দর্পহারী মধুসূদন? সে কে? হু ইজ হি?
হুজুর, তিনিই তো এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন, দর্প দেখলেই তিনি তাকে বিনাশ করেন! দেখছ না সাহেব, নবাবের কত দৰ্প আমাদের! মাথার ওপর বসে সেই দর্পহারী তো সমস্ত দেখছেন!
সাহেব এবার উদ্ধব দাসের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
বললে–তুমি তো বেশ নতুননতুন কথা বলছ পোয়েট! ইন্ডিয়াতে এতদিন এসেছি, এসব কথা তো আগে আমাকে কেউ বলেনি হে!
উদ্ধব দাস বললে–তুমি আমার একটা ছড়া শুনবে সাহেব? নতুন একটা ছড়া বেঁধেছি, শোনো
বলে উদ্ধব দাস গান আরম্ভ করলে
এসেছিলাম ভবে আমি
ভজব বলে হরির চরণ।
পড়ে ভূমে মাটি খেয়ে
ভুলে গেল আমার এ মন ।
ঘোর জননীর মায়া,
নিত্য বাড়ে মম কায়া
এ-সংসার ভোজবাজির ছায়া,
বিফলে গেল এ-জীবন ৷
দারা-সুত-পরিবার,
দেখো রে মন কে বা কার।
আঁখি মুদলে অন্ধকার,
বেঁধে লবে তোরে শমন ॥
দিনান্তরে একবার,
ডাক কৃষ্ণ সারাৎসার।
অন্তিমে পাবে নিস্তার,
তিনি ব্ৰহ্ম সনাতন ॥
হঠাৎ গানের মাঝখানেই হরিচরণ এসে হাজির। বললেনা গো, তুমি ওদের জামাই নও গো
আমি ওদের জামাই নই? কিন্তু আমার সঙ্গে যে ওনার বিবাহ হয়েছে প্রভু! সম্প্রদান হয়েছে, কুশণ্ডিকা হয়েছে, মালাবদল হয়েছে। ওনার নাম তো মরালীবালা দাসী?
কর্নেল ক্লাইভ সাহেব এতক্ষণ সব শুনে হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিছুই বুঝতে পারছিল না।
বললে–হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই লেডির নামও মরালীবালা ডাসি! তুমিই ওর হাজব্যান্ড?
উদ্ধব দাস সবিনয়ে বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ প্রভু! আমারই স্ত্রী উনি।
হরিচরণ বললে–না না স্যার, এ অন্য লোক, এ ওর হাজব্যান্ড নয়
কিন্তু পোয়েট যে বলছে ওর ওয়াইফ?
তা বলুক, ও পাগল! পাগলের কথায় কান দেবেন না আপনি! তুমি এখন যাও বাছা, আমি ভুল করে তোমায় ডেকেছিলাম গো! তুমি যাও
সাহেব কিন্তু ছাড়বার লোক নয়। বললে–ব্যাপারটা কী বলল তো? তোমার ওয়াইফের নামটা কী বলো তো?
মরালীবালা দাসী, প্রভু।
কোথায় তোমার শ্বশুরবাড়ি?
আজ্ঞে হাতিয়াগড়ে।
সাহেব হরিচরণের দিকে ফিরে বললে–তা হলে তো সবই মিলে যাচ্ছে। পোয়েটের বউও তো পালিয়েছে। নিশ্চয়ই কোথায় গোলমাল আছে হরিচরণ!
উদ্ধব দাস বললে–ঠিক ধরেছেন আপনি প্রভু! গোলমাল আছে সে তো আমি আগেই আপনাকে বলেছি আজ্ঞে।
কীসের গোলমাল!
উদ্ধব দাস বললে–আজ্ঞে, আমার বউ যে আমাকে পছন্দ করে না।
কেন? লাইক করে না কেন?
আপনিই বলুন প্রভু, আমাকে কী করে পছন্দ করবে? আমার তো চেহারা ভাল নয়, আমাকে কি পছন্দ হয় কারও?
কিন্তু তুমি তো পোয়েট, তোমার পোয়েট্রি তো আমার খুব ভাল লাগছে! কেন তোমাকে লাইক করবে না?
তারপর বললে–চলো তো, তুমি আমার সঙ্গে ভেতরে চলো তো, তোমার ওয়াইফকে তুমি চিনতে পারবে তো?
হরিচরণ বাধা দিয়ে বললে–না স্যার, দিদি জামাইকে ভেতরে নিয়ে যেতে বারণ করেছে কিন্তু হাজব্যান্ড-ওয়াইফে মিল হবে না, এটা তো ভাল কথা নয়, দিস ইজ ভেরি ব্যাড–চলো পোয়েট ভেতরে চলো, আমি তোমার বউয়ের সঙ্গে মিল করিয়ে দেব
কিন্তু ভেতরে আর যেতে হল না। ভেতর থেকে দুর্গাই বেরিয়ে এসে বললে–না সাহেব, ও আমার জামাই নয়
তারপর উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে বললে–তুমি আবার কেন এখেনে মরতে এসেছ শুনি? আর মরবার জায়গা পেলে না? আমরা মরছি নিজের জ্বালায় আর তুমি কিনা আবার জ্বালাতে এসেছ? একজনকে জ্বালিয়েও তোমার আশ মেটেনি? আর একজনের জীবনটাও নষ্ট করতে চাও?
উদ্ধব দাস হঠাৎ দুর্গাকে এখানে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল।
বললে–আমার কী অপরাধটা হল মা-জননী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না
আর বুঝে দরকার নেই তোমার, তুমি এখান থেকে যাও–
ক্লাইভ সাহেব, হরিচরণ দু’জনেই যেন হতবাক হয়ে গিয়েছিল কাণ্ডকারখানা দেখে।
উদ্ধব দাস নিজের পুঁটলিটা আবার মাথায় করে নিলে। তারপর সাহেবের দিকে ফিরে বললে–তা হলে আসি প্রভু।
এতক্ষণে ক্লাইভ সাহেবের মুখে যেন কথা বেরোল। দুর্গার দিকে ফিরে বললে–তা হলে এ তোমার জামাই নয় দিদি?
দুর্গা ঘেঁকিয়ে উঠল–ওই অকালকুষ্মণ্ডটা আমার জামাই হতে যাবে কোন দুঃখে শুনি সাহেব? অমন জামাইয়ের হাতে মেয়েকে তুলে দেওয়ার চাইতে গলায় দড়ি দেওয়া যে ভাল সাহেব
সাহেবের যেন তবু কেমন সন্দেহ হল। বললে–তোমার মেয়েকে একবার জিজ্ঞেস করো না দিদি, তোমার মেয়ে হয়তো জামাইয়ের সঙ্গে একবার কথা বললে–দু’জনের মিটমাট হয়ে যেত!
না সাহেব, আমার মেয়ে কথা বলবে না ওর সঙ্গে। তুমি যাও বাছা এখেন থেকে
হঠাৎ অ্যাডমিরাল ওয়াটসন এসে হাজির।
কর্নেল!
ক্লাইভ মুখ ফেরাতেই ওয়াটসন বললে–তোমার এখনও সেই নেটিভ মেয়েদের ওপরে লোভ গেল না শোনো, এদিকে নবাবের লেটার এসেছে, এই যে
নবাব লিখেছেন–
তোমরা হুগলি লুণ্ঠন করিয়া আমার প্রজাগণের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করিয়াছ। ইহা ব্যবসায়ী বণিকের উপযুক্ত কার্য নহে। আমি ইহার জন্য রাজধানী হইতে হুগলি পর্যন্ত আসিয়াছি। যাহা হউক, ইংরাজেরা যদি আমার আদেশ মান্য করিয়া বণিকের ন্যায় কার্য করেন তবে আমি যথোচিত ক্ষতিপূরণ করিয়া তোমাদের সন্তোষসাধন করিতে প্রস্তুত আছি। তোমরা খ্রিস্টান, বিবাদ বাধানো অপেক্ষা মোলযোগের মীমাংসা যে শ্ৰেয় তাহা অবশ্যই জ্ঞাত আছ। তবে যদি তোমরা কোম্পানির ক্ষতি করিয়া যুদ্ধ করিতেই সংকল্প করিয়া থাকো, তাহা হইলে পরে আমাকে দোষ দিয়ো না
