অন্ধকারের মধ্যেই কান্ত হাত দিয়ে দিয়ে মুঠো মুঠো আসরফি তুলে নিজের কোচড়ে রাখতে লাগল। গোনবার সময় নেই। বেশি নেওয়াই ভাল। না হয় বেশিই হবে! এক হাজারের বেশি। এক হাজারের বেশি নিলে তো দোষ নেই। কম হলেই মুশকিল। একটা আসরফি কম হলে আর কাজিসাহেব তার কথা রাখবে না।
বাইরের শব্দটা বাড়তে লাগল।
নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা হেবাৎ জঙ বাহাদুর শাকুলি খান আলমগির কি ফতেহ্
আর সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল ফতেহ
নবাব বোধহয় পূর্ণিয়া থেকে লড়াই ফতেহ্ করে ফিরল। সঙ্গে হাতি, ঘোড়া, সেপাই, সবাই ফিরছে। তাই এত শব্দ!
এবার আর শব্দ হলেও ক্ষতি নেই। বাইরের আওয়াজে ভেতরের আওয়াজ ঢাকা পড়ে যাবে।
কান্ত তাড়াতাড়ি মুঠো মুঠো আসরফি কোঁচড়ে ভরতে লাগল।
কৌন!
কান্তর মাথার ওপর যেন সঙ্গে সঙ্গে বাজ পড়ল শব্দ করে। কান্ত পেছন ফিরে চেয়ে দেখলে, বুড়ো সারাফত আলি দরজার ওপর দাঁড়িয়ে তার দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে।
ভয় পেয়ে হাতটা ফসকে গেল। ফসকে যেতেই সিন্দুকের লোহার ডালাটা ঝপাং করে পড়ে গেল হাতের ওপর। হাতটা চেপটে থেঁতলে গেল। কিন্তু তবুকান্তর মুখ দিয়ে একটু টু শব্দও বেরোল না।
সারাফত আলি নেশার ঝেকে তখন সামনে এগিয়ে এসে খপ করে তার গলাটা টিপে ধরেছে।
আর টিপে ধরতেই কান্তর ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুমটা ভেঙে যেতেই কান্ত চারদিকে চেয়ে দেখলে ভাল করে। অন্ধকার ঘরে সে একা শুয়ে আছে। কেউ কোথাও নেই। ঠান্ডা শীতের মধ্যেও তার সমস্ত শরীর ঘেমে একেবারে ভিজে গেছে। সব নিস্তব্ধ। শুধু চকবাজারের রাস্তায় কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ আওয়াজ করছে।
ঘুম থেকে উঠে বাইরে আসতেই সারাফত আলি সাহেব ধরেছে। কাল কোথায় ছিলি? সন্ধেবেলা চেহেল্-সুতুনে গেলি না কেন? ক্যা হুয়া তুমারা?
হাজারো প্রশ্ন করে তোলপাড় করে তুলল মিঞাসাহেব! তোকে খাওয়াচ্ছি, তোকে মুফত থাকতে দিচ্ছি, তোকে শহর দিচ্ছি মিনিমাগনা? কিছু কাম করবার নাম নেই, শুধু বে-ফিকির সময় চলে যাচ্ছে। আর ক’দিনই বা বাঁচব? আর ক’দিনই বা আমার মোহর থাকবে! মোহর ফুরিয়ে গেলে তখন চেহেলসূতুনের ভেতর নিয়ে যাবে কোন হারামজাদ?
সারাফত আলির মেজাজ এরকম বিগড়ে যায় মাঝে মাঝে। সে সকালবেলার দিকে। তখন মনে পড়ে যায় তার বয়েস বাড়ছে, মনে পড়ে যায় নবাব ফিরিঙ্গি কোম্পানিকে লড়াইতে হারিয়ে দিয়েছে। তখন মনে পড়ে যায় জগৎশেঠজি নবাবের হাতে থাপ্পড় খেয়েছে। সব মনে পড়ে আর মনে পড়লেই মেজাজ বিগড়ে যায় তার।
ডাকে–বাদশা
বাদশা এলেই তখন তার সঙ্গে টাকার হিসেবের গোলমাল নিয়ে কথা কাটাকাটি করে। তখন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায় সারাফত আলি। তখন দেখে সিন্দুকের তালাটা ঠিক লাগানো আছে। কিনা। ভেতরে ঢুকে আরক বানানো তদারক করে। গুলিগুলো ঠিক বানানো হচ্ছে কিনা নজর দিয়ে পরখ করে নেয়। কী রান্না হবে, কী খেতে ভাল লাগে বুড়োর, সব খোলসা করে বলে তখন।
কান্ত একবার ভাবলে আসরফির কথাটা বলবে। কিন্তু যদি রেগে যায়! যদি রেগে গিয়ে কাউকে বলে দেয়। যদি জানাজানি হয়ে যায়। বুড়ো নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবে কেন এত টাকা লাগবে? কীসের জন্যে? কার দরকার?
কী উত্তর দেবে তখন সে?
হঠাৎ বশির মিঞার সঙ্গে দেখা। চকবাজারের রাস্তায় হনহন করে চলেছে বশির।
কান্ত দৌড়িয়ে গিয়ে ধরল তাকে!
কী রে? কোথায় গিয়েছিলি এ্যাদ্দিন?
বশির বললে–বড় জরুরি কামে ঠেকে গিয়েছিলুম ইয়ার, বড় মুশকিলকা কাম। সব গোলমাল হয়ে গেছে। হাতিয়াগড় থেকে এখন আসছি, নিজামতকাছারিতে গিয়ে খবর দিতে হবে–
কী খবর?
বশির গলা নিচু করলে। বললে–আরে সব বিলকুল গোলমাল হয়ে গেছে। হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই তোর বউকে কলকাতায় ভেজিয়ে দিয়েছে–
আমার বউ?
তোর বউ নয় ঠিক। যার সঙ্গে তোর বিয়ে হবার কথা ছিল। শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ের সঙ্গেই তো তোর বিয়ে হবার বাত ছিল?
হ্যাঁ।
এ-এক অদ্ভুত সংবাদ দিলে বশির মিঞা। সমস্ত ঘটনাটা চুপ করে শুনে গেল কান্ত। এত গণ্ডগোল হয়ে গেল এই ক’দিনে। কিছুই জানত না সে। কতদিন আগে থেকে সে মরালীকে এখানে এনে রেখে দিয়েছে, কতদিন রাত্রে চেহেল্-সুতুনে গিয়ে সেই মরালীর সঙ্গে দেখা করেছে। বোঝা গেল সেসব কিছুই জানতে পারেনি বশির। না পেরেছে ভালই হয়েছে। শুধু জানে,হাতিয়াগড়ের রানিবিবি সফিউল্লা। খাঁ সাহেবকে খুন করার দায়ে কোতোয়ালিতে আটক আছে। তার কাছে যে-চিঠিটা আছে সেই চিঠিটা যাতে না-পায় কেউ, সেই চেষ্টা করছে মেহেদি নেসার; আর হাতিয়াগড়ের রাজা এখানে এসেছে। রানিবিবিকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচাতে।
তারপর?
তারপর মোল্লাহাটিতে দেখা হল উদ্ধব দাসের সঙ্গে, সেই পাগলটা। তার কাছেই তো শুনলুম সব!
উদ্ধব দাসের কথাটা শুনে কান্ত যেন কেমন বিহ্বল হয়ে গেল।
জিজ্ঞেস করলে সে জানে এইসব! এই এত কাণ্ড হচ্ছে?
আরে সে তো পাগলা-ছাগলা মানুষ। কী সব গান বেঁধেছে, সেইসব শোনাতে লাগল। তখন কি আর সেসব শোনবার সময় ছিল আমার। আমার সঙ্গে ডিহিদার রেজা-আলি সাহেবও ছিল যে! সে-বেটাও তাড়া দিচ্ছে তখন!
কান্ত জিজ্ঞেস করলে সে তার বউয়ের কথা কিছু জিজ্ঞেস করলে না?
বউয়ের কথাও বললে। ফিরিঙ্গি কোম্পানির সিপাহশালার ক্লাইভ সাহেবের হেফাজতে রয়েছে তার বউ। তার সঙ্গে দেখা করেনি!
