মুর্শিদকুলি খাঁ’র আমল থেকেই এমনি চলে আসছে। এর জন্যে দিল্লির বাদশার হুকুমের দরকার হয় না। নিজামতি ফারমানে অনেক অধিকার নবাব বহুদিন থেকেই ভোগ করে আসছে। বিশেষ করে শাহনশা আওরঙ্গজেবের বেহেস্তে যাবার পর থেকে। নবাবজাদা মির্জা যখন মুর্শিদাবাদের রাস্তায় হোসেনকুলি খা-কে খুন করে, তখনও তার কাছে কেউ জবাবদিহি চায়নি। চাইবার সাহসই পায়নি। ফৈজি বেগমকে যখন গুমখুন করে নবাবজাদা মির্জা মহম্মদ হাতের রক্ত ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলেছিল, সেদিনও কেউ তার কৈফিয়ত চায়নি। শুধু কি নবাবজাদা মির্জা মহম্মদ? নবাব আলিবর্দি খাঁ-ই কি কিছু কম অপরাধ করেছেন। পাটনার সুন্দর সিংকে নিজের বাড়িতে নেমন্তন্ন করে এনে যেদিন খুন করেছিলেন সেদিনও কেউ তাঁকে দোষ দেয়নি। আবদুল করিম খাঁ-কে নিজের তিনজন লোক দিয়ে দরবারের মধ্যে খুন করেও আল্লার দরবারে বেকসুর খালাস পেয়ে গিয়েছিলেন আলিবর্দি খাঁ। এইটেই ছিল নবাবি রীতি। এই নিয়মই নিজামতের কাজিসাহেবের কাছারিতে চলে আসছিল বরাবর। এরই বা হঠাৎ ব্যতিক্রম হবে কেন?
মেহেদি নেসার আর বেশি দেরি করেনি। সন্ধে হতেই এসে হাজির হয়েছিল কোতোয়ালিতে।
ফাটকের দরজাটা খুলতেই তন্দ্রা ভেঙে গিয়েছিল মরালীর। আগের রাত্রে ঘুম হয়নি, খাওয়া হয়নি, পরের দিনও সারাদিন তাকে নিয়ে জেরা চলেছে। ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল সমস্ত শরীর।
কে?
নিজের ছায়া দেখেই যেন নিজে চমকে উঠেছিল মরালী। মরালী নিজেই যেন নিজেকে খুন করতে এসেছে কোতোয়ালির ফাটকের ভেতরে।
আমি, বেগমসাহেবা, আমি মেহেদি নেসার!
কী চাই আপনার?
আমি বেগমসাহেবার বরাবরে কুর্নিশ দিতে এসেছি।
মরালী বুঝতে পারলে মতলবটা। বললে–আমি এখন আর বেগমসাহেবা নই, আমি খুনের আসামি।
তা হোক, তবু বেগমসাহেবা বেগমসাহেবাই!
আপনি কী চান?
বেগমসাহেবা কি সফিউল্লার কাছ থেকে কোনও চিঠি নিয়ে লুকিয়ে রেখেছেন?
যদি লুকিয়েই রাখি, তা আপনাকে বলতে যাব কেন? আপনি কে?
মেহেদি নেসার সাহেব হেসে উঠল শব্দ করে। বললে–আমি? আমি বেগমসাহেবার বান্দা!
বান্দা তো বান্দার মতো করে কথা বলুন!
এবার মেহেদি নেসারের শক্ত হবার পালা। বললে–আমি বেগমসাহেবার শরীর তালাশ করতে এসেছি, কুর্নিশ করতে আসিনি। সেই চিঠি আমার চাই!
খবরদার, আমাকে ছুঁয়ো না।
মেহেদি নেসার হাত বাড়িয়ে ছুঁতে এল মরালীকে।
খবরদার! আর কাছে এলে বিপদ আছে তোমার বলে রাখছি!
মেহেদি নেসার বিপদ কাকে বলে তা জানেনা বেগমসাহেবা। কী বিপদ সেটা একবার জানিয়ে দিলে ভাল হয়।
মরালী দাঁত দিয়ে নিজের হাতটা কামড়াল।
তা হলে বলে রাখছি, সফিউল্লা খাঁ যেখানে গেছে তোমাকে সেখানেই পাঠাব!
মেহেদি নেসার আর দেরি করলে না। একেবারে মরালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত দুটো চেপে ধরলে।
*
ইতিহাসের পাতায় যত অনাচার-অত্যাচারের কাহিনী লেখা আছে এ তাদেরই মধ্যে আর একটা নয়। তবু এ এমন নতুন কিছুও নয়। কোতোয়াল সাহেবের এ-সব দেখা আছে। শহরের বাইরে যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আপাতভাবে অব্যাহত গতিতে চলেছে, তখন তার আড়ালে-আবডালে তার অলিতে-গলিতে যা ঘটে তার প্রমাণ কোথাও থাকে না। আবদুল করিমের খুনের উপাখ্যান লিখে গেছে গোলাম হোসেন। নাজির আহম্মদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে সরকারে বাজেয়াপ্ত হওয়ার উপাখ্যানও লিখে গেছে তারিখ-ই-বাংলার অজ্ঞাতনামা লেখক। নাজির আহম্মদের ফাঁসি হবার পর তার মসজিদ বাগানবাড়ি কেমন করে সুজাউদ্দিনের ফাবাগে রূপান্তরিত হয়েছিল, তার উপাখ্যানও লেখা আছে তারিখ-ই-বাংলার পাতায় পাতায়। কিন্তু কত মরালী, কত কান্ত, কত সারাফত আলি, কত রানিবিবি ইতিহাসের অন্দরমহলে দীর্ঘশ্বাসের তাপে শুকিয়ে ক্ষয় হয়ে গেছে, তার নজির মুতাক্ষরিন, তারিখ-ই-বাংলা, রিয়াজুস-সালাতিনেও নেই। এমনকী নিজামতি সেরেস্তার রেকর্ডেও তার হদিস মেলবার কোনও ভরসা নেই। নেই বলেই হয়তো উদ্ধব দাস এই বেগম মেরী বিশ্বাস’ কাব্য লিখেছিল। কে জানে!
পুরনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে যাঁরা ঘাঁটাঘাঁটি করেন তারা জানেন, গল্প যেখানটায় খুব জমে ওঠে, পোকাগুলো ঠিক জায়গা বুঝে বুঝে সেই জায়গাগুলোতেই দাঁত বসায়। এর পরেই উদ্ধব দাস লিখেছে
মরাও নয় জীয়ন্তও নয়, যেমন চিররোগী
হিন্দুও নয় যবনও নয়, তার সাক্ষী যুগি।
এখন রাম ভজি কি রহিম ভজি
দিশে পাইনে কীসে মজি।
নিশে কে করে শেষে আমার পক্ষে।
এখন ব্ৰত করি কি বোজা করি
সন্ধে করি কি নামাজ পড়ি
করতে চাই তো পরকালটা রক্ষে।
হল কথা কওয়ার ভারী জ্বালা।
কলা বলি কি বলি কেলা
একী জ্বালা কাকে হেলা করিব?
দিদি বলি কি বলি নানি।
জল বলি কি বলি পানি।
কোরান মানি কি শাস্ত্রের মত ধরিব?
হল মরণকালে বিপদ ঘোর।
গঙ্গা নিই কি নিই পোর।
কার কাছে বা শরণ লয়ে থাকিব!
কিবা করেন গোকুলের চাঁদ।
যা করেন পির গোরাচাঁদ,
কিছু কিছু দুইয়ের মতেই চলিব ॥
মোল্লাহাটির মধুসূদন কর্মকারের সঙ্গে দেখা। বললে–কী গো দালমশাই, নতুন গান বেঁধেছ নাকি?
উদ্ধব দাস বললে–রাস্তায় হাঁটছি আর এই গান বাঁধছি
কী গান শুনি?
উদ্ধব দাস গানটা আবার গাইতে লাগল। বললে–আমার কাছে সবই সমান গো মধুসুদন, ওই কোরান-গীতা, জল-পানি, দিদিনানি, পির সাধু, মন্দির-মসজিদ সবই সমান আমার কাছে। তবু ভাবছিলুম আমরা ওই নিয়েই সবাই মাথা ঘামাচ্ছি, খোসা নিয়েই খেয়োখেয়ি করছি। আসল শাঁস ধুলোয় গড়াগড়ি যাচ্ছে
