কান্ত চুপ করে রইল। তবে কি রানিবিবি কলকাতায় আছে?
বশির বললে–আমার তাড়া আছে ইয়ার, আমি খবরটা আমার ফুপাকে দিয়ে আসি যে হাতিয়াগড়ের রাজাসাহেব মুর্শিদাবাদে এসেছে।
কান্ত বললে–তোর সঙ্গে একটু জরুরি কথা ছিল ভাই
কী কথা, জলদি বল!
আমাকে এক হাজার আসরফি পাইয়ে দিবি ইয়ার? খুব দরকার ছিল আমার।
এক হাজার আসরফি? তুই বলছিস কী? এক হাজার আসরফি আমি নিজে কখনও চোখে দেখেছি?
কান্ত বললে–কিন্তু আমার যে দরকার!
কীসের দরকার তোর? এত আসরফি নিয়ে তুই কী করবি? বিবি পুষবি?
না!
তা হলে কীসের কাম তোর? খুলে বল!
কান্ত বললে–খুলে বলতে পারব না ভাই। আমার জীবন দিয়েও যদি হাজার আসরফি পাওয়া যেত তো তাও দিতুম! কিন্তু আমার জীবনের আর দাম কী বল! কানাকড়ি!
কিন্তু কী করবি তুই অত টাকা নিয়ে, বল না!
কান্ত বললে–সে কথা আমাকে জিজ্ঞেস করিসনি। আমাকে কেটে ফেললেও আমি তা বলতে পারব না ভাই, আমি নাচার–শুধু টাকাটা পাইয়ে দে
চকবাজারে তখন বেশি ভিড় নেই। মুর্শিদাবাদের রাস্তায় ভিড় শুরু হয় বেলা করে। দোকান-পসারিরা বেলা করে সওদা কেনা-বেচা করে। আগের রাত্রে অনেকক্ষণ ফুলওয়ালারা ফুল বেচেছে। গণতকারেরা রেড়ির তেলের আলো জ্বালিয়ে ভাগ্য গুনেছে, তাই পরের দিন ঘুম থেকে উঠতে তাদের দেরি হয়। তারপর দেরি করে কাছারি খোলে। শুধু দুপুরবেলা কয়েক ঘণ্টার জন্যে কাছারি বন্ধ থাকে। তারপর বেলা তিন প্রহর থেকে আবার কাছারি খুলবে। তখন যারা বাইরে থেকে মুর্শিদাবাদে আসে তারা সওদা করতে বেরোয়।
কিছুতেই দিতে পারবি না তুই?
বশির মিঞার বোধহয় বাজে কথা শোনবার সময় ছিল না। সে হনহন করে এগিয়ে গেল। আর ফিরে তাকাল না।
কান্ত চুপ করে সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আবার পেছন ফিরল। তারপর আবার ফিরে আসতে লাগল সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের দিকে। রাস্তার ধারে তখন সবে একজন গণতকার আসন পেতে বসতে শুরু করছে। লোকটাকে অনেক দিন ধরে দেখে আসছে কান্ত। বুড়ো লোক। অনেক লোক ভিড় করে তার সামনে।
লোকটাও কান্তর দিকে চাইলে একবার। চেয়েই বললে–মশাই, অত ভাববেন না!
কান্ত চমকে উঠল। সে যে আকাশ-পাতাল ভেবে বেড়াচ্ছে তা লোকটা কেমন করে জানতে পারলে! তা হলে তার মুখে-চোখে কি দুর্ভাবনার ছাপ পড়েছে!
মঙ্গল আপনার কুপিত হয়েছেন। আপনি অশেষ ভাগ্যবান মশাই, আপনি অমূল্য রত্ন হারিয়েছেন, কিন্তু আবার অমূল্য রত্ন পেয়েছেন।
কেমন যেন অভিভূত হয়ে গেল কান্ত লোকটার কথা শুনে। লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর লোকটা বললে–বসুন না–বসুন-মশাই খুব ভাগ্যবান ব্যক্তি।
তখনও কেউ খদ্দের জোটেনি। কান্তর কৌতূহল হল। বললে–আমার কাছে তো এখন কিছু নেই
লোকটা বললে–না-ই বা থাকল, পরে দেবেন—
কান্ত বললে–আমি কিন্তু গরিব লোক, ছটাকা মাইনে পাই, বেশি কিছু দিতে পারব না—
লোকটা বললে–আপনাকে কিছু বলতে হবে না মশাই, আমি সব দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি–
বলে কী যে অঙ্ক কষতে লাগল একটা পাথরের ওপর। বললে–অত ভাবেন কেন বলুন তো আপনি? আপনার তো ভাবার কিছু নেই। মঙ্গলের লোক কখনও ভাবে? এগিয়ে যান ঘুষি পাকিয়ে। কাউকে ভয় করবেন না। লগ্নের ওপর মঙ্গল রয়েছে, বৃহস্পতি সহায়। আপনার স্ত্রী নিয়ে একটু বিপদ আছে, সাবধানে থাকবেন!
স্ত্রী! স্ত্রী তো আমার নেই!
লোকটা মাথা নাড়তে লাগল।
নেই বলছেন কী! নিশ্চয় আছে। আপনি বিবাহ করেছেন আর বলছেন নেই?
কান্ত বললে–দেখুন, আমি মিথ্যে কথা বলতে যাব কেন, আমার বিয়ের সময় গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল, তারপর আর বিয়ে হয়নি!
যার সঙ্গে বিয়ের গণ্ডগোল হয়েছিল, তাকেই আবার বিয়ে করেছে তো?
কান্ত বললে–না
তার সঙ্গেই বিয়ে হবে আপনার, যান!
কান্ত আরও অবাক হয়ে গেল। বললে–তার সঙ্গে আবার কী করে বিয়ে হবে? তার তো একবার বিয়ে হয়ে গেছে!
গণতকারটা বললে–তা জানিনে মশাই, তবে এটুকু জেনে রাখুন, কেউ আপনাকে হারাতে পারবে! সেই বিবাহিতা কন্যার সঙ্গেই মশাইয়ের বিবাহ হবে।
সেকী?
যা বলছি ধ্রুব সত্য!
কিন্তু সে যে অসম্ভব! তারও ধর্ম নষ্ট হবে, আমারও ধর্ম নষ্ট হবে যে। আমাদের দুজনেরই যে জাতিপাত হবে!
জাতিপাত হবে না। জাতিপাতের আশঙ্কা আপনার নেই। আপনার আশঙ্কা শুধু জলে।
জল মানে?
জল থেকে দূরে থাকবেন আর কী। জলই আপনার শত্রু।
কান্তর মনে পড়ল ছোটবেলায় একবার জলে ডুবে যাচ্ছিল। বর্গিদের হাঙ্গামার সময় কোনও উপায়–পেয়ে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আর তারপরেই এসে বেভারিজ সাহেবের কাছে সোরার গদিতে চাকরি পেয়েছিল।
কান্ত উঠে আসছিল। হঠাৎ একটা লোক এসে ডাকলে। রাস্তার একধারে নিয়ে গিয়ে বললে–আপনার নাম কান্ত সরকার?
কান্ত বললে–হ্যাঁ,
আপনাকে ডাকছেন একজন কোতোয়ালিতে।
কে?
মরিয়ম বেগমসাহেবা! আজ ভোররাত্তিরেই আমাকে খবর দিয়েছেন ডাকতে, আপনাকে পাইনি। দোকান বন্ধ ছিল। সারাফত আলির চাকরটা নানান কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। বড় হুজ্জৎ করছিল বলে আমি চলে গিয়েছিলাম। এখন আপনাকে দেখতে পেলুম!
তুমি কে?
লোকটা বললে–আমি কোতোয়ালির নোকর, তদারকি করি, বেগমসাহেবার বড় তকলিফ যাচ্ছে
কান্ত বললে–তা হলে চলো
লোকটা আগে আগে চলতে লাগল। সকালবেলার শহর তত জমজমাট নয়, তবু কান্তর মনে হল অন্যদিনের চেয়ে যেন শহরটা আরও নিঝুম হয়ে গেছে। যেন সবাই বুঝতে পেরেছে। একজন মানুষকে এরা এখানে বন্দি করে রেখেছে, এখানে তাকে ফাঁসি দেবে, এখানে তার শ্বাসরোধ করে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে, তা যেন জানতে পেরেছে সবাই। অথচ কেউ তাকে বাঁচাবার নেই। কারও কিছু করবার নেই। সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছে। রোজ যেমন করে ভোর হয় তেমনি করেই ভোর হয়েছে, তেমনি করেই লোক-জন-পসারি এসে জুটছে বাজারে। বাঁকে করে ভারীরা নদী থেকে জল তুলে আনছে মাটির কলসিতে। রাস্তার ধুলোর ওপর জল পড়ছে টপ টপ করে। অন্য দিন এসব দৃশ্য দেখেছে কান্ত, কিন্তু এমন করে কখনও চোখ ভরে দেখেনি। মরালীর ফাঁসি হবার পর কান্তও যেন এসব এমন করে আর দেখতে পাবে না। মরালীর সঙ্গে সঙ্গে সেও যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এ-পৃথিবী থেকে। কোতোয়ালির সামনে বেশ নিরিবিলি তখন। লোকটা বললে–আপনি পেছনের দরজা দিয়ে আসুন হুজুর, আমি ওদিকে গিয়ে খিড়কি খুলে দিচ্ছি–
