কিন্তু কান্ত ভেবে অবাক হল, হঠাৎ মরালী তাকে ডাকতে গেলই বা কেন?
আসুন!
লোকটা পেছনের দরজা দিয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর সুড়ঙ্গ রাস্তা। সেখানে যেতেই মরালীর গলা শুনতে পেলে। মেহেদি নেসারের গলাও শুনতে পাওয়া গেল। যেন দুজনে খুব ঝগড়া হচ্ছে।
ও কে?
লোকটাও বোধহয় অবাক হয়ে গেছে। সেও বোধহয় অবাক হয়ে গেছে মেহেদি নেসার সাহেবের গলা শুনে। সে আর এগোল না। কিন্তু কান্ত সেই গলার আওয়াজ অনুসরণ করে এগিয়ে গেল। তারপর এঁকেবেঁকে যেতে যেতে একেবারে সোজা ফটকের সামনে এসে হাজির। সেখানে তখন কোতোয়াল সাহেব বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আর মেহেদি নেসার সাহেব মরালীর হাত ধরে টানাটানি করছে।
কান্ত আর থাকতে পারলে না। সেও সামনে গিয়ে মেহেদি নেসারের ওপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল।
*
নানিবেগম চেহেল্-সুতুনে এসে সেই ভোরবেলাই পিরালি খাঁ-কে ডাকলে।
পিরালি খাঁ’র মেজাজ বলে একটা জিনিস আছে। পিরালি খাঁ আলিবর্দি খাঁর আমলের সর্দার খোঁজা। নবাবি আমলের খানদানি খিদমদগার। অনেক আসরফি জমিয়েছে নিজের খাশ সিন্দুকে। এখনই যদি খোঁজাগিরি চলে যায় তো কারও পরোয়া করবার দরকার নেই। সোজা নিজের দেশে চলে যাবে। তালুক কিনবে, সেখানে নিজেই আবার আর একটা চেহেল্-সুতুন বানাবে। সেখানকার চেহেল্-সুতুনে আবার নবাব হয়ে বসবে। আর তা ছাড়া জগৎশেঠজির কারবারেও পিরালি খাঁর অনেক টাকা খাটছে, সেখান থেকেও অনেক আমদানি হয় তার।
কিন্তু এবার বোধহয় সত্যি সত্যিই পিরালির নোকরিটা চলে যাবে। নইলে জুবেদার ব্যাপারে অনেকখানি অপমান মাথা পেতে হজম করতে হয়েছে। এরকম অপমান এই-ই প্রথম। কোথাকার কোন হাতিয়াগড়ের রানিবিবি এসে তার সমস্ত ইজ্জত একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিলে। আগে সমস্ত বেগমসাহেবরা এসে সবাই তাকে খাতির করেছে। কিন্তু মরিয়ম বেগমসাহেবা আসার পর থেকেই যেন সব উলটেপালটে গেল। চেহেল্-সুতুনের ভিত পর্যন্ত নড়িয়ে দিলে একেবারে মরিয়ম বেগম।
নজর মহম্মদ যা রোজগার করে তারও ভাগ দেয় পিরালি খাঁ-কে।
বলে-মামুলি! মামুলি নাও সর্দার!
তা যত বাইরের ছোকরা আমদানি হয়, তার ভাগ দিয়েও নজর মহম্মদের নিজের ভাগে অনেক থাকে। তারও সিন্দুক আছে। সেখানে সে মোহর জমায়।
কিন্তু এসব টাকা আবার অনেক খোয়াও যায়। খোজাদের টাকার ওয়ারিশন কে-ই বা থাকে। একদিন যখন কবরে যায় তারা, তখনই সে টাকার ভাগাভাগি হয়ে যায় রাতারাতি। এমনি করে যে পুরুষানুক্রমে কত মোহর জমেছে পিরালির কাছে, তার আর গোনাগুনতি নেই।
এমনি যখন অবস্থা তখন হঠাৎ কোথাকার কোন মরিয়ম বেগম এসে তার ইজ্জত ধরে নাড়া দিলে। সর্দারের আঁতে সেদিন বড় ঘা লেগেছিল। কিন্তু নবাবজাদা মির্জার ইজ্জতের দিকে চেয়ে মুখ বুজে ছিল–কিছু বলেনি পিরালি খাঁ!
এবার আর কোনও রাগ নেই পিরালি খাঁ’র মনে।
এবার পিরালি খাঁ রাত্রে বিছানায় শুয়ে দম ভোর সিদ্ধি খায়। ওই একটাই নেশা পিরালি খাঁ’র। চেহেল্-সুতুনে যখন সবাই নেশায় ঢুলুঢুলু করে, তখন পিরালি খাঁ একটা বাটিতে সিদ্ধির শরবত চুমুক দিতে দিতে স্বপ্ন দেখে তালুকদারির। নজর মহম্মদ, বরকত আলির ওর চেহেল্-সুতুন ছেড়ে দিয়ে তখন একটু সামান্য মৌজ করে। চোখ দুটো বুজিয়ে নেয়।
কিন্তু সব দিন তা হয় না। ভোরের দিকের একটুখানি নেশা তাও এক-একদিন জমে না। তার আগেই পেশমন বিবির ঘর থেকে হল্লা ওঠে। কিংবা তক্কি বেগমসাহেবার ঘর থেকে গালাগালির চিৎকার কানে আসে। তখন আবার গিয়ে সব ঠান্ডা করতে হয়। নইলে নানিবেগম আবার চটে যাবে। নানিবেগম আবার ডেকে পাঠিয়ে দুটো কথা শোনাবে। কারও কথা শুনতে পিরালি খাঁ রাজি নয় জীবনে।
নইলে সব তো জানে পিরালি খাঁ।
কোন বেগমসাহেবার ঘরে কী ঘটছে তা তো জানতে তার বাকি নেই। নতুন যে ছোকরা আসত মরিয়ম বেগমের ঘরে, তাকেও চিনে রেখে দিয়েছিল পিরালি খাঁ। ছোকরাটা ঠান্ডা মেজাজের। সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকানে থাকত আর নিজামত কাছারিতে কাজ করত। মরিয়ম বিবির সঙ্গে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করতে গিয়েই সব গণ্ডগোল করে ফেললে।
দোষটা বরকত আলির।
তুই কেন নিয়ে গেলি মরিয়ম বেগমসাহেবাকে? তাকে চেহেল সুতুনের বাইরে নিয়ে গিয়ে তোর কী কাম?
বরকত আলি বলেছিল–সর্দার, বেগমসাহেবা যে মুহব্বত করছে ওই ছোরার সঙ্গে
তা মুহব্বত করছে তো করুক না, চেহেল্-সুতুনের ভেতরে মুহব্বত হয় না?
ও ছোকরাবাবু যে আসছিল না। দিমাগ বিগড়ে গিয়েছিল মরিয়ম বিবির! আর পেশমন বেগমসাহেবা আমাকে মোহর দিলে, আমি কী কসুর করলুম সর্দার!
তা, নিয়ে গেলি তো সফিউল্লা খাঁ সাহেবের নাম করলি কেন? অন্য দুসরা নাম দিতে পারলি না?
হঠাৎ ওই নামটা মনে পড়ল যে সর্দার। নইলে এত নাম থাকতে ওনাম ইয়াদ আসবে কেন? ওই-ই তো নসিব! ওকেই তো নসিব বলে সর্দার, সফিউল্লা খাঁ সাহেব ভি ওই বখত ওখানে আসবে কেন?
পিরালি খাঁ কিন্তু মনে মনে খুশি।
বলে ঠিক করেছিস, আচ্ছা করেছিস, বহুতখুব কাম করেছিস
বলে আর এক-একবার চুকচুক করে সিদ্ধির শরবতে চুমুক দেয়। তখন ভোর হয়-হয়। তখন একটু তন্দ্রা আসে পিরালি খাঁ’র। তন্দ্রা মানে একই স্বপ্ন। নবাবিআনার স্বপ্ন।
সেই স্বপ্নের মধ্যেই হঠাৎ নজর মহম্মদ এসে ডাকল–সর্দারজি, সর্দারজি
