তা তোমাকে সব খুলে বলতে হবে নাকি?
তুমি খুলে না বললে–তা হলে আমিও খুলে বলব না।
বশির মিঞা বললে–তা তুমি এত গোসা করছ কেন দাসমশাই? নিজামতি কাছারির সব কথা খুলে বলা যায় কখনও? চারদিকে আমাদের কত দুশমন তা জানো না? আমরাও যে খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমার বউকে?
আমার বউকে খুঁজছ? তোমরা? কেন?
বশির মিঞা গলাটা নিচু করে বললে–সে-সব অনেক কাণ্ড। এখন সব কথা বলবার ওয়াকত নেই, নবাব পূর্ণিয়ায় গেছে নিজের ভাইজানের সঙ্গে লড়াই করতে
তাই নাকি? আবার লড়াই?
হ্যাঁ, এদিকে মুর্শিদাবাদেও আবার খুনোখুনি ব্যাপার ঘটে গেছে। সফিউল্লা সাহেবকে খুন করে ফেলেছে মরিয়ম বেগমসাহেবা!
মরিয়ম বেগমসাহেবা? সে আবার কোন বেগম?
তুমি কি সব বেগমসাহেবার নাম শুনেছ নাকি। সে লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলি সাহেবের মেয়ে। তুমি তো চিনতে তাকে?
খুব চিনতুম!
বশির মিঞা বললে–সেইসব নিয়ে বড় হল্লা হচ্ছে দাসমশাই, আমার ফুপা মনসুর আলি মেহরার সাহেব বলেছে হাতিয়াগড়ে গিয়ে সব তালাশ করে আসতে। তাই তো হাতিয়াগড়ে গিয়েছিলুম, তাই তো ডিহিদার সাহেবকে নিয়ে যাচ্ছি।
কোথায়? কোথায় যাচ্ছ?
সব কথা শুনতে চেয়ো না দাসমশাই। যাচ্ছি কেষ্টনগরে। হাতিয়াগড়ের রাজাবাবু গেছে সেখানে। তার হাতের লেখা চিঠি পেয়ে গেছি আমরা। তার মধ্যে তোমার বউয়েরও নাম লেখা আছে!
সেই চিঠিতে? আমার বউয়ের নাম? তা কী করে হয় মিঞাসায়েব? আমার বউ কোথায় আছে সে তো আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।
বশির মিঞা গলা নিচু করে বললে–আমি কাউকে বলব না। বলল তোমার বউ কোথায় আছে?
হ্যাঁ, বলি, শেষকালে আমার বউকেও তোমরা ধরে ফেলল আর কী!
না, মাইরি দাসমশাই, তোমার বউকে আমরা ধরব না, বলো তুমি কোথায় আছে!
সত্যি বলছ? আমার বউকে ধরবে না?
আরে, বউ তো তোমার নামেমাত্তর বউ, সেবউয়ের জন্যে অত মায়া কেন তোমার? তোমার মুখে। তো লাথি মেরে পালিয়ে গেছে সে।
তবু তো বউ মিঞাসায়েব! অগ্নিসাক্ষী রেখে বিয়ে তো হয়েছে। আমার সঙ্গে না-ই রইল, কিন্তু আমি তো নিজের হাতে তার সিঁথিতে সিঁদুর লাগিয়ে দিয়েছি, আর মন্তর পড়ে তাকে গ্রহণ করেছি।
ওদিকে ডিহিদার তখন ফিরিঙ্গি’র ওপর বসে ছটফট করছে।
বশির মিঞা সেদিকে চেয়ে বললে–ওই দেখো, রেজা আলি দাঁড়িয়ে আছে। জানতে পারলে তোমায় কিন্তু কোতল করবে!
উদ্ধব দাস হেসে উঠল। বললে–আমাকে ভয় দেখাচ্ছ নাকি বশির মিঞা? তা হলে কিন্তু কিছু বলব না–
বশির মিঞা চিনত উদ্ধব দাসকে।
বললে–না না, ভয় দেখাচ্ছি না দাসমশাই, তুমি নিজের ইচ্ছেতেই বলল, আমি জোর করব না। কোথায় আছে বলো দিকিনি?
পথে এসো মিঞাসায়েব! পথে এসো। তা হলে বলো তার কোনও অনিষ্ট করবে না। কথা দাও আগে!
হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি। তোমার বউয়ের কোনও ক্ষতি করব না।
কথা দাও তার ধর্ম রাখবে?
রাখব, কথা দিলাম তোমাকে।
উদ্ধব দাস বললে–তা হলে শোনো, সে আছে কলকাতায়। কলকাতার উত্তরে বরানগরে ফিরিঙ্গিদের ছাউনিতে!
ফিরিঙ্গিদের ছাউনিতে? সেকী?
উদ্ধব দাস বললে–হ্যাঁ, ফিরিঙ্গিদের কর্তা ক্লাইভ সাহেরের ছাউনিতে! সেখানে গেলেই দেখা পাবে তার।
*
সারাফত আলি তখনও মৌতাত করছে খুশবু তেলের দোকানে। দুনিয়াটা বেশ খুশবু হয়ে উঠেছে। তার চোখের সামনে। একটা তো মরল তবু। একটা ইয়ার তো খুন হয়ে গেল! এমনি করে একদিন মেহেদি নেসার যাবে, ইয়ারজান যাবে। তারপর যাবে নানিবেগম, লুৎফা বেগম, আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগম, পেশমন বেগম, বব্বু বেগম, তক্কি বেগম, মরিয়ম বেগম। তারপর যাবে চেহেল্-সুতুন। তারপর যাবে মুর্শিদাবাদ, চকবাজার। তারপর যাবে নবাব মির্জা মহম্মদ হেবাৎ জঙ বাহাদুর আলমগির! ইয়া আল্লাহ রসুল আল্লা!
হঠাৎ পেছন দিকে খুট করে একটা কীসের শব্দ হল!
বোধহয় চুহা! কোঠির ভেতর চুহা ঢুকেছে। আবার গড়গড়ায় টান দিলে সারাফত আলি। আগরবাতির ধোঁয়ার গন্ধের সঙ্গে তাম্বাকুর গন্ধ মিশে মৌতাত বেশ আরও জমজমাট হয়ে উঠল। সারাফত আলি চোখ বুজে হাজি-আহম্মদের বংশের ধ্বংস দেখতে দেখতে বেসামাল হয়ে বললে–ইয়া আল্লাহ
কান্ত তখন নিঃশব্দে সারাফত আলির শোবার ঘরের ভেতর ঢুকেছে। কেউ তাকে দেখতে পায়নি। সকাল থেকেই সুযোগ খুঁজছিল সে। এই সন্ধেবেলাটাই হল আসল সুযোগ। এই সময়েই সারাফত আলির মেজাজ খুশ থাকে। এই সময়েই বাদশা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
কান্ত সিন্দুকের ডালাটা খুলতে গিয়ে একটু শব্দ করে ফেলেছিল। মোটা লোহার তালা ভাঙতে একটু শব্দ হবারই কথা। কিন্তু শব্দটা হতেই কান্ত নিজের নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলেছে। এক হাজার আরফি চাই। এক হাজার, কাজিসাহেব এক হাজারের কমে মরালীকে ছাড়বে না। একবার মরালীকে ছাড়িয়ে নিতে পারলে তখন আর চেহেলসূতুনে চলে যেতে দেবে না মরালীকে। তখন এই কবাজার ছাড়িয়ে একেবারে অন্য কোথাও চলে যাবে। যেখানে যেতে চায়। যদি উদ্ধব দাসমশাইকে একবার দেখতে পায় তো তার হাতেই তুলে দিয়ে বলবে-এই নাও দাসমশাই, তোমার বউকে তুমিনাও, এখন আমার ছুটি।
হঠাৎ বাইরে চকবাজারের রাস্তায় যেন হুড়মুড় করে শব্দ হল একটা। কীসের শব্দ ওটা?
একটুখানি কান পেতে শুনতে লাগল কান্ত।
প্রথমে মনে হল যেন বান আসছে। ঠিক গঙ্গায় ষাড়াষাড়ি বান আসবার সময় যেমন শব্দ হয় তেমনই। তারপর গোলাগুলি ছোঁড়ার দুমদাম শব্দ! লড়াই শুরু হল নাকি চকবাজারে।
