নানিবেগম সেকথায় কান না দিয়ে হঠাৎ বললে–আমি মরিয়ম মেয়েকে তোর কাছে আনছি—
এখন?
কেন, এখন তোর সময় নেই?
আমি যে কাল কলকাতায় যাচ্ছি, কোম্পানির ফৌজের সঙ্গে মোকাবেলা করতে।
কিন্তু তার আগে তোর নিজের মোকাবেলা কে করবে?
আমার মোকাবেলা? সে মোকাবেলা তো তোমার খোদাতালা করবে নানিজি! তার আগে। মোকাবেলা করবে এমন ক্ষমতা কার আছে?
নানিবেগম বললে–কে মোকাবেলা করবে তার নিশানই তো আছে সেই চিঠিতে। সেই চিঠি কেড়ে নেবার জন্যেই তো দুদিন ধরে মুর্শিদাবাদে এত ষড়যন্ত্র চলছে। সেই জন্যই তো তোকে চিঠি লিখে তাড়াতাড়ি চলে আসতে বলেছিলাম আমি তাকে আনছি তোর কাছে বোস একটু
বলে নানিবেগম ঘরের বাইরে চলে গেল। মির্জা বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে। বহুদিন যেন এমন করে একলা থাকার আরাম ঘটেনি মির্জার জীবনে। সারাদিনসারারাত সবাই তাকে চোখে-চোখে রাখে। সবাই তাকে ভুলিয়ে রাখতে চায়, হয় আরাম দিয়ে নয়তো মেয়েমানুষ দিয়ে। আশ্চর্য, কোরান ছুঁয়ে যে একবার মদ ছেড়ে দেবার প্রতিজ্ঞা করেছে, আবার কেমন করে সে মদ ছোবে। তবু ওরা লোভ দেখায়। আর জেনানা! ও বড় পুরনো চিজ! মেয়েমানুষের নতুন করে দেখবার কিছু নেই। মেয়েমানুষের শরীরের রাস্তা-ঘাট-অলি-গলি-খুঁজি সব দেখা হয়ে গেছে মির্জার। অচেনা নেই কিছুই। শুধু মনটা। কিন্তু সেটাও যে কানাগলি। সেখানে যে ঢোকাই যায় শুধু, সেখানে যে সবই ভুলভুলাইয়া, সব যেন গোলকধাঁধার মতো ঘুলিয়ে যায়। সে ভুলভুলাইয়ার থেকে বেরোবার পথ কে বলে দিতে পারে! কে তার হদিস দেবে!
সামনে চেয়ে দেখলে মরিয়ম বেগম আসছে। পেছনে নানিবেগম!
নানিবেগম মরালীকে সামনে এগিয়ে দিয়ে বললে–কুর্নিশ কর মেয়ে
মাথাটা নিচু করে আনাড়ির মতো কুর্নিশ করল মরালী।
তোর কাছে কী চিঠি আছে দেখা!
মরালী চুপ করে রইল।
তারপর বললে–তার আগে ওকে ছেড়ে দিতে হবে!
নানিবেগম বুঝতে পারলে না। জিজ্ঞেস করলে কাকে?
ওই আমার জন্যে যাকে ধরে আনা হয়েছে, তাকে
তা, ও তোর কে?
মরালী বললে–ও আমার নিজের লোক—
নিজের লোক মানে কী? তোর রিস্তেদার?
মরালী বললে–রিস্তেদারের চেয়েও বড়–এর বেশি আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না, এর বেশি আমি কিছু বলবও না–
বুঝেছি। তা এতদিন এ কথা বলিসনি কেন? তা হলে কবে তোকে আমি ছেড়ে দিতুম—
মরালী বললেন, আমি ছাড়া পেতে চাই না, আমি এখানেই থাকব।
এখানে থেকে কী করবি? চেহেল্-সুতুনের বেগমরা যেমন করে থাকে, যেমন করে চুলোচুলি করে বাঁচে, তেমনই করতে পারবি?
পারব! এখানে আমার থাকতে কোনও কষ্ট নেই।
তা হলে দেখা তোর কাছে কী চিঠি আছে–দেখা
মরালী ওডনির ভেতর থেকে হাত গলিয়ে বার করলে একখানা কাগজ। ভাঁজ করা এক টুকরো চিঠি। চিঠিখানা হাত বাড়িয়ে দিলে নবাবকে। নবাব সেখানা খুলে পড়তে লাগল।
নবাব মির্জা মহম্মদ অনেকক্ষণ ধরে কাগজখানা পড়তে লাগল। নানিবেগমও নিচু হয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল।
মরালী বললে–সবাই এখানা কেড়ে নিতে চেয়েছে, আমি অনেক কষ্টে এটাকে সামলে রেখেছি
পড়তে পড়তে মির্জা মহম্মদ উঠে বসল। তার কপালে ঘাম জমে উঠল বিন্দু বিন্দু। নানিবেগমও একমনে পড়ছিল।
কিন্তু এ করিম খাঁ কে?
নবাব নানিবেগমের দিকে চেয়ে বললে–একরিম খাঁ কোথাকার লোক? আমি তো একে চিনি না
নানিবেগম বললে–তা হলে মেহেদি নেসারকে জিজ্ঞেস কর করিম খাঁ কে?
তা হলে তুমি যাও নানিজি, মরিয়ম বেগমকে নিয়ে পাশের কামরায় যাও, আমি ডেকে পাঠাচ্ছি—
বলে নেয়ামত খাঁ-কে ডাকলে। বললে–মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সকলকে এত্তেলা দে
*
উমিচাঁদ সাহেব শুধু সাহেব নয়, খানদানি সাহেব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দিশি পাড়ার সব মার্চেন্টদের মাথার ওপর তার জায়গা। ফিরিঙ্গিরাও তার প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে অবাক হয়ে যেত। বলত–রাজা উমিচাঁদ। রাজাই বটে। রাজার মতোই তার চালচলন। বিরাট বাড়িটার সামনে সকালে-বিকেলে ভিস্তিরা গোলাপজল ছিটিয়ে ছিটিয়ে রাস্তার ধুলো ওড়া বন্ধ করত।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উমিচাঁদের হাত দিয়ে প্রথম-প্রথম কেনা-বেচা করত। তখন ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে উমিচাঁদ সাহেবের মহা দোস্তি। রোজ একসঙ্গে ওঠাবসা, একসঙ্গে খানা-পিনা চলছে। বেভারিজ সাহেব সোরা কিনত উমিচাঁদ সাহেবের গদি থেকে। লাভের কড়ি বেশির ভাগ উঠত গিয়ে উমিচাঁদের সিন্দুকে। উমিচাঁদের সিন্দুক ফুলে-ফেঁপে একেবারে ঢোল হয়ে উঠল। কান্তকে অনেক দিন নিজে গিয়ে উমিচাঁদের গদিতে গোমস্তার সঙ্গে লেন-দেন চালাতে হয়েছে। বাড়ির বাগানে বিরাট বিরাট সব মেহগনি গাছ ছিল। কোত্থেকে সব গাছ এনে বসিয়েছিল উমিচাঁদ সাহেব। টাকাও অঢেল, মানুষটাও শৌখিন। দাড়ি-গোঁফের আড়ালে শৌখিন লোকটার আসল চেহারাটা ঠিক বোঝা যেত না। কেউ বলত ভাল, কেউ বলত শয়তান।
১৭৫৩ সাল থেকেই কোম্পানির দাদনের ব্যবস্থা উঠে গেল। তার বদলে কোম্পানির গোমস্তারা গ্রামে-গ্রামে গিয়ে আড়ঙের মাল নিজেরা দেখা-শোনা করে কেনাকাটা আরম্ভ করলে। তাতে মুনাফা বাড়ল কোম্পানির। কিন্তু লোকসান হতে লাগল উমিচাঁদের।
তখন থেকেই ঝগড়াটা শুরু হল। শেষ হল কেল্লার মধ্যে উমিচাঁদকে বন্দি করে।
কিন্তু সে অনেক আগের কথা। তারপর উমিচাঁদের সেবাড়ি আবার সেজেগুজে প্রাসাদ হয়ে উঠেছে। জগমন্ত সিং নেই, কিন্তু অন্য দারোয়ান আছে। আবার উমিচাঁদ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আবার খোরাসান কাবুল কান্দাহার থেকে শুরু করে সুতানুটির গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত তার নৌকো মাল নিয়ে আমদানি রপ্তানির কাজ করছে। আবার ফিরিঙ্গি কোম্পানির সাহেবরা যাতায়াত শুরু করেছে তার বাড়িতে।
