পিরালি খাঁ তন্দ্রা ভেঙে লাফিয়ে উঠল–ক্যা হুয়া?
একটানা-একটা দুর্ঘটনা না ঘটলে এমন করে কেউ পিরালি খাঁ-কে ডাকে না।
ক্যা হুয়া?
ময়মানা বেগমসাইেবা আয়ি।
ময়মানা বেগমসাহেবা!
হ্যাঁ, নানিবেগমসাহেবা এত্তেলা দিয়েছে!
তাড়াতাড়ি মাথায় পাগড়িটা পরে নিলে পিরালি খাঁ। পূর্ণিয়ার শওকত জঙ বাহাদুরের মা, বউ, সবাই এসে গেছে।
পিরালি খাঁ সোজা গিয়ে ফটকের সামনে দাঁড়াল। হাতির পিঠ থেকে নেমে আলিবর্দি খাঁ সাহেবের বিধবা মেয়ে তখন তাঞ্জামে উঠছে। তাঞ্জামে করে চেহেসূতুনের ভেতরে আসবে! অস্পষ্ট কান্নার শব্দে গুনগুন করে উঠছে আবহাওয়া। সেই ভোররাত্রেই যেন বড় করুণ হয়ে উঠল চেহেল্-সুতুন। আলিবর্দি খাঁ’র তিন মেয়ের মধ্যে, দু’মেয়ে চেহেল-সুতুনেই ছিল এতদিন। এবার আরও এক মেয়ে এল। একেবারে অনাথ হয়ে এল। শুধু মেয়ে নয়, পূর্ণিয়ার হারেমের অন্য বেগমসাহেবারাও এল। একেবারে হারেম জমজমাট হয়ে উঠল। নানিবেগমের মনটাও হুহু করে উঠল ময়মানাকে দেখে। তবু প্রাণ ভরে কাঁদবারও উপায় নেই যেন।
সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল আমিনা বেগম।
তাকে যেন দেখেও দেখল না ময়মানা। এরই ছেলে তাকে অনাথ করেছে। মির্জা মহম্মদ! যেন সমস্ত দোষটাই আমিনার। যেন আমিনাই শিখিয়ে দিয়েছে নিজের ছেলেকে।
আর সেই সময়ে নহবতখানায় ইনসাফ মিঞা নহবতে সুর ধরলে–মিঞা-কি-মলহার।
আর সঙ্গে সঙ্গে সারা মুর্শিদাবাদে সাড়া পড়ে গেল। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা হেবাৎ জঙ বাহাদুর মির্জা মহম্মদ আলমগির কি ফতে–এ-এ-এ-এ
আর সামনে-পেছনের সবাই চিৎকার করে উঠল একসঙ্গে ফতে—
হাতির মিছিলের মাথায় বসে ছিল নবাব। হাতির মিছিল মতিঝিলের দিকেই যাচ্ছিল। হাতিরা কলকাতাতেই যাক আর পূর্ণিয়াতেই যাক, ফিরে এসে এই মতিঝিলের দিকেই তাদের গতি। তাদের সে-পথ মুখস্থ হয়ে গেছে। আলিবর্দি খাঁর আমলেও সেই নিয়ম ছিল, নবাব মির্জা মহম্মদের আমলেও সেই একই নিয়ম আছে।
কিন্তু কোতোয়ালির সামনে আসতেই নবাব হুকুম দিলে এখানে থামো
সবাই অবাক হয়ে গেল। রাজা মোহনলাল, মিরজাফর, দুর্লভরাম সবাই অবাক। এ আবার মির্জার কী খেয়াল! কোতোয়ালিতে ঢুকবে নাকি নবাব।
লম্বা কাঠের সিঁড়িটা এনে লাগানো হল হাতির পিঠে।
নবাব সেই অবস্থাতেই সেই কাঠের সিঁড়ি দিয়ে কোতোয়ালির চবুতরে নামতে লাগল।
.
মুর্শিদাবাদ তো শুধু একা নবাবের নয়। মুর্শিদাবাদ কারও একলার ইচ্ছেয় চলে না। একলার ইচ্ছেয় চললেও একলার চালনায় চলে না। তার জন্যে বিভিন্ন আমির-ওমরাহ আছে। ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ আছে। এ অনেকটা এই দেহযন্ত্রের মতো। তার বিভিন্ন বিভাগের চালনার জন্যে বিভিন্ন ছোট ছোট যন্ত্র আছে। আবার সেগুলোকে চালনার জন্যে আরও বড় বড় যন্ত্র আছে। সেই বড় বড় যন্ত্রগুলোর মাথার ওপরে সবচেয়ে যে বড় যন্ত্রটা কাজ করে তারই নাম হল নবাব।
মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা হেবাৎ জঙ বাহাদুর আলমগির অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাসে সেইরকম সবচেয়ে একটা বড় যন্ত্র!
সে-যন্ত্রকে শ্রদ্ধা যেমন করতে হয়, সম্মান যেমন করতে হয়, তেমনই আবার ভয়ও করতে হয়। কারণ ভয় না করলে তার হুকুম পালন করতে যে আমাদের দ্বিধা হবে। আর দ্বিধা হলেই আর মুর্শিদাবাদ চলবে না। এখানে ভয়টা রাষ্ট্র-চালনার পক্ষে অপরিহার্য অঙ্গ।
এবার কিন্তু সেই ভয়ের ওপরেই হস্তক্ষেপ হয়েছে।
একদিন দাক্ষিণাত্য-নিবাসী এক অখ্যাত ব্রাহ্মণ-সন্তান যে মসনদের পত্তন করেছিলেন এই মুর্শিদাবাদে, সেই নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ’র মাথাতেই যেন কেউ থুথু ফেলেছে। যেন সেই পরলোকগত আত্মা বেহেস্ত থেকে নেমে এখানে জবাবদিহি চাইতে এসেছে।
কোতোয়াল সাহেব একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে খানিকক্ষণের জন্যে। তার পরেই খাড়া হয়ে কুর্নিশ করেছে।
অন্ধকার ফটকের ভেতরে মরালী তখন একসঙ্গে দু’জনের সঙ্গে যুঝছে। মেহেদি নেসার থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল খবর পেয়েই। কিন্তু কান্ত ছাড়েনি। কান্ত নেসারের হাত দুটো তখনও জাপটে ধরে আছে।
ইয়ে কৌন?
কান্ত নবাবকে বোধহয় চিনতে পারলে।
কোতোয়াল সাহেব সামনে এগিয়ে এসে বললে–খোদাবন্দ, এ বাহারকা ফালতু আদমি, কোতোয়ালির ভেতরে ঘুষে গেছে
আউর তুম?
মেহেদি নেসার বললেনবাব, এ বেগমসাহেবা সফিউল্লাকে খুন করেছে, একে আমি জেরা করছি
জেরা? জেরা তো আদালতে করবে উকিল। তুমি কোতোয়ালিতে এসে জেরা করছ কেন?
কাজিসাহেবের অনুমতি নিয়ে এসেছি আমি, নবাব।
নবাব কান পেতে শুনল কথাটা। তারপর মরালীর দিকে ফিরে বললে–ওর তুম?
মরালী মাথা নিচু করে ছিল। সকলের মনে হল সারা কোতোয়ালিটাই যেন তখন নবাবকে দেখে লজ্জায় হতাশায় মাথা নিচু করে ফেলেছে।
জবাব দিচ্ছ না কেন? জবাব দাও?
কোতোয়াল মাথা বাড়িয়ে নবাবের হয়ে যেন ধমক দিয়ে উঠল।
নবাব বললে–তুমি থামো। আমি হুকুম দিচ্ছি, জবাব দাও, কে তুমি? কৌন তুম?
মরালী তবু মাথা নিচু করে রইল।
এবার মরালী মুখ তুলল। বলল–জবাব আমি কাকে দেব?
কেন, আমি জিজ্ঞেস করছি, আমার কাছে জবাব দেবে!
মরালী ঘাড় বেঁকিয়ে বললে–আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না।
কী করে জানলে আমি তোমার কথা বিশ্বাস করব না?
আপনি যে সংসারে কাউকেই বিশ্বাস করেন না!
তুমি তা কী করে জানলে?
মরালী বললে–আমি সব জানি। আপনার সম্বন্ধে আপনি নিজেও যা জানেন না, আমি তাও জানি!
