সরখেলমশাই আছে না চলে গেছে?
ছোটমশাই বললেন–আছে, অতিথিশালায় থাকতে বলেছি—
বড় বউরানি বললে–এ-চিঠির কী উত্তর দেবে, কিছু ভেবেছ?
না, এখনও কিছু ভেবে পাইনি।
বড় বউরানি বললে–তুমি ভেবে পাওনি, কিন্তু আমি ভেবে ফেলেছি
কী ভেবেছ?
বড় বউরানি বললে–তুমি মহারাজকে লিখে দাও, আমি নিজে যাব মহাতাপচাঁদ জগৎশেঠের কাছে, যদি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র পারেন তো তিনি একবার যেন সেখানে আসেন।
তুমি যাবে? তুমি নিজে?
কেন, দোষ কী?
না, সে কথা বলছি না, জগৎশেঠজির কাছে গিয়ে তোমার লাভ কী হবে? ছোটবউকে কি জগৎশেঠ লুকিয়ে রেখে দিয়েছে?
না, তা রাখেনি। লুকিয়ে রেখেছে নবাবের লোক।
কী করে জানলে?
কেন, নবাবের লোক লুকিয়ে রাখতে পারে না? নবাবের কোন কাজটা করতে বাধে শুনি? পরের বউয়ের ওপর নজর যে দিতে পারে, সে সব পারে! আমি নিশ্চয় করে বলছি, এ আর কারও কাজ নয়; নবাবের ডিহিদার-ফৌজদার আর তার চরেরা মিলে একাজ করেছে। ওই যে লোকটা এসেছিল, নিজের নাম বলেছিল কার্তিক পাল–ওই বশির মিঞা এই কাণ্ড করেছে।
ছোটমশাই বললেন–বশির মিঞা কী করে জানবে? তার আগেই তো মাঝরাত্তিরে বজরা করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে
তা তুমি কি ভেবেছ ওদের এক জোড়া চোখ? তা হলে এখানে ডিহিদার রেজা আলি রয়েছে কী করতে? ঘাস কাটতে?
ছোটমশাই বললেন–সেই জন্যেই তো আমি ওদের অমন করে একা একা পাঠাতে চাইনি, তুমি জোর করলে তাই তো পাঠালাম, তখনই জানতুম একটা না একটা বিপদ বাধবে। শেষে যা ভেবেছিলুম তাই হল তো? এখন মহারাজাই বা কী করবেন, জগৎশেঠজিই বা কী করবেন? কোথায় যে তারা আছে, কী করছে, কী খাচ্ছে, কারও বোঝবার উপায় নেই।
বড় বউরানি বললে–দোষ তুমি তো আমারই দেখলে। আর যখন ছোটকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলে তখন তো আমার পরামর্শ নাওনি? তখন তো আমার কথা একবারও শোনোনি? তখন আমার কথা শুনলে কি আর এই দুর্দশা হয়। তখনই তো তোমার ভাবা উচিত ছিল এসব কথা।
তারপর একটু ভেবে বললে–তা সে যা-হবার তা হয়ে গেছে, এখন ভাবলে কোনও লাভ নেই, এখন আমি মুর্শিদাবাদে যাচ্ছি, তার জোগাড়যন্ত্র করে দাও।
তুমি যাবে মুর্শিদাবাদে? সেখানে কোথায় গিয়ে উঠবে? কার কাছে যাবে?
তা বাংলাদেশে কি মানুষ নেই? সব মানুষ কি বাংলাদেশের মরে গেছে? জগৎশেঠজিরও তো বউ-ঝি আছে, তার তো একটা বাড়ি আছে, সে-বাড়িতে তো থাকবার জায়গাও আছে। সেখানেই গিয়ে উঠব। গিয়ে জগৎশেঠজিকে বলব যে আপনারা থাকতে বাংলাদেশের মেয়েরা কি সব আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পুড়ে মরবে? রাজপুতদের মেয়েদের মতো জহরব্রত করবে?
ছোটমশাই বললেন–তুমি একটু মাথা ঠান্ডা করো, যা করবে মাথা ঠান্ডা করে করো। অমন হুটপাট করে কিছু কোরো না। তাতে তোমারও ভাল হবে না, আমারও ভাল হবে না
বউ বউরানি বললে–আর ভাল হয়ে কাজ নেই, যথেষ্ট ভাল হয়েছে
কিন্তু শেষকালে যে সব জানাজানি হয়ে যাবে! একবার ডিহিদারের কানে গেলে তখন মেহেদি নেসারের কানেও উঠে যাবে, তখন আর সামলাতে পারব না, তাও বলে রাখছি–
আর সামলাবার রইলটা কী শুনি? বউ গেল, ইজ্জত গেল, মান-সম্ভ্রম সব গেল, এখনও তুমি সামলাবেটা কী? সামলাবার আছে কী যে সামলাবার কথা বলছ?
ছোটমশাই বললেন অত চেঁচিয়ো না তুমি, কেউ শুনতে পাবে–
তা তুমি কি ভাবো এইরকম করে বরাবর খবরটা চাপা রাখতে পারবে তুমি? একদিন ছোটবউটা গেছে, এরপর কবে তোমার তালুকও যাবে, তখন কেঁদেও কূল পাবে না!
ছোটমশাই কিছুক্ষণ ভেবে বললেন–তা তুমি কী করতে বলল আমাকে। আমি না-হয় তাই-ই করব।
তোমাকে আর কিছু করতে হবে না, যা করবার আমিই করব।
তা কী করবে তুমি সেটা আমাকে বলবে তো?
তোমাকে বলেই বা কী লাভ হবে বলে তোতুমি তো কোনও সুরাহা করতে পারবে না!
বলল আমাকে, বলে দাও, কী করলে সুরাহা হয়!
তা তোমরা এতগুলো মানুষ এক দলে রয়েছ, তোমরা সবাই মিলে পরামর্শ করে একটা সুরাহা করতে পারলে না, আর আমি মেয়েমানুষ হয়ে তোমাদের সুরাহার পথ বাতলে দেব? তুমি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে যাও, গিয়ে জগৎশেঠজির সঙ্গে দু’জনে মিলে দেখা করো! তাকে গিয়ে বলো যে বাংলাদেশের মানুষগুলো মরে-হেজে যাক এইটেই কি আপনি চান? আপনার টাকা আছে, আপনার লোকবল আছে, দিল্লির বাদশার ওপর আপনার এত জোর আছে, তবু আপনি এর একটা বিহিত করবেন না?
তা নবাবের সঙ্গে কি লড়াই করতে বলো আমাদের?
কেন, লড়াই করতে তোমাদের এত ভয়?
ভয় কে বললে? কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যেই যে কারও সঙ্গে কারও মতের মিল নেই। কে যে নবাবের দলে আর কে যে নয়, তারই যে ঠিক নেই। আমাদের সামনে তো সবাই নবাবকে গালাগালি দেয়, কিন্তু নবাবের সামনে গিয়ে আবার যে সবাই মাথা নিচু করে কুর্নিশ করে! নবাব একটু হেসে কথা বললে–যে সবাই কৃতার্থ হয়ে যায়। যে-ই একটু মুখ বেঁকায় অমনি তাকে চাকরি দিয়ে নবাব দলে টেনে নেয়।
কিন্তু আজ না-হয় হাতিয়াগড়ের বউকে নিয়ে গেছে, কাল যদি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বউকে নিয়ে যায় তো তখন কি মহারাজ চুপ করে বসে থাকবেন তোমার মতো?
তা আমি কি চুপ করে বসে আছি? আমি কি ভাবছি না মনে করছ?
বড় বউরানি রেগে গেল। বললে–বসে বসে তুমি তা হলে ভাবো, তাতেই বউ উদ্ধার হয়ে যাবে, আর কী!
তা তুমি অমন রাগ করছ কেন? দুটো পরামর্শের কথা বলো, তা হলে তো তবু আমি শান্তি পাই।
