সবাই যখন মরোমরো, তুমি তখন শান্তি চাইছ! বেশ তো!
ছোটমশাই বললেন–তা হলে তুমি যা বলছ তাই-ই করি! আজকেই রওনা দিই কেষ্টনগরে, গিয়ে মহারাজকে নিয়ে জগৎশেঠজির কাছে যাই। গিয়ে বলি এইসব ব্যাপার।
হ্যাঁ, বলবে। তারপর ফিরিঙ্গিরা রয়েছে, ফরাসি-ফিরিঙ্গিরাও রয়েছে, তারাও তো খেপে আছে নবাবের ওপর, তাদেরও তো তোমরা দলে টানতে পারো! ইচ্ছে থাকলে কী না পারে লোকে। আর তা যদি না বলতে পারো তো আমি নিজেও গিয়ে বলতে পারি।
না না, তুমি মেয়েমানুষ, তুমি যাবে, সেটা ভাল দেখাবে না!
কেন, রানিভবানীও তো তোমাদের দলে, তিনিও তো মেয়েমানুষ। তিনি যদি আসেন, আমিও যেতে পারি!
রানিভবানী আর তুমি? ওঁরা কী ভাববেন বলল তো?
কী আর ভাববেন, ভাববেন হাতিয়াগড়ের জমিদারের কোনও সাহস নেই তাই তার বউকে পাঠিয়েছে। তুমি কি নিজেকে পুরুষমানুষ বলতে চাও? পুরুষমানুষ হলে কি এর পরেও কেউ চুপ করে। বাড়িতে বসে থাকতে পারে? আজ তোমার চক্ষুলজ্জাটাই বড় হল, আর নিজের বউয়ের ধর্মটা কিছু। নয়?
ছোটমশাই গম্ভীর হয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন–তা হলে আজই যাবার ব্যবস্থা করি, যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তো বলে দিয়ে আমি তালুক দেখতে বেরিয়েছি, বুঝলে?
সরখেলমশাই তখনও অতিথিশালায় ছিল। তার হাতে চিঠি দিলেন ছোটমশাই। লিখলেন–আমি আপনার চিঠি পাইয়া অতিশয় চিন্তান্বিত হইয়া পড়িয়াছি। অবিলম্বে আপনার বরাবর হাজির হইয়া সমুদয় নিবেদন করিবার মানস করিয়াছি। সাক্ষাতে সমস্ত জ্ঞাত করাইব।
সেদিন গভীর রাতে ছোটমশাই আবার নদীর ঘাটে একটা বজরাতে উঠলেন। গোকুলও সঙ্গে সঙ্গে বজরায় উঠল। কাকপক্ষীতেও যাতে টের না পায় তাই সরখেলমশাইকে আগেই যাত্রা করতে বলে দিয়েছিলেন। ছাতিমতলার ঢিবির কাছে যেন কালো মতন একটি কী নড়ে উঠল।
ছোটমশাইয়ের কী যেন সন্দেহ হল। গোকুলকে জিজ্ঞেস করলেন–ওখানে কে রে গোকুল?
গোকুলও দেখতে পেয়েছিল। জোরে গলা ছেড়ে জিজ্ঞেস করলে ওখানে কে গা, কে ওখানে দাঁড়িয়ে?
কেউ উত্তর দিলে না। শুধু মনে হল ছায়ামূর্তিটা যেন নড়ে উঠে সরে গেল। কিন্তু কিছু উত্তর দিলে না।
গোকুল আবার চেঁচিয়ে উঠল–কে ওখানে? ওখানে কে সরে গেলে?
তবু কারও উত্তর নেই।
তবে হয়তো গোরুটোরু হবে। কেরষাণটা গাইটাকে গোয়ালে পুরতে ভুলে গেছে।
গোকুল বললে–ও ওই ভূতেশ্বরের কাণ্ড, শ্যামলা গাইটাকে বাইরে রেখেই খোঁয়াড় বন্ধ করে দিয়েছে হুজুর, ওভেনে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে–যদি
ছোটমশাই বললেন–থাক গে, এবার বজরা ছাড়তে বল
কিন্তু বজরা ছাড়বার আগেই ছাতিমতলার ঢিবির ওপার থেকে চিৎকার এল সরখেল মশাইয়ের। সরখেলমশাই চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসছে–ওগো, কাদের নৌকো গো, বাঁধো, আমি যাব
গোকুল বজরা বাঁধতে বললে। কিন্তু ছোটমশাই সরখেলমশাইকে দেখে অবাক হয়ে গেছেন।
সরখেলমশাইও ছোটশাইকে দেখে হতবাক।
একী? তুমি? তুমি যাওনি এখনও? তোমাকে যে দু’প্রহরের সময় যেতে বললাম!
সরখেল তখনও হাঁফাচ্ছে। নদীর ঘাটে বইঠার ঝপঝাঁপ শব্দ পেয়েই দৌড়ে এসেছিল ঊর্ধ্বশ্বাসে।
বললে–হুজুর, সব্বনাশ হয়ে গেছে–
কী হল?
আজ্ঞে, ডিহিদারের লোক ধরে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে।
কেন?
তা জানিনে হুজুর, অতিথিশালা থেকে আমি বেরোচ্ছি, হঠাৎ কে একজন এসে আমাকে ডিহিদারের দফতরে যেতে বললে।
ছোটমশাই বললেন সর্বনাশ! তারপর?
তারপর আজ্ঞে, ডিহিদার আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি কোত্থেকে এসেছি, কী কাজে এসেছি, কেন এসেছি, হ্যাঁনত্যান কত কী! শেষে আমাকে বললে–চিঠিখানা দেখি?
তুমি চিঠি দিলে নাকি?
আমি কি দিতুম হুজুর? তারা যে কেড়ে নিলে!
কেড়ে নিলে আর তুমিও দিয়ে দিলে? চিঠিখানা পড়লে নাকি ডিহিদার?
আজ্ঞে হাঁ, পড়লেন। সবটা পড়লেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন আমি কী চিঠি নিয়ে এসেছি, সেখানাতে কী লেখা ছিল? আমি বললাম, আমি তা দেখিনি হুজুর, আমি লেখাপড়া জানি না, দেখলেও পড়তে পারতাম না।
ছোটমশাই চিন্তিত হয়ে উঠলেন। বললেন–কী সর্বনাশ করলে এখন বলল দিকিনি সরখেল। আমি তোমায় কতবার সাবধানে যেতে বলেছি না, আর তুমি কিনা এই কাজ করলে?
আমি তো কতবার এমনি চিঠি নিয়ে গিয়েছি হুজুর, কখনও তো এমন হয়নি!
আর কী হবে! যা হবার তা হয়ে গেছে। ছোটমশাই বজরা ছাড়তে বলে দিলেন। কাছি খুলে দিলে মাঝিরা। ছোটমশাই সরখেলমশাইকে জিজ্ঞেস করলেন–যে-লোকটা তোমায় ডেকে নিয়ে গেল তার কী রকম চেহারাটা বলো তো? মনে আছে?
সরখেলমশাই বললে–খুব মনে আছে হুজুর, পাতলা ক্ষয়া চেহারা, শ্যামলা রং গায়ের, মাথায় বড় বড় চুল, মুখে নুর!
ঠিক হয়েছে! ছোটমশাই শিউরে উঠলেন চেহারার বর্ণনা শুনে। বশির মিঞা! বশির মিঞা তা হলে আবার এসেছে হাতিয়াগড়ে। সেবার কার্তিক পাল সেজে এসে উঠেছিল অতিথিশালায়, এবার এসে উঠেছে ডিহিদার রেজা আলির দফতরে! কিন্তু এবার কীসের মতলব!
ছোটমশাইয়ের বজরা তখন সোঁ সোঁ করে তিরের বেগে উজানে বয়ে চলেছে।
*
বরানগরের ছাউনির ভেতর তখন ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষের মানচিত্র আঁকা হতে চলেছে পাকাপাকিভাবে। সে ভারতবর্ষ আর-এক ভারতবর্ষ। সে ভারতবর্ষ থেকে র-মেটিরিয়াল চালান যাবে ইউরোপে, আর ফিনিশড-প্রোডাক্ট হয়ে আমদানি হবে এই ইন্ডিয়ায়। এরা কাপড় পরতে পায় না, এখানে চালান করবে সেই কাপড় ইংলন্ড। সেই মানচিত্রে ইন্ডিয়ার রং হবে রেড। সেই রেড রং দিয়েই এম্পায়ারের ভিত তৈরি হবে এখানে। এই যেখানে হাতিয়াগড়ের ছোটরানি আর তার ঝি দুর্গা এসে উঠেছে। শুধু যে লাল রং হবে তাই-ই নয়, ইংলন্ডের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশনের সঙ্গে সঙ্গে যাতে রেডি মার্কেট পাওয়া যায়, তার জন্যেও তো জমি তৈরি করা দরকার; ইন্ডিয়ার মতো এমন উর্বর জমি কোথায় পাওয়া যাবে? এখানে বাদশার অস্তিত্ব তখন লোপাট হবার জোগাড়। এখানে-ওখানে যেসব স্টেট আছে তারা বাদশাকে খাজনা দেবার কথাও ভুলে গেছে ইচ্ছে করে। তারপর মানুষ যারা তখনও কোনওরকমে টিকে আছে, তারাও মনে মনে বলছে–আমাদের ভোমরা বাঁচাও সাহেব, আমরা মরে যাচ্ছি
