কিন্তু সেই আদুরিই সেবার হঠাৎ মারা গেল।
চোত-বোশেখ মাসে হাতিয়াগড়ের খাল-বিল শুকিয়ে যায়। আগের বর্ষাতেও তেমন বৃষ্টি হয়নি। শোভারাম ছাতিম গাছতলাটায় গিয়ে আদুরিকে বেঁধে রেখে এসেছিল। বেঁধে না রাখলে আবার বড়মশাইয়ের মুসুরির খেতে গিয়ে মুখ দেবে। বিকেল নাগাদ বড়মশাইয়ের বাড়ি থেকে কাজ সেরে এসে আদুরিকে আনতে গিয়ে দেখে আদুরি মরে পড়ে আছে।
ব্যাপারটা সহজে মিটল না। একে গাই-গোরুটা গেল, তার ওপর বড়মশাইয়ের বকুনি। গোবধ গোহত্যার দরুন প্রায়শ্চিত্ত যা করার সবই করতে হল শোভারামকে, কিন্তু তাতেও দুর্গতির শেষ হল না। বউটাও মারা গেল দু’মাস বাদে। পরের আষাঢ়ে। বউ মরল তাতে ক্ষতি নেই, একটা ছ’মাসের মেয়ে রেখে শোভারামকে একেবারে অনাথ করে চলে গেল।
এ-সব এ-গল্প আরম্ভ করার বহু আগের ঘটনা।
হাতিয়াগড়ে এখন সে-সব দিন বদলে গেছে। সে বড়মশাইও নেই। বলতে গেলে বড়মশাই চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সে-হাতিয়াগড়ও আর সে-হাতিয়াগড় নেই। এখন ছোটমশাই আছে, বড়মা আছে, আর ছোটমা আছে। সেই রাজবাড়িটাও আছে, সেই কেল্লাফটকও আছে, সেই ছাতিমতলার ঢিবি আছে, সেই গড়ের দিঘি আছে। আর আছে শোভারাম। আর আছে শোভারামের মেয়েটা।
ছোটমশাই জিজ্ঞেস করেছিলেন–মেয়ের কী নাম রাখলি শোভারাম?
শোভারাম বলেছিল–আজ্ঞে ছোটমশাই, ওর নাম আর কী রাখব, ও মাকে খেয়েছে, আমাকেও খেয়ে তবে ছাড়বে–তাই ওর নাম আর কিছু রাখিনি–
তা ডাকিস কী বলে?
খুকি বলে!
তা হোক, আমি ওর নাম রাখলাম বিন্দুমতী!
শোভারাম বলেছিল–আজ্ঞে ও-নাম আমি উশ্চারণ করতে পারব না ছোটমশাই—
তা উচ্চারণ না করতে পারিস তো বিন্দু বলে ডাকিস!
কী আর করা যাবে, ছোটমশাইয়ের দেওয়া নাম তো আর অপছন্দ করা যায় না। তা তাই-ই সই। বিন্দু বিন্দুই সই। বিন্দুবালা দাসীই না-হয় নাম হল। শোভারাম ভেবেছিল ভারী তো একটো একটা মা-মরা বুড়ো বয়সের মেয়ে, তার আবার অত নামের বাহারেরই বা দরকার কী। কিন্তু পরের দিনই ছোটমশাই আবার ডেকে বললেন–ওরে শোভারাম, ও বিন্দুমতীনামটা চলবে না রে তোর মেয়ের–
কেন হুজুর?
কেন যে বিন্দুমতী নাম চলবে না তা আর খুলে বললেন না ছোটমশাই। রাত্রিবেলাই বড়গিন্নি শুনে বলেছিলেন–সেকী? বিন্দুমতী যে আমার দিদিমার বোনের নাম, নফরের মেয়ের সেই একই নাম দিলে তুমি?
ছোটমশাই বলেছিলেন–তাতে কী হয়েছে? আর সে কি আমার মনে আছে, না কারও মনে থাকে–
বড়মা বলেছিলেন–না না, ছি, ও-নাম দিতে পারবে না, ওকে ডেকে তুমি বলে দিয়ো—
তা শেষপর্যন্ত নাম দেওয়া হল–মরালী!
বড়গিন্নিকে ডেকে ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলেন–মরালী বলে তোেমাদের বংশে কারও নাম ছিল তো?
বড়গিন্নি বললেন–না—
ছোটগিন্নিকেও ডাকা হল। তিনিও বললেন–না, ওনামে আমাদের কেউ নেই—
রাজবাড়ির পূর্বপুরুষের কোথাও কোনও কুলে কারও ওনাম পাওয়া গেল না। রাজবাড়ির বউদের সাতকুলেও ওনামের কেউ নেই। সুতরাং আর কোনও আপত্তি নেই। শোভারামের মেয়ের ওই নামই বহাল রইল। সেই মরালী থেকে ক্রমে মরো হল, তারপর হল মরি। ভারী তো রাজবাড়ির নফর শোভারাম। ছোটমশাইয়ের চানের জল জোগানো আর তেল মাখানো কাজ। আর সন্ধেবেলা ছোটমশাই যখন বৈঠকখানায় বসেন, তখন তাঁর পায়ের কাছে বসে পা-হাত-মাথা-পিঠ টিপে দেওয়া। সেই তারই কিনা মেয়ে। তার নাম মরালী’ই হোক কি মরো’ই হোক, কিংবা মরিই হোক, তাতে বাংলাদেশের ইতিহাসের কিছুই হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না। তাতে দিল্লির বাদশারও কিছু এসে যায় না, নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলারও কিছু এসে যায় না, লর্ড ক্লাইভ কিংবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কারওই কিছু এসে যায় না। এমনকী তাতে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই হিরণ্যনারায়ণেরও কিছু আসে যায় না।
কিন্তু ওই মেয়েটাই শেষকালে এক সর্বনেশে কাণ্ড ঘটিয়ে বসল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর সমস্ত প্রচ্ছদপটটাই একদিন ওই মরালী যে বদলে দিয়ে যাবে তা যেন কেউই কল্পনা করতে পারেনি। একটা ইতিহাসের আড়ালে যে আর একটা ইতিহাস সৃষ্টি করে বসবে হাতিয়াগড়ের সেই নগণ্য নফর শোভারামের নগণ্যতর মেয়ে মরালীবালা দাসী, তা যেন কারও মাথাতেই আসেনি।
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ যখন বলেছিলেন নামটা তখন যেন খটকা লেগেছিল প্রথমটায়। এনাম আবার কেমন নাম। এনাম আবার কারও থাকে নাকি। নাম হবে সুরবালা, নাম হবে ব্রজবালা, নাম হবে তরঙ্গিনী। যেমন আর পাঁচজনের নাম হয় আর কী। কিন্তু ছোটমশাই হলেন অন্নদাতা, তার দেওয়া নাম তো আর খামোকা বদলানো যায় না। ও-মেয়ে আদুরিকে খেয়েছে, মাকে খেয়েছে, ও-মেয়ে যে নিজেকেও একদিন খাবে সে সম্বন্ধে শোভারামের আর কোনও সন্দেহ ছিল না। তাই কখনও মরো’ বলে ডাকত, কখনও বা মরি’।
কিন্তু বিয়ের দিনেই নতুন করে নামটা উঠল। পুরুতমশাইকে ওই নামটা উচ্চারণ করতে হবে। সম্প্রদানের সময় কন্যার নামটা দরকার। বরকনের নাম না হলে বিয়ে হয় কী করে। শুধু নাম নয়–গোত্র, বংশ, কুলুজি সবই দরকার হয়।
সন্ধে পেরিয়ে গেছে তখন। রাত দশটায় লগ্ন। একে একে সবাই জুটেছে। শোভারামের মেয়ের বিয়ে। দশটা নয় পাঁচটা নয়, একটিমাত্র মেয়ে। মেয়ে বলো ছেলে বলো ওই এক মরালী। শোভারাম। সকলের বাড়িতে গিয়ে গলবস্ত্র হয়ে সবাইকে নেমন্তন্ন করে এসেছে। সদগোপপাড়া, বামুনপাড়া, কর্মকারপাড়া, মুসলমানপাড়া, সব পাড়ার লোককেই নেমন্তন্ন করা নিয়ম।
