী যেন ভাবলে আমাদের যে মুশকিল হয়েছে
আপনাদের আবার মুশকিল কী? আমরা সবাই তো আপনাদের পেছনে আছি
ওয়াটসন বললে–ফ্রেঞ্চরা যে চন্দননগরে রয়েছে, মঁসিয়ে লা যে নবাবের ফ্রেন্ড
দেখুন
উমিচাঁদ অভয় দিয়ে বললে–দেখুন, টাকার জোর বড় জোর, আমার টাকা আছে, মুর্শিদাবাদের জগৎশেঠজির টাকা আছে। যতক্ষণ আমাদের টাকা আছে ততক্ষণ আমরা যা খুশি তাই করব। যদি আমাদের খুশি হয় তো নবাবকে মসনদে বসাব, আবার খুশি হলে নবাবকে মসনদ থেকে নামা তাতে আপনারা আমাদের দলে থাকুন আর না-ই থাকুন।
