ঘরের ভেতরে যেতেই ছোট বউরানি বললে–লোকটা কোথায় গেল রে দুগ্যা?
দুর্গা বললে–পাগলটাকে এক ধমক দিলুম। বেটা যেতে কি চায়, কেবল বউয়ের সঙ্গে কথা বলতে চায়,
ছোট বউরানি বললে–আহা গো, আমার বড় কষ্ট হয় রে দুগ্যা ওর জন্যে আমার জন্যে যেমন ছোটমশাইয়ের কষ্ট হচ্ছে, ওরও তেমনি ওর বউয়ের জন্যে কষ্ট হচ্ছে! ছোটমশাই যেমন জানতে পারছে না আমি কোথায় আছি, ও-ও তেমনি জানে না যে ওর বউ মুর্শিদাবাদের চেহেল্-সুতুনে আটকা পড়ে আছে
হঠাৎ দূর থেকে উদ্ধব দাসের গানের আওয়াজ আসতে লাগল।
দুর্গা বললে–ওই দেখো কেমন গান ধরেছে পাগলটা, কষ্ট হলে কারও গলা দিয়ে অমন গান বেরোয়?
উদ্ধব দাস তখন গলা ছেড়ে গাইছে–
আমি রব না ভব-ভবনে।
শুন হে শিব শ্রবণে ॥
যে নারী করে নাথ পতি বক্ষে পদাঘাত,
তুমি তারই বশীভূত, আমি তা সব কেমন ॥
ক্লাইভও শুনছিল গানটা। বললে–পোয়েটের গান শুনছ ওয়াটসন? পোয়েটটা আমায় একটা নতুন কথা শোনালে আজ। বললে–কী জানো, বললে–হোল ওয়ার্লডটাই ওর সংসার, ও যেখানে থাকে, সেইটেই ওর ঘর! বড় ওয়ান্ডারফুল লাগল ওর কথাটা! তখন থেকেই কেবল সেই কথাটাই ভাবছি। হোল ওয়ার্লডটাই আমার সংসার, এখন ইন্ডিয়ায় আছি, ইন্ডিয়াই যেন আমার ঘর!
এ্যাডমিরাল ওয়াটসন ক্লাইভের মুখের দিকে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ! কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ, সেন্ট ফোর্ট ডেভিডের কম্যান্ডারও কি শেষকালে ওই পোয়েটটার মতো পাগল হয়ে গেল নাকি!
*
মহিমাপুরের মহাতাপ জগৎশেঠজির হাবেলির ফটকে ভিখু শেখ তখন পাহারা দিচ্ছে। বড় কড়া। পাহারাদার ভিখু শেখ। একটি মাছি পর্যন্ত জগৎশেঠজির হাবেলির ভেতর ঢুকতে পারে না ভিখু শেখের নজর এড়িয়ে।
এই কুত্তা, ভাগ, ভাগ ইহাসে।
রাস্তা দিয়ে কেউ গেলেই ভিখু শেখের সন্দেহ হয়। সবাই যেন চর। সবাই যেন শেঠজির বাড়ির ভেতরের খবর জানতে চায়। ভেতরে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাই-ই যেন সবার লক্ষ!
ভাগ শালা কুত্তা। ভাগ ইধারসে।
হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই তখন দরবার-ঘরের ভেতরে চুপি চুপি কথা বলছেন।
বললেন–আপনি সত্যিই জানেন? ভাল লোকের মুখে শুনেছেন?
জগৎশেঠজি বললেন–হ্যাঁ, আমার খবর ভুল হবার নয় ছোটমশাই। প্রথমে শুনেছিলাম চেহেল-সুতুনের হারেমের মরিয়ম বেগম সফিউল্লা খা-কে খুন করেছে। কিন্তু পরে শুনলাম, আপনার স্ত্রী!
আপনি ভাল রকম জানেন আমার স্ত্রী?
জগৎশেঠজি বললেন–আমি তো বললাম আমার খবর ভুল হয় না। এতদিন আপনার স্ত্রীকে ওরা মতিঝিলের ফাটকে আটক রেখে দিয়েছিল, আজ ভোরে কোতোয়ালিতে এনে পুরেছে। মেহেদি নেসার আর ইয়ারজান ওরা দু’জন কাজিসাহেবের কাছে গিয়েছিল। কাজিসাহেবের কাছে দরবার করে দশ হাজার আসরফি ঘুষ দিয়েছে
কেন?
জগৎশেঠজি বললেন–সফিউল্লা সাহেবের কাছে একটা চিঠি ছিল, সেটা তার শরীর তল্লাসি করেও পাওয়া যায়নি। ওরা বলছে, সেটা নাকি আপনার স্ত্রীর কাছেই আছে।
কীসের চিঠি?
সেই চিঠিখানাতে নবাবকে খুন করবার মতলবের কথা লেখা ছিল। করিম খাঁ পাঠিয়েছিল মেহেদি নেসারের কাছে। সে-চিঠি যদি আপনার স্ত্রী নবাবকে দেখিয়ে দেয় তো মেহেদি নেসার, ইয়ারজান সকলের ফাঁসি হয়ে যাবে। তাই আপনার স্ত্রীকে ফাঁসি দেবার জন্যে ওরা কাজিসাহেবকে ঘুষ দিয়েছে।
ছোটমশাই যেন বজ্রাহতের মতো অচৈতন্য হয়ে গেলেন। এই কদিনের মধ্যে এত কাণ্ড হয়ে গেছে!
তা হলে তাকে বাঁচাবার কী উপায় হবে শেঠজি?
জগৎশেঠজি বললেন–আপনি এখনই গিয়ে কাজিসাহেবের সঙ্গে দেখা করুন। ওরা দশ হাজার আসরফি দিয়েছে, আপনি পনেরো হাজার আসরফি ঘুষ দিন। সব ফয়সালা হয়ে যাবে।
কিন্তু পনেরো হাজার আসরফি আমি এখন এত শিগগির কোথায় পাব?
জগৎশেঠজি বললেন আপনার কিছু ভয় নেই, আমি দেব, আপনি হুন্ডি কেটে দিন, পরে শোধ করে দেবেন।
ছোটমশাই বললেন–তা হলে তাই দিন শেঠজি, আমি আর ভাবতে পারছি না, যেমন করে পারুন। আমায় এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন!
কোতোয়ালির ফাটকের মধ্যেও মরালীর শান্তি ছিল না। একবার কে একজন আসে, উঁকি মেরে দেখে যায়, আবার তার পরেই আসে আর একজন। চারদিকে পাকা ইটের দেয়াল। শুধু সামনে একটা লোহার গরাদ দেওয়া দরজা। আবরু নেই কোথাও। সেই সকালবেলাতেও ভেতরটা ঝাপসা অন্ধকার। যেন রাত। চেহেল্-সুতুনের হারেমের মতোই কোনও দিকে পালাবার উপায় নেই।
মেহেদি নেসার প্রথমেই কোতোয়াল সাহেবকে পাঠিয়েছিল। বেশ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে খুশি করতে চেয়েছিল মরালীকে। কোনও তকলিফ থাকলে যেন মুখ ফুটে বলেন বেগমসাহেবা। বেগমসাহেবার কী কী অসুবিধে হচ্ছে বললে–তখনই তার প্রতিকার করবেন তিনি।
মরালী শুধু বলেছিল–আমার কোনও তকলিফ নেই
বেগমসাহেবা নাস্তা করবেন?
মরালী বলেছিল-না
খানা? কী খানা খাবেন বেগমসাহেবা?
মরালী বলেছিল–যা খুশি, যা আপনারা দেবেন!
প্রথমবার এইটুকু মাত্র। তারপর অনেকবার এসেছে, খোঁজ নিয়েছে, তবিয়ত কেমন আছে সবিনয়ে জিজ্ঞেস করেছে। কোনও কথারই স্পষ্ট ব্বাব দেয়নি মরালী!
শেষকালে শুরু হল কড়া কড়া কথা। বেগমসাহেবা কোথা থেকে ছুরি পেলেন?
ওর হাতেই ছুরি ছিল, আমি কেড়ে নিয়েছিলুম।
আর কী কেড়ে নিয়েছিলেন?
আর কিছু কেড়ে নিইনি।
কোনও চিঠি?
না।
এমনি করেই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অনেকবার জেরা চলল। শেষকালে বোধহয় কোতোয়াল বুঝতে পারলে, এ বেগমসাহেবা সাধারণ বেগমসাহেবা নয়। সাধারণত এরকম ব্যাপারে ভয় দেখিয়ে কড়া কথা বললেই কাজ হয়ে যায়। অন্য বেগমসাহেবারা কেঁদে ফেলে। কেঁদে সব কথা বলে দেয়। তারপর হাত জোড় করে মাফি চায়। এমন অনেকবার হয়েছে। তারপর কাজিসাহেবের কাছারিতে বিচার হয়ে তাদের ফাঁসি হয়ে গেছে। চেহেলসতুনের ভেতরে হলে সে বিচার খোজারাই করে। পিরালি খাঁ নিজেই মহড়া নেয়। নবাব থাকেন তার হুকুমদার। কিন্তু এ খুন হয়েছে মতিঝিলে। মুর্শিদাবাদের কোতোয়ালের এক্তিয়ারের ভেতরে। এর বিচার করবে কাজিসাহেব। এ বিচারে মেহেদি নেসারের হাত আছে। সে ইচ্ছে করলে ফাঁসিও দিতে পারে, ফাঁসির হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতেও পারে। এ ব্যাপারে আসরফির খেলা চলে দু’পক্ষ থেকে। যে যত বড়লোক আসামি, তার বিচারে তত বেশি আসরফি খরচা হয়ে যায়। একবার যদি কাজিসাহেব জানতে পারে আসামি বড়লোক, ততই ঝুলিয়ে রাখে বিচারটা। দু’পক্ষ থেকেই লোক আসে, দর কষাকষি হয়, দর ওঠে আর কাজিসাহেব তত ভারিক্কি চালে কথা বলে।
