সত্যিই কেউ কাঁদছে না। গোরা সাহেবরা এসেছে বলে মুর্শিদাবাদে যেন মহফিল শুরু হয়ে গিয়েছে। গোরা সাহেবদের জন্যে খানাপিনার বন্দোবস্ত হচ্ছে। সরাবের বন্দোবস্ত হয়েছে। মুরগি-মসল্লমের বন্দোবস্ত হয়েছে। পোলাউ-বিরিয়ানির বন্দোবস্ত হয়েছে। ঠিক মির্জা মহম্মদের বিয়ের সময় যা-যা যেমন-যেমন বন্দোবস্ত হয়েছিল, সব ঠিক তেমনি-তেমনি বন্দোবস্ত হয়েছে। আমি মিঞা-কি-মল্লার বাজাব না তো কি মালগুঞ্জ বাজাব? হোলি বাজাব? খেমটা বাজাব?
গুলসন বেগম!
পেশমন বেগম!
আখতার বেগম!
মুর্শিদাবাদের গ্রামের মানুষ হাঁ করে চেয়ে দেখছিল। এত বেগম একসঙ্গে দেখবার কখনও মওকা মেলেনি তাদের। সমস্ত বেগমই আসবে নাকি রে বাবা! এ তো রূপ নয়, আগুন। আগুনের ডেলা সব পঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েমানুষের চেহারা নিয়ে।
ক্লাইভ সাহেব চুপি চুপি মুনশিকে জিজ্ঞেস করলে–এসব ওম্যান কোত্থেকে এসেছে মুনশি?
কেউ এসেছে খোরাসান, কেউ এসেছে কান্দাহার, কেউ এসেছে চট্টগ্রাম থেকে। যেখান থেকে নারী-রত্ন পেয়েছে কুড়িয়ে এনেছিল নবাব।
সমস্ত নিজের ওআইফ?
নবকৃষ্ণ মুনশি বললে–না হুজুর, সব ব্যাডওম্যান, খারাপ মেয়েমানুষ!
মরিয়ম বেগম!
অবাক কাণ্ড! এবার কেউ এল না।
মনসুর আলি মেহের আবার ডাকলে–মরিয়ম বেগম–মরিয়ম বেগম–
এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এগারোজন বেগম এসে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। আর একজন বাকি আছে। সবসুন্ধু বারোজন বেগম। কিন্তু মরিয়ম বেগম আসছে না কেন? পিরালি তখন হারেমের ভেতরে গোরু-খোঁজা শুরু করে দিয়েছে। এ-ঘরে যায়, ও-ঘরে যায়। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। সাজিয়ে গুছিয়ে তাকেও তো তৈরি করে রেখে দেওয়া হয়েছিল।
বশির মিঞা দাঁড়াতে পারলে না। কোণের ফটকের কাছে গিয়ে ডাকতে লাগল–পিরালি, পিরালি—
পিরালির তখন প্রাণ যায়-যায় অবস্থা। মরিয়ম বেগমকে কোনও ঘরে পাওয়া যাচ্ছে না। এই তো সেদিন হাতিয়াগড় থেকে নবাবের জন্যে সেখানকার রানিবিবিকে নতুন আমদানি করা হল। নিয়মমাফিক তার নতুন নামও দেওয়া হল–মরিয়ম বেগম! এখন কোথায় গেল!
বশির মিঞা তখনও ডাকছে—পিরালি–
এগারোজন বেগম তখন মাথা নিচু করে ওড়নি ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর বাকি বেগম আসছে। না। কোথায় গেল মরিয়ম বেগম! জেনারেল সাহেবের কাছে বেইজ্জত হয়ে যাবে নাকি মিরজাফর আলি খাঁ সাহেব। নবাব-নিজামতের বদনামি হবে নাকি?
রসুনচৌকিতে ছোটে শাগরেদ হঠাৎ বলে উঠল–চাচা–
ছোটে শাগরেদ সবে নহবতে ফুঁ দিতে শিখছে। ইনসাফ মিঞা বাজাতে বাজাতেই তার চারদিকে চাইলে একবার।
চাচা, মরিয়ম বেগমকে পাওয়া যাচ্ছে না!
পাওয়া যাচ্ছে না!
বলে ইনসাফ মিঞার কী খেয়াল হল কে জানে, সুরটা সমে এসে থামতেই নহবতের মুখটা একবার আঙুল দিয়ে টিপে নিয়ে তখুনি আবার বাজাতে আরম্ভ করল। এবার মিঞা-কি-মল্লার নয়, মালগুঞ্জ। তবলচি সুরের মুখপাতটা শুনেই তবলায় একটা চটি কষিয়ে দিলে–বাহবা ওস্তাদ–বাহবা–
*
পশুপতিবাবু জিজ্ঞেস করলেন–তারপর মশাই? তারপর?
বললাম-পঁড়ান, একটু সবুর করুন! এই একহাজার পাতার পুঁথি কি এত শিগগির শেষ করা যায়? আপনার পূর্বপুরুষ উদ্ধব দাস এক মহাকবি ছিলেন মশাই। গল্প বড় মোচড় দিয়ে দিয়ে বলেন। একটুখানি পড়লেই পরের পাতা পড়বার জন্যে মনটা ছটফট করে–অথচ আসল খুঁটিটা কিছুতেই ছাড়েন না–হাতে রেখে দেন, শেষকালে চালবেন বলে–
সত্যিই উদ্ধব দাস কদিন ধরে একেবারে নেশাগ্রস্ত করে রেখে দিলে। দেখতে পাগলছাগল মানুষ হলে কী হবে, রসের কারবারে একেবারে রসিকরাজ। রসে টইটম্বুর।
পুঁথি যখন পড়া শেষ হল তখন গভীর রাত। সেই কলকাতার মাঝরাত্রেই যেন সমস্ত অষ্টাদশ শতাব্দীটা চোখের সামনে সশরীরে নেমে এল। সেই হাতিয়াগড়ের রানিবিবি, সেই কান্ত, সেই সিরাজ-উ-দ্দৌলা, সেই লক্কাবাগের লড়াই, সেই রবার্ট ক্লাইভ, সেই মহারাজ নবকৃষ্ণ মুনশি, সেই মরিয়ম বেগম আরও কত অসংখ্য চরিত্র চোখের সামনে সব যেন সজীব হয়ে উঠল।
পুঁথি শেষ করে শান্তিপর্বে’ উদ্ধব দাস লিখছেন–
কোম্পানির রাজ্য হইল, মোগল হইল শেষ।
দমদম-হাউসে আইল ইংরেজ নরেশ ॥
কৃষ্ণভজা বৈষ্ণবেরা আতঙ্কেতে মরে।
ব্রাহ্মণ হইয়া হিন্দু যত পইতা ফেলে ডরে ॥
হিন্দু ছিল মুসলিম হইল পরেতে খ্রিস্টান।
এমন দেশেতে বলো থাকে কার বা মান ॥
কোন দেশেতে ঘর বা তোমার কোন দেশে বা বাড়ি।
মরিয়ম বেগম বলে আমি অভাগিনী নারী ॥
পতি থাকতে পতি নাই মোর অনাথিনী অতি।
মনের মানুষ যেখানে থাক আমি তারই সতী ॥
তার যদি বা মৃত্যু ঘটে আমি কীসে বাঁচি।
তারে কাছে লইয়া আইস থাকি কাছাকাছি ॥
বেগম মেরী বিশ্বাসের অমৃত কথন।
ভক্ত হরিদাস ভনে, শোনে সর্বজন ॥
২.০১ আখ্যান-পর্ব
সর্বজনের শোনবার মতোই কাহিনী বটে। উদ্ধব দাস যেকাহিনী তার পুঁথিতে লিখে গেছেন তার। সত্যি-মিথ্যে ঈশ্বর জানেন। এই কাহিনীর দায়-দায়িত্ব সবই তার। আমি শুধু কথক। তাঁর পুঁথি পাঠ করব আর আপনাদের শোনাব। ওই হাতিয়াগড়ের নামও আমি জানতাম না। হাতিয়াগড় কোথায় তাও আমার জানবার কথা নয়। আমি কলকাতার মানুষ, ককাতার কথাই এতদিন লিখে এসেছি, এবার হাতিয়াগড়। হাতিয়াগড় থেকে মুর্শিদাবাদ, মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকা সুতানুটি দিল্লি সব জায়গাতেই যেতে হবে। উদ্ধব। দাস সব জায়গাতেই নিজে গিয়েছেন। ওই যে হাতিয়াগড়ের বড় রাজবাড়ি, ওর ভেতরে যে অতিথিশালা, ওখানেও উদ্ধব দাস কত দিন রাত কাটিয়েছেন। ওই যে গড়ের দিঘি, ওই গড়ের দিঘির ওপারে শোভারামের ঘর, ওখানেও গিয়েছিলেন। ওই যে গড়ের দিঘির পাশেই উঁচু ঢিবিটা ওর নাম ছাতিমতলার ঢিবি। ছাতিম গাছটা এখন আর নেই, কিন্তু ঢিবিটা আছে। শোভারাম গাই-গোরুটাকে ওখানে গিয়ে বেঁধে দিয়ে আসত। আদর করে আবার তার নাম দিয়েছিল–আদুরি। লোকে বলত আদুরি গোরু নয় গো, শোভারামের মেয়ে। তা আদুরি শোভারামের মেয়েও বটে আবার গোরুও বটে। আদুরিকে শোভারাম মেয়ের আদরে মানুষ করেছিল।
