ওয়াটসন সেই চিঠিখানা দেখালে, সেই চিঠির উত্তরটাও দেখালে।
কর্নেল ক্লাইভ পড়তে লাগল।
মান্যবর নবাব বাহাদুর বরাবরেষু–
ইংরেজ-কোম্পানির বাণিজ্য রক্ষাৰ্থ ইংলভাধিপ আমাকে এই দেশে প্রেরণ করিয়াছেন। আপনি বলপ্রয়োগে ইংরেজদিগকে কলিকাতা হইতে বিতাড়িত করিয়াছে। তাহাদের বহু পল্টন ও বহু অর্থ লুণ্ঠিত হইয়াছে। ইংরেজ কোম্পানির বাণিজ্যের জন্য মোগল-এম্পায়ারের প্রভূত মুনাফা আসিতেছে। আপনার আমির-ওমরাহরা এবং আপনার বেগমরা পর্যন্ত আমাদের কোম্পানির সহিত বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করিয়া উপকৃত হইতেছেন। অতএব ভরসা করি, ইংরাজ পক্ষের বাণিজ্যাধিকার পুনঃপ্রদান ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ করিয়া বাধিত করিবেন..’
এর উত্তরে নবাব কী লিখেছে?
ওয়াটসন বললেন–এই দেখো নবাবের চিঠি। নবাব লিখেছে–আপনার পত্র পাইবামাত্রই উত্তর প্রদত্ত হইয়াছে। কিন্তু বোধ হইতেছে সে উত্তর আপনারা পান নাই। সুতরাং পুনরায় লিখিতেছি ইংরেজ অধ্যক্ষ ড্রেক আমার আদেশনামানিয়া পলায়িত প্রজা কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয় দিয়াছিলেন, তজ্জন্য তাহাকে শাস্তি দিয়াছি। তাহার বদলে অন্য কাহাকে অধ্যক্ষ মনোনীত করিলে ইংরেজদিগের বাণিজ্যাধিকার পুনস্থাপনায় আমার কোনও আপত্তি নাই।
তারপর দেখো, আমি সেই চিঠির উত্তরে এই চিঠি লিখেছিলাম–’রাজারা স্বকর্ণে শুনিয়া বা স্বচক্ষে দেখিয়া কার্য করেন না, এজন্য কুটিল কর্মচারীবর্গের দ্বারা তাহারা অনেকসময় প্রতারিত হন। আপনার নিজের আমির-ওমরাহরাই যত নষ্টের জড়। আপনি সেই কুপরামর্শদাতাদের শাস্তি দিন, ইংরেজপক্ষের। লোকসানের ক্ষতিপূরণ করুন। ড্রেক সাহেব কোম্পানির ভৃত্য। তাঁহাকে শাস্তি দিবার অধিকার আপনার নাই। কোম্পানির নিকট জানাইলে কোম্পানিই তাহার বিচার করিবেন।
ওয়াটসন বললেন–এর পর কী করতে চাও তুমি, বলো–এ-চিঠির উত্তর এখনও কিছু আসেনি–
কর্নেল ক্লাইভ বললে–আমি বলি নবাবের সঙ্গে ঝগড়া করে আমরা পারব না—
তুমিও শেষকালে ভয় পেয়ে গেলে?
ক্লাইভ হাসল। বললে–ভয় পেলে আর এখানে আসতুম না এমন করে। ভয় পেলে ইংলন্ডেই থেকে যেতুম, কিন্তু ভয় আমার জন্যে নয়, ভয় তোমার জন্যে, ভয় তোমাদের কোম্পানির জন্যে। মোটা টাকা প্রফিট বন্ধ হবার ভয়। ফ্রান্সের সঙ্গে এখন লড়াই বেধেছে আমাদের, সে-চিঠি তো তুমি পেয়েছ। এইসময় নবাব যদি এখানকার চন্দননগরের ফ্রেঞ্চ কম্যান্ডারের সঙ্গে হাত মেলায় তখন আমাদের দশা কী হবে ভাবো তো
হঠাৎ হরিচরণ ঘরে ঢুকল। বললে–আপনাকে একবার ভেতরে ডাকছেন—
কে?
দুগ্যাদিদি!
ক্লাইভ বললে–বলো যাচ্ছি
ওয়াটসন জিজ্ঞেস করলে সেই ফিমেল দুটোকে এখনও রেখেছ নাকি?
ক্লাইভ রেগে উঠল ফিমেল বোলো না, বলো লেডি! একটু রেসপেক্ট নিয়ে কথা বলা উচিত। মেয়েদের সম্বন্ধে।
ও, তুমি এখনও সেইরকম আছ দেখছি। যদি লড়াইতে জিততে চাও তো ওসব ছেড়ে দাও রবার্ট, মেয়েদের উইকনেস সর্বনাশ করে দেবে তোমার। ভুলো না আমরা এখানে ফুর্তি করতে আসিনি
আবার সেদিনকার মতো ক্লাইভের মাথায় রক্ত চড়ে উঠছিল। কিন্তু নিজেকে সামলে নিলে। বললে–তুমি এখন যাও ওয়াটসন, আমি এখন টায়ার্ড
ওয়াটসন গজগজ করতে করতে চলে গেল। ক্লাইভ ভেতরের দিকে আসতেই দেখলে, দাওয়ার ওপর কে বসে রয়েছে।
তুমি কে? হু আর ইউ?
লোকটা উঠে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে প্রণাম করলে। বললে–অধীনের নাম উদ্ধব দাস হুজুর
তার মানে বেগার! ভিক্ষে চাও? না, এখানে কোনও ভিক্ষেটিক্ষে হবে না।
ক্লাইভ সাহেব রেগেই ছিল সেই থেকে। ওয়াটসনের কথায় মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল। তারপর এই ভিখিরিটা এখানে এসেছে। হয়তো ভিখিরি নয়, নবাবের মিলিটারি ইনফরমার। স্পাই। নবাবের গুপ্তচরেরা এইরকম করেই ইংলিশ আর্মির খবর নিয়ে যায়। কী রকম একটা কৌতূহল হল।
জিজ্ঞেস করলে এখানে কী করতে এসেছ তুমি? আমার সেন্ট্রি তোমায় ঢুকতে দিলে?
আমাকে সবাই সব জায়গায় ঢুকতে দেয় সাহেব, আমাকে সবাই ভালবাসে কিনা, শুধু আমার বউই ভালবাসে না, তাই পালিয়ে গেছে আমায় ছেড়ে
তোমার ওয়াইফ? তোমায় ছেড়ে পালিয়ে গেছে? হোয়াই?
সেই জন্যেই তো আমি গান বেঁধেছি সাহেব আমি রব না ভব-ভবনে! যে-নারী করে নাথ পতিবক্ষে পদাঘাত, তুমি তারই বশীভূত, আমি তা সব কেমনে।
সাহেব কথাগুলোর মানে ভাল করে বুঝতে পারলে না। বললে–তার মানে কী?
উদ্ধব দাস বললে–তার মানে হল, আমার নিজের বউই যখন আমায় তাড়িয়ে দিলে তখন আর আমি এ-সংসারে থেকে কী করব? আমি তাই ঘুরে ঘুরে বেড়াই সাহেব, সারা পৃথিবীই আমার সংসার, আমি যখন যেখানে থাকি সেইটেই আমার ঘর।
হোল ওয়ার্ড তোমার ঘর?
কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ যেন নতুন একটা কথা শুনল, নতুন একটা কথা শিখল। এতদিন ইন্ডিয়ায় এসেছে, এমন কথা তো কেউ আগে বলেনি। হোল ওয়াডই একটা ফ্যামিলি, একই ফ্যামিলিরই লোক। আমরা সবাই। তবু কেন ওরা ঝগড়া করে? তবু কেন ওরা লড়াই করতে পাঠিয়েছে তাকে?
তোমার ওয়াইফ পালিয়ে গেছে বলে সত্যিই তোমার কষ্ট হয় না?
উদ্ধব দাস হাসল হোহো করে। বললে–কষ্ট না হলে কি কবি হতে পারতুম গো সাহেব? কষ্ট হয় বলেই তো ওই গান বাঁধতে পেরেছি! কষ্ট হওয়া ভাল গো, সাহেব, একটু কষ্ট হওয়া ভাল। তোমার একটু কষ্ট হোক আমার মতন, দেখবে তুমিও কত কাজ করতে পারবে। আর যদি একটু অহংকার হয় তোমার তো তুমি গেলে! দর্পহারী মধুসূদন
