তা হঠাৎ একথা এল কেন তোমার দাসমশাই?
উদ্ধব দাস তখন দাওয়ায় উঠে বসেছে। বললে–এই বরানগরে গিয়েছিলুম, সেখানে আমার বউয়ের সঙ্গে দেখা হল, জানো!
তোমার বউ? যেবউ পালিয়ে গিয়েছিল?
হ্যাঁ কর্মকারমশাই।
বউ কী বললে? কেন পালিয়েছিল?
বলবে আবার কী? হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির একটা ঝি ছিল, সে কি আমাকে বউয়ের সঙ্গে দেখা করতে দিলে? দেখা হলে তো বলতুম বউকে। বলতুম, আমার বাইরের চেহারাটা দেখেই তুমি আমার বিচার করলে গো। আমার ভেতরটা তো দেখলে না। এই তোমরা সবাই যেমন করছ?
মধুসূদন বললে–আমরা আবার তোমার কী করছি?
তোমরা তো সবাই আমার বউয়ের মতন।
আমরা তোমার বউয়ের মতন? বলছ কী তুমি?
তা নয়? ওই কোরান-গীতা, জল-পানি, দিদিনানি, পির সাধ, মন্দির-মসজিদ সবই কি এক বলে মানো তোমরা? সেই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থকে চেনো তো? সেই যে ঘটকমশাই? সেদিন কেষ্টনগরের পথে দেখা। আমাকে দেখেই হাউহাউ করে কান্না। বলে কী, মোছলমানরা নাকি তাকে ম্লেচ্ছ মাংস খাইয়ে দিয়েছে। তার নাকি জাত গিয়েছে, তাকে নাকি তার গাঁয়ের লোক একঘরে করেছে, তার মাগ-ছেলেমেয়ে তাকে ত্যাগ করেছে। আমি তো হেসে খুন। আমি বললুম–পুরোকায়েতমশাই, তোমার গা কি তুলসীগাছ যে কুকুরে পেচ্ছাব করলেই পাতাগুলো সব পচে গেল? তা শুনে কী বললে–জানো?
মধুসূদন কর্মকার ওসব বাজে কথা শুনতে চায় না। বললে–ওসব কথা থাক দাসমশাই, তোমার বউয়ের কথা বলল। বউ তোমার সঙ্গে দেখা করলে না?
উদ্ধব দাস বললে–না গো, সেবউ এখন আরাম করে সাহেবের বাড়িতে আছে, আয়েশ করে ভাল-মন্দ খাচ্ছোচ্ছে, নফর শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে, এত ভাল খাওয়াদাওয়া তো পায়নি। কখনও আগে!
মধুসূদন বললে–সাহেব? সাহেব মানে? ম্লেচ্ছ সাহেব?
হ্যাঁ গো, ফিরিঙ্গি কোম্পানির সাহেব। কলিকালে সবাই ম্লেচ্ছ, কলির দেবতাই বলে ম্লেচ্ছ হয়ে গেছে হে, কেউ ম্লেচ্ছ হতে বাকি নেই আর। তুমিও ম্লেচ্ছ মধুসূদন, আমিও ম্লেচ্ছ।
বলছ কী দাসমশাই, পাগলের মতো কী বলছ সব তুমি?
উদ্ধব দাস বললে–ঠিক বলছি মধুসূদন, আর কিছুদিন সবুর করো তখন দেখবে আল্লা-হরি সব একাকার হয়ে অনারকম চেহারা হয়ে গেছে–
কী রকম চেহারা?
ওই ফিরিঙ্গিদের মতো চেহারা! তখন দেখবে আল্লা আর হরি কোট-প্যান্টলুন পরে গ্যাটম্যাট করে ঘোড়ায় চড়ে বন্দুক ছুড়ছে। যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই বন্দুক ছুঁড়ে মারছে। মারতে মারতে যখন কেউ আর থাকবে না, তখন কলিযুগ শেষ হয়ে যাবে!
কলিযুগ শেষ হয়ে যাবে? বলো কী গো?
তা হবে না? শেষ হলেই তো ভাল গো। তখন আবার সত্যযুগ শুরু হয়ে যাবে। আবার আরাম করে কেষ্টনগরের রাজবাড়িতে গিয়ে মুগের ডাল খাব। হাতিয়াগড়ের অতিথশালায় গিয়ে রসের গান গাইব। জানো মধুসূদন, হাতিয়াগড়ের ছোটরানি রসের গান শুনতে খুব ভালবাসে। নতুন নতুন রসের গান বাঁধব আর গাইব। সত্যযুগে একটা ভাল জিনিস হবে হে মধুসূদন, বিয়ের রাত্তিরে আর বউ পালাবে না কারও।
কেন?
কী করে পালাবে শুনি? তখন তো আর বাইরের চেহারা দিয়ে মানুষের বিচার হবে না গো, বিচার হবে যে গুণ দিয়ে! তোমার জাত দিয়েও বিচার হবে না, ধর্ম দিয়েও বিচার হবে না, বিচার হবে তোমার কর্ম দিয়ে। তুমি আমি যেমন কর্ম করব, তেমনই ফলভোগ করব। তখন কী আরামে দিন কাটাব বলো তো মধুসূদন ভায়া?
মধুসূদন বললে–তোমার মাথাটি এবার সত্যিই খারাপ হয়েছে দাসমশাই বউ পালিয়ে যাবার। পর থেকেই দেখছি মাথাটা গোলমাল হয়ে গেছে
না মধুসূদন, কত গান কত ছড়া বেঁধেছি জানো! শুনবে আমার নতুন ছড়া?
বলো।
উদ্ধব দাস বললে–তবে শোনো–
পিতা-পুত্রে এক নারী করে আলিঙ্গন।
উভয় ঔরসে জন্ম উভয় নন্দন ।
অগ্রেতে তাদের নাহি পরিচয় ছিল।
অবশেষে মৃত্যুমুখে শুনিতে পাইল ॥
কী নাম তাদের ভাই বলো দেখি শুনি।
অনুমানে বুঝি আমি না পারিবে তুমি ।
হঠাৎ ছড়াটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই মোল্লাহাটির শাহি রাস্তাটার দিকে নজর পড়ে গেছে।
আরে, বশির মিঞা না?
দূরে দেখা গেল ডিহিদার রেজা আলি তার ফিরিঙ্গি’র ওপর চড়ে আসছে, আর বশির মিঞা ঘোড়া ছুটিয়ে কাছে এল।
কী গো, দাসমশাই, তুমি এখেনে?
বহুদিন উদ্ধব দাসকে দেখেছে বশির মিঞা। দু’জনেই রাস্তার লোক। রাস্তায়, গাছতলায়, ধর্মশালায়, অতিথিশালায় একসঙ্গে রাত কাটিয়েছে।
উদ্ধব দাস বললে–একটা ছড়া বেঁধেছি নতুন, শুনবে মিঞাসায়েব? এই মধুসূদনকে শোনাচ্ছিলাম
বশির মিঞা বাধা দিলে। বললে–এখন ছড়া থাক দাসমশাই, ডিহিদারসাহেব সঙ্গে রয়েছে–তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে, বলি তোমার বউয়ের কিছু হদিস পেলে? জানতে পারলে কিছু?
পেইছি!
কথাটা শুনেই ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল বশির মিঞা।
সত্যি পেয়েছ? না দেয়ালা করছ?
উদ্ধব দাস বললে–নিজের মাগ নিয়ে কেউ দেয়ালা করে?
বশির মিঞার আর তর সইছে না। বললে–পাগলামি কোরো না এখন, ডিহিদার সাহেব দাঁড়িয়ে আছে, সময় নেই, এখন বলো শিগগির কোথায় আছে তোমার বউ?
উদ্ধব দাস যে উদ্ধব দাস, সে-ও অবাক হয়ে গেল। বললে–তা আমার বউয়ের ওপর তোমার এত নজর কেন গো মিঞাসায়েব? আমার বউয়ের খোঁজ পাওয়া গেল কি গেল না, তা জেনে তোমার লাভ কী?
লাভ আছে! ওদিকে হাতিয়াগড়ে সব ফাঁস হয়ে গেছে।
ফাঁস হয়ে গেছে মানে? ফাঁস হয়ে গেছে মানেটা কী?
