তুমি তো চেহেল-সুতুনে থাকো, তুমি কী করে এত জানলে?
আপনার চেহেল-সুতুনের সবাই সবকিছু জানে।
তারপর একটু থেমে বললে–আর তা ছাড়া আমি যা জানি, এখানে এত লোকের সামনে তা বলতে পারব না, আমায় বলতে বলবেন না আপনি দয়া করে।
নবাবের হুকুম, তোমায় বলতে হবে।
আমায় বলতে বলবেন না আপনি!
আবার বলছি আমি নবাব, নবাবের হুকুম, তোমাকে বলতেই হবে।
মরালী এবার হঠাৎ বলে উঠল–আপনি নবাব নামের কলঙ্ক!
আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল কোতোয়ালির ছাদটা যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ল মেঝের ওপর। যে-যেখানে ছিল সবাই চমকে উঠেছে। এত বড় কথা দিল্লির বাদশাও বুঝি বলবার সাহস করত না কখনও। এত বড় কথা বুঝি নবাব আলিবর্দি খাঁ-ও কখনও বলতে সাহস করেনি নবাবজাদাকে! তুমি আমি আর পাঁচজন যখন সবাই নবাবকে খোশামোদ করে আরও প্রতিষ্ঠা আরও প্রতিপত্তির লালসায় মিথ্যেকে সত্যি বলে প্রিয়ভাজন হবার চেষ্টা করছি, তখন এ-মেয়েটার এত বড় সাহস হল কেমন করে? তবে এ কি আরও বেশি প্রতিষ্ঠা চায়? আরও বেশি প্রতিপত্তি? আমাদের সকলকে ছাপিয়ে ও কি অপ্রিয় কথা বলে নবাবের নজরে পড়তে চায়?
ওকে মতিঝিলে পাঠিয়ে দাও
বলে নবাব আবার চলে যাচ্ছিল। কিন্তু কী যেন মনে পড়ে যেতেই বললে–আর ওকেও—
বলে কোতোয়ালির বাইরে চলে গেল নবাব। আবার হাতির পিঠে গিয়ে উঠল।
*
এতদিন বাইরে ছিল নবাব, কিন্তু মুর্শিদাবাদের ভেতরে এই ক’দিনের মধ্যেই যেন সমস্ত কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। ফিরিঙ্গি কোম্পানির কাছ থেকে চিঠি এসেছে। ক্লাইভ বরানগরে এসে বসে আছে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কলকাতার কেল্লায় ঢুকে পড়েছে। কেল্লার ভেতরে যে মসজিদ তৈরি হতে শুরু হয়েছিল তাও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। চারদিকে সব ছারখার হয়ে গেছে। তুমি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব, তুমি কোথায় এখন? তুমি যা-যা বলেছিলে আমি তো বর্ণে বর্ণে তা পালন করে আসছি জাঁহাপনা। ওরা ফিরিঙ্গি, ওদের তো আমি হিন্দুস্থান থেকে তাড়াতে চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম ওরা আমাকে নবাব বলে মানুক। ওরা জানুক যে হিন্দুস্থানের মালিক ওরা নয়, হিন্দুস্থানের মালিক আমি। আমি আরও চেয়েছিলাম যে ওরা বুঝুক এখানে নবাব বলে একজন আছে, তার ফার্মান নিয়ে তবে কারবার করতে হয়, কেল্লা বানাতে হয়, তাকে অগ্রাহ্য করলে এখানে টেকা যায় না; এখানো সোরা, রেশম, নুন, গলার ব্যাবসা উঠিয়ে দিয়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে হয়। আমি তো আর কিছু চাইনি। ওরা যে আমার মসনদ নিতে চায় নবাব! ওরা যে আমায় উৎখাত করতে চায়! তবু আমি কিছু বলতে পারব না? আমি তোমার কাছেই যুদ্ধ করতে শিখেছি। তুমিই আমায় শিখিয়ে গেছ যে রাজনীতিতে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই। রাজনীতি হল কূটনীতি। কূটনীতির গতি বড় কুটিল, বড় জটিল। আমি তো তাই কুটিল হয়েই কোম্পানির সঙ্গে লড়াই শুরু করেছি। বলল, এখন আমি কী অন্যায় করলাম, আমি কোন অপরাধ করলাম?
মির্জা।
সমস্ত দিনটা বড় অশান্তিতে কেটেছে। রাজা মানিকচাঁদ এসে সমস্ত খবর জানিয়ে গেছে। মতিঝিলের দরবার-ঘরে তখন সবে একটু বিশ্রামের স্বপ্ন নেমে এসেছে। ঠিক হয়েছে শেষপর্যন্ত যুদ্ধই করতে হবে আবার। তবে এবার আর দুদিকে নয়, একদিকে। পূর্ণিয়ার দিক থেকে আর কোনও ভয় নেই। এবার মোহনলালের সঙ্গে থাকবে চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার, ষাট হাজার পায়দল ফৌজ, গোটা পঞ্চাশেক হাতি আর তিরিশটা কামান। এবার শেষ করে দিতে হবে কোম্পানিকে। সেবার যেমন দয়া-মায়া দেখিয়েছিল, এবার আর তা নয়।
মির্জা!
নানিবেগম ঘরে ঢুকল।
তুই যে চেহেল্-সুতুনে গেলি না?
নানিবেগমকে দেখে আর থাকতে পারলে না মির্জা। দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
নানিবেগমের চোখ দুটো কিন্তু শুকনো, খটখটে। বুকের মধ্যে তখনও মির্জা মুখ গুঁজে কাঁদছে। শুধু মির্জার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে নানিবেগম বলে-ময়মানা এসেছে রে মির্জা, চেহেল্-সুতুনে এসেছে। কিন্তু সে কথা বলতে আসিনি
মির্জা মুখ তুলল–আর কী বলবে বলো নানিজি!
আমার খত পেয়েছিলি?
হা নানিজি, তোমার খত্ পেয়েই তো মুর্শিদাবাদে এসে সোজা কোতোয়ালিতে গিয়েছিলুম। মরিয়ম বেগমকে নিয়ে এসেছি মতিঝিলে!
তার কাছে যে-চিঠি আছে সেটা দেখেছিস?
না, এখনও সময় পাইনি নানিজি! রাজা মানিকচাঁদ এসেছিল, তার সঙ্গে পরামর্শ করতেই অনেক সময় কেটে গেল। তারপর একটু তন্দ্রা এসেছিল আমার, এবার ডাকব মরিয়ম বেগমকে।
মরিয়ম বেগমের সঙ্গে আর কাকে ধরে এনেছিস?
আর একটা ছোকরা নানিজি! যার কথা তুমি লিখেছিলে। ওকে নানিজি?
নানিবেগম বললে–বোধহয় ওর দেশের লোক। ওর সঙ্গে ওর খুব পেয়ার আছে, ওর কাছেই তো গিয়েছিল মেয়ে
কিন্তু ও কোয়োয়ালিতে কী করছিল? সেখানে মেহেদি নেসারের সঙ্গে হাতাহাতি করছিল কেন?
নানিবেগম বললে–তা জানি না ।
তোমার চিঠি পেয়ে আমি আর কোতোয়ালিতে ওকে রাখতে সাহস করলাম না। সবাই মিলে আমাকে বিপদে ফেলবার চেষ্টা করছে। আমি কতদিক সামলাই বলো তো? একলা সব দিকে তো দেখা যায় না।
নানিবেগম বললে–ভাল ভাল লোকের হাতে কাজের ভার দিয়ে দে
কার হাতে ভার দেব? কাকে বিশ্বাস করব বলো তো নানিজি? যাকে বিশ্বাস করব সে-ই আমার। বিরুদ্ধে লোক খেপাবে। শওকতকে যে আজ মেরে ফেলতে হল, এ কি আমি করতুম? সবাই তাকে খোশামোদ করে করে আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছিল। শওকত মুখে মুখে বলে বেড়াত বাংলাদেশ জয় করে অযযাধ্যার সুজাউদ্দৌলা আর উজির গাজিউদ্দিনকে হারিয়ে নিজের পছন্দমতো লোককে অযোধ্যার বাদশা বানাব, তারপর লাহোর কাবুল জয় করে খোরাসানে গিয়ে রাজধানী। বসাব বাংলাদেশের জলহাওয়া খারাপ! লোকেরাই তো তাকে এত আহাম্মক করে তুলেছিল, নইলে ও তো ছোটবেলায় এত বোকা ছিল না–
