কাজিসাহেব নিজামতি মহকুমে কাজার সদরস সুদুর। নামাজ পড়া তার শুরু হয় ভোরবেলা, শেষ হয় ঘণ্টা দু-এক পরে। মেহেদি নেসার সাহেবকে দেখে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে সেলাম আলেকুম করলেন।
সব শুনে বললেন–দিনকাল বড় খারাপ পড়েছে নেসারসাহেব, সব চিজ মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে, নিজামতি নোকরিতে আর মজা নেই তেমন–
নেসার সাহেব বললে–কিন্তু এ তকলিফ আপনাকে করতেই হবে কাজিসাহেব–
ওই তো বললুম জনাব, সব চিজ মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে, দুনিয়ার জিন্দগি ভি মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে ঔর মুর্দা ভি মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে
আপনি কত নেবেন বলুন কাজিসাহেব, অত বাহানা করবেন না।
কাজিসাহেব আবার দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন। বললেন–মরিয়ম বেগমসাহেবা এখন কোথায় আছে?
মতিঝিলে!
কাজিসাহেব বললেন–সে-চিঠি যদি দুসরা কারও হাতে চলে গিয়ে থাকে?
ইবলিশ বললে–না হুজুর, আমি নেয়ামতকে বলে রেখেছি কাউকে যেন মুলাকাত করতে না দেয় মরিয়ম বিবির সঙ্গে
কাজিসাহেব বললেন–তা হলে তাড়াতাড়ি কোতোয়ালিতে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখতে হবে, নইলে মরিয়ম বিবি সব ফাঁস করে দেবে। আর নবাব কোথায়?
পূর্ণিয়ায়। শওকত জঙের সঙ্গে জোর লড়াই চলছে দেখে এসেছি।
নবাব কবে নাগাদ লেটবে?
মেহেদি নেসার সাহেব বললে–সে কাজিসাহেব এখন দেরি হবে অনেক, শওকত জঙের তাগদ কম নয়, তার মিরবকশি কারগুজার খাঁ জঁদরেল লড়নেওয়ালা–আপনি বে-ফিকির থাকুন! ওই মরিয়ম বিবির হাতে যদি চিঠি পড়ে থাকে তো আমাদের সব মতলব বরবাদ হয়ে যাবে। তখন জান নিয়ে টানাটানি হবে আমাদের।
সফিউল্লা সাহেবের কাছে সে-চিঠি নেই ঠিক জানেন জনাব?
ইবলিশ বললে–সফিউল্লা খাঁর কাছে কোনও চিঠি নেই জনাব, কোতোয়াল সাহেব মুর্দা ঘেঁটে পায়নি!
আর করিম খাঁ? চিঠি ঠিক দিয়েছিল তো করিম খাঁ?
ইবলিশ বললে–করিম খাঁ’র সঙ্গে আগেই তো মোলাকাত করেছি কাজিসাহেব, সে বলছে। সফিউল্লা সাহেবের হাতে চিঠি দিয়ে দিয়েছে নেসার সাহেবের জন্যে! সে-চিঠি যখন সফিউল্লা সাহেবের বরাবর পাওয়া গেল না, তখন কে নেবে আর? হরগিজ মরিয়ম বিবি নিয়েছে
কাজিসাহেব আবার দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন। বললেন–সব চিজ মাঙ্গা হচ্ছে জনাব, এটা তো আপনাদের খেয়াল রাথতে হয়!
মেহেদি নেসার সাহেব রেগে গেল। বললে–তাই তো বলছি, কত নেবেন তাই বলুন, বেশি বাহানা করবেন না–পাঁচশো আসরফি?
কী যে বলেন, পাঁচশো আসরফি তো আমার মুফতি খুদ নেবে, তারপর আছে আমার কাজি-উল-দোজাত–তারপর আছে দারোগা-ই-আদালত–সব চিজ যে মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে আজকাল জনাব
আচ্ছা, তা হলে এক হাজার আসরফি!
কাজিসাহেব দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে হো হো করে হেসে উঠলেন। যেন ছেলেখেলা করছে এরা তার সঙ্গে।
শেষপর্যন্ত রফা হল দশ হাজারে। দশ হাজার আসরফিতে সফিউল্লা খাঁ সাহেবের খুনের প্রতিশোধ কেনা হয়ে গেল। মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, করিম খাঁ সকলের জিন্দগি কিনে ফেলাও হল, এ তো খুব সস্তা দরই পড়ল বলতে গেলে।
কিন্তু কাজিসাহেব ধারে বিশ্বাস করেন না, নগদ চাই!
মেহেদি নেসার বললে–আমিও ধারে বিশ্বাস করি না কাজিসাহেব, নগদই দেব–কিন্তু মরিয়ম বেগমকে ফাঁসিতে লটকাতেই হবে ।
নগদই দেওয়া হল আসরফি। মোহরগুলো যে কোথা থেকে মেহেদি নেসার বার করল রাতারাতি কে জানে! অনেক ডিহিদার, অনেক ফৌজদার, অনেক তালুকদার জমিদারের পরমায়ু নিংড়ে উপায় করা মোহর আবার সদর সুদুরের হাতে উপুড় করে দিতে হল।
কাজিসাহেব বললেন–যদি ভাল চান জনাব তো মরিয়ম বিবিকে কোতোয়ালিতে এনে রাখুন, নইলে আমার হাতের বাইরে চলে যাবে। তখন আপনাদের মোহর ভি চলে যাবে, আপনাদের জান ভি চলে যাবে–
আলেকুম সেলাম জনাব!
মেহেদি নেসার চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ইয়ারজান, ইবলিশ তারাও সেলাম করে চলে গেল। কাজিসাহেব মোহরগুলো নিয়ে ঘরের ভেতরে লোহার সিন্দুকে রাখতে গেলেন। কিন্তু বাইরে তখনই আবার যেন কে ডাকলে সদর-সুদুরকে।
কৌন?
মোহরগুলো রেখেই কাজিসাহেব ফিরে এসে দেখেন নজর মহম্মদ দাঁড়িয়ে আছে।
কী রে, তুই? তবিয়ত আচ্ছা তো?
তবিয়ত তো আচ্ছা, লে কাম পেস গিয়া সাহাব। একজন গরিব আদমিকে আপনার পাশ নিয়ে এসেছি দোয়ার জন্যে!
গরিব আদমি, দোয়া, এইসব কথা শুনেই কাজিসাহেবের খুশ মেজাজটা বিগড়ে গেল আবার। গরিব আদমিরা আবার তার কাছে কী করতে আসে!
আমার কি সময় আছে রে এখন! কাছারিতে যেতে হবে। আর দিনকাল যা পড়েছে, সব চিজ মাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে, দেখছিস তো
নজর মহম্মদ বললে–তা তো হাড়ে হাড়ে বুঝছি হুজুর, লে এ বড়া গরিব আদমি!
কোথায় সে?
হুজুর, বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি, ভরসা দেন তো ভেতরে ডেকে নিয়ে আসি।
কী কাম আমার কাছে?
হুজুর, সে খুদ নিজেই হুজুরের বরাবর তার আর্জি পেশ করবে।
ভরসা পেয়েই নজর মহম্মদ বাইরে গেল। আর সঙ্গে করে নিয়ে এল একজন লোককে। সদর সুদুর সাহেব গোঁফ-দাড়ির ফাঁক দিয়ে ভাল করে লোকটার দিকে চেয়ে দেখলেন। জওয়ানি ছোকরা, কিন্তু গরিব আদমিদের দেখতে পারেন না সদরস্ সুদুর সাহেব। গরিব আদমিরা সদর সুদুর সাহেবের চক্ষুশূল। তাদের না আছে রেস্ত না আছে দিল-দিমাগ!
নজর মহম্মদ বললে–হুজুর, এর নাম কান্ত সরকার, সারাফত আলির খুশবু তেলের দুকানের পেছনে থাকে, বড় গরিব।
কী চায় এ? কাজিসাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
