নজর মহম্মদ বললে–হুজুর, মরিয়ম বেগম সফিউল্লা সাহেবকে খুনের দায়ে গ্রেফতার হয়েছে, এখনও মতিঝিলের ফাটকে আটকে আছে তাকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচিয়ে দিতে হবে
কেন?
হুজুর, মরিয়ম বেগমসাহেবা এর ভারী পেয়ারের মেয়েমানুষ। বড় পেয়ার করে এ মরিয়ম বেগমকে, মরিয়ম বিবির ফাঁসি হয়ে গেলে এর কলিজা একেবারে ফেটে যাবে হুজুর! আপনি যদি মরিয়ম বিবিকে ছেড়ে দেন তো এর খুব আনন্দ হয়! তার জন্যে আপনাকে এ খুশি করে দেবে–
সব শুনে কাজিসাহেব দাড়িতে হাত বুলোতে লাগলেন।
বললেন–দুনিয়া বড় খতরা হয়ে গেছে রে নজর, আজকাল সবকিছু মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে, দেখছিস তো; বড় খতরা হয়ে যাচ্ছে দুনিয়া
নজর বলতে লাগল–বড় গরিব মানুষ এই কান্তবাবু হুজুর, ছ’টাকা তলব পায়, উপরি ভি নেই, কোত্থেকে দেবে আপনাকে বেশি।
কাজিসাহেব তখনও দাড়িতে হাত বোলাচ্ছেন। বলতে লাগলেন–সব চিজ মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে এটা তো তোদের খেয়াল রাখতে হয় নজর!
নজর বললে–তাই তো বলছি কত নেবেন তাই বলুন, বেশি বাহানা করবেন না, পাঁচশো আসরফি!
কী যে বলিস, পাঁচশো আসরফি তো আমার মুফতি খুদ নেবে, তারপর আছে আমার কাজি-উল-দোজাত, তারপর আছে দারোগা-ই-আদালত–সব চিজ যে মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে আজকাল নজর–
আচ্ছা, তা হলে এক হাজার? তার বেশি ও দিতে পারবে না হুজুর, ও মারা যাবে, জানে মারা যাবে
গরিব আদমি! বেশি আর টানাটানি করলেন না কাজিসাহেব।
বললেন–ঠিক আছে, গরিব আদমি, তা হলে তাই-ই দে—
নজর উঠে দাঁড়াল। বললে–বহুত মেহেরবানি হুজুর, আসরফি নিয়ে এসে কালই ও দিয়ে যাবে আপনার বরাবর–মেহেরবানি রাখবেন গরিবের ওপর হুজুর
নজর মহম্মদের সঙ্গে কান্তও বাইরে বেরিয়ে এল।
ওদিকে মতিঝিলে তখন মেহেদি নেসার সাহেব, ইয়ারজান সাহেব, ইবলিশ মিঞা সবাই গিয়ে হাজির হয়েছে। সঙ্গে কোতোয়াল সাহেবও গিয়েছে।
ফাটকের সামনে গিয়ে নানিবেগমকে সবাই মাথা নিচু করে কুর্নিশ করলে।
মরিয়ম বেগমসাহেবাকে কোতোয়ালিতে নিয়ে যেতে এসেছি বেগমসাহেবা।
কাজিসাহেবের পরোয়ানা আছে?
জি বেগমসাহেবা!
নানিবেগম কী যেন ভাবলে। তারপর বললে–মির্জা মুর্শিদাবাদে আসবার আগে এর বিচার হবে, না পরে হবে?
তা তো মালুম নেই বেগমসাহেবা! কাজিসাহেব জানে!
তারপর নানিবেগম মেহেদি সাহেবের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল–পূর্ণিয়ার লড়াইয়ের খবর কী নেসার? মির্জা ভাল আছে?
হা বেগমসাহেবা!
তারপর কোতোয়াল সাহেব মরিয়ম বেগমকে নিয়ে ফাটকের বাইরে এল। মরালীও যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। যেতে যেতে বললে–আসি নানিজি!
কোতোয়াল সাহেব মরিয়ম বিবিকে পালকিতে তুলে নিয়ে রাস্তার দিকে চলতে লাগল। পেছনে পেছনে ঘোড়ায় চড়ে চলতে লাগল কোতোয়াল সাহেব, মেহেদি নেসার সাহেব, ইয়ারজান সাহেব, আর । আরও অনেকে।
কাজি সাহেবের হাবেলির বাইরে এসে দাঁড়াতেই কান্ত হতাশ হয়ে পড়ল। হাজার আসরফি। হাজার আসরফি দিলে মরালীকে কাজিসাহেব ছেড়ে দেবে। কিন্তু এই এক দিনের মধ্যে হাজার আসরফি কী রকম করে জোগাড় করবে!
হঠাৎ সামনে দিয়ে একটা পালকি আসছিল–হট যাও–হট যাও
তফাতে সরে দাঁড়াল কান্ত। নজর মহম্মদ বললে–ওই তো কোতোয়াল সাহেব মরিয়ম বিবিকে কোতোয়ালিতে নিয়ে যাচ্ছে
আর ওরা কারা?
আরে ওই তো কোতোয়াল সাহেব, মেহেদি সাহেব, ইয়ারজান সাহেব, আর পাহারাদারের দল
*
সেদিন সরখেলমশাই আবার এসে উঠল হাতিয়াগড়ের অতিথিশালায়। কেষ্টনগর থেকে এসেছে। খাজাঞ্চিবাবুকে ডেকে বললে–ছোটমশাই আছেন নাকি খাজাঞ্চিবাবু?
খাজাঞ্চিবাবু চেহারা দেখেই চিনে ফেলেছে। চুপি চুপি বললে–কেষ্টনগর থেকে এসেছ নাকি তুমি?
আজ্ঞে হ্যাঁ কর্তা!
তা হলে এসো আমার সঙ্গে
বলে সোজা অন্দর বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে একেবারে ছোটমশাইয়ের ঘরে নিয়ে গেল। তাকে সেখানে পৌঁছিয়ে দিয়ে খাজাঞ্চিবাবু নীচেয় নেমে এসেছে।
ছোটমশাইয়ের হাতে চিঠিটা দিতেই ছোটমশাই বললেন তুমি নীচেয় যাও, আমি তোমায় খবর পাঠাব।
সরখেল চলে যেতেই ছোটমশাই লেফাফাখানা ছিঁড়ে চিঠিখানা পড়তে লাগলেন।
চিঠিটা লিখছেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মন্ত্রী কালীকৃষ্ণ সিংহ মহাশয়
শ্ৰীযুক্ত রাজা হিরণ্যনারায়ণ রায় বাহাদুর অসংখ্য দীন প্রতিপালকেষু—
রাজাধিরাজ মহারাজ নবদ্বীপাধিপতি শ্রীল শ্রীযুক্ত কৃষ্ণচন্দ্র রায় আজ্ঞা মতো অত্র পত্রে নিবেদন কুরু, মহাশয়, মহাশয়ের ধর্মপত্নীকে অম্মাদাঞ্চলে মহারাজ-ভবনে পাঠাইবার ব্যবস্থাদি করিয়াছিলেন। সেইমতো মহারাজ কতিপয় দিবস অপেক্ষা করোন্তর হতাশ-পূর্ব জ্ঞাত করাইতেছেন যে অদ্যাবধি হাতিয়াগড়ের রানিমহাশয়ার আগমনের কোনও লক্ষণাদি নাই। বহু দিবস গত হওন পর কোনও বিপদাপদ আবির্ভাবের সন্দেহ উদ্রেক হওয়ায় অত্র পত্র পত্রবাহক মারফত প্রেরিত হইল। মহাশয় পত্রান্তরে সন্দেহভঞ্জন করতঃ শুভম্বিশেষ সংবাদ দানে চিত্তবিক্ষোভ রহিত করিবেন বাঞ্ছা করিয়া পত্র সমাপ্ত করিলাম। ইতি… চিরবশংবদ–
বড় বউরানি ঘরে এসেছিল। বললে–কার চিঠি?
এই দেখো–বলে ছোটমশাই চিঠিটা এগিয়ে দিলেন।
তারপর অনেকক্ষণ দু’জনেই চুপ করে রইলেন। একদিন ছটফট করছিলেন ছোটমশাই। তারও ঘুম আসেনি রাত্রে। দিনেরবেলাতেও কাছারিতে আসেননি। জগা খাজাঞ্চিবাবু সেরেস্তার কাগজপত্র নিয়ে। এসে দরকার মতো দেখিয়ে গেছে। হুকুমনামা নিয়ে গেছে। প্রজা-পাঠকরা যারা দেখা করতে এসেছে। তারা জেনে গেছে ছোটমশাইয়ের শরীর খারাপ। নীচেয় নামবেন না।
