নানিবেগম ঝাঁঝিয়ে উঠল–আবার এখানে সরে এসেছিস, বেল্লিক কহিকা, বাহার নিকল–
মেহেদি নেসার সাহেব এসেছেন বেগমসাহেবা, মেহেদি নেসার সাহেব, ইয়ারজান সাহেব মরিয়ম বেগমসাহেবার সঙ্গে মুলাকাত করতে এসেছে–
ঠিক এই সময়েই এল! আর আসবার সময় পেলে না। নামগুলো শুনে নানিবেগম প্রথমে ভেবেছিল চলে যেতে বলবে তাদের, কিন্তু কী ভেবে আবার বললে–আচ্ছা নিয়ে আয় তাদের–
২.০৭ মেহেদি নেসার সাহেব
মেহেদি নেসার সাহেব প্রথম দিকে জানতে পারেনি। নবাব মির্জা মহম্মদ পূর্ণিয়ায় যাবে লড়াই করতে শওকত জঙের সঙ্গে। খবরটা ইয়ারবকশিদের কাছে সুখবর। সেপাইরা যখন লড়াই করবে তখন নবাবের সঙ্গে থাকবে কে? নবাবের সঙ্গে খোঁজা যায়, বাঁদি যায়, বেগম যায়। বাইজি, তয়ফাওয়ালি, বাজনদার, কেউই বাদ পড়ে না। নবাবের বেগমদের জন্যে খানা যায়, খানা পাকাবার বাবুর্চি যায়। লোক-লশকর-পাইকবরকন্দাজ সবাই যায়। আর যায় ইয়ারবকশিরা। যখন শিবিরের ভেতরে নবাবের জন্যে নাচ হয় তখন ইয়াররা শাবাশ’ দেয়। গানের সময় যখন সম পড়ে তখন সোহান আল্লা’ চেঁচায়। অর্থাৎ যেন যুদ্ধের ভাবনা ভুলে থাকতে পারে নবাব, যেন নাচ দেখে গান শুনে চাঙ্গা হয়ে ওঠে নবাব।
ওদিকে মোহনলাল তখন কামান ছুড়ছে নবাবগঞ্জ লক্ষ্য করে। নবাবগঞ্জ আর মনিহারির মধ্যে শওকত জঙ শিবির বসিয়েছে। আর এদিকে নবাবের শিবিরের মধ্যে তখন নতুন তয়ফাওয়ালি গান গাইছে–ইয়ে দিল দিওয়ানা হো চুকা…
বোধহয় রাতটা নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে কাটত। কিন্তু তা হল না। মেহেদি নেসার সাহেবের অত শখের তয়ফাওয়ালির গান শোনা হল না। অনেক দাম দিয়ে ফয়জাবাদ থেকে আনা বাইজি একেবারে বরবাদ হয়ে গেল হঠাৎ।
ওমরাহসাহেব!
মেহেদি নেসার সাহেব মুখ ঘুরিয়ে লোকটাকে দেখেই বললে–কী রে ইবলিশ!
সফিউল্লাসাহাব খুন হো গয়া সাহাব!
তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছে মেহেদি নেসার সাহেব। অত দামি নাচ-গান-তয়ফাওয়ালি, সবকিছু ছেড়ে উঠে পড়েছে এক নিমেষে। ইয়ারজান সাহেবও একমনে দিল খুশ করে গান শুনছিল। তাকেও ডেকে বাইরে নিয়ে এল মেহেদি নেসার, বাইরে তখন অন্ধকার। এক-একটা কামান ছুড়ছে আর আগুনের পিণ্ডটা গিয়ে পড়ছে নবাবগঞ্জের বিলের দিকে।
কে খুন করলে?
মরিয়ম বেগমসাহেবা।
মেহেদি নেসার সাহেবের মুখ দিয়ে একটা অশ্রাব্য গালাগালি বেরিয়ে এল।
ইবলিশ বললে–কোতোয়াল সাহাবকে খবর ভেজিয়ে দিয়েছি, এখন মতিঝিলের ফাটকে আটকা আছে।
ফাটক কে পাহারা দিচ্ছে?
কোতোয়ালের লোক আর নেয়ামত খাঁ খিদমদগার!
ঘোড়া তৈয়ার?
ইয়ারজান সাহেব কী করবে বুঝতে পারছিল না। মেহেদি নেসার সাহেবের তখন যেন ভূত দেখার মতো অবস্থা। বললে–জলদি করে ইয়ার, সফিউল্লা খা’র কাছে করিম খাঁ’র খত্ আছে, সে খত্ বেহাত হয়ে যেতে পারে–জলদি করো
ইয়ারজান সাহেবেরও যেন নেশা ছুটে গেল করিম খাঁ’র নামটা শুনে। এখন যদি সব ফাঁস হয়ে যায় তো মুশকিল। সে-চিঠি যদি মরিয়ম বেগমের হাতে পড়ে গিয়ে থাকে! কিংবা নানিবেগমের হাতে। তা হলে যে সবাই ধরা পড়বে, সবাই গর্দান হারাবে।
নবাবের তখন বোধহয় তার মতো এসেছে। নিঃশব্দে দু’জনে বেরিয়ে এল রাস্তায়। রাস্তার ওপর সেপাইরা তখন মোহনলালের হুকুম তামিল করবার জন্যে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ওদিক থেকে শওকত জঙের মিরবকশি কারুগুজার খাঁ’র সেপাইরা বিলের ওপর দিয়ে যাতে এদিকে ঝাঁপিয়ে না পড়ে তারই বন্দোবস্ত করে রেখেছে মিরজাফর সাহেব।
কৌন?
লম্বা-চওড়া হাঁক দিলে সিপাহি-সর্দার।
মেহেদি নেসার আর ইয়ারজান আর ইবলিশ তিনজনেই তিনটে ঘোড়ায় করে পাঞ্জা দেখিয়ে সেপাইদের বেড়া পেরিয়ে এল। মুর্শিদাবাদ থেকে সোজা ঘোড়া নিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে এসেছিল। ইবলিশ। অনেক পথ পেরিয়ে জান দিয়ে সে ছুটে এসেছে শুধু মেহেদি নেসার সাহেবের নিমকের মর্যাদা রাখতে। মাঝে মাঝে ইবলিশ যে মেহেদি নেসার সাহেবের কাছে মাসোহারা পায় সে তো এইসব কাজের জন্যেই। কে কোথায় যাচ্ছে, কে কাকে কী বললে, কোথায় কী কানাঘুষো হচ্ছে, তা ইবলিশকেই মেহেদি নেসার সাহেবের কানে তুলে দিতে হয়। তারপর যা কিছু করবার তা মেহেদি নেসার সাহেব। নিজেই করে। তখন ইবলিশের ছুটি। চেহেল্-সুতুনের ভেতরে যা-কিছু হয়, জগৎশেঠ-মিরজাফর-মনসুর আলি মেহের সাহেবের দফতরেও যে-ঘটনা ঘটে, তার খবর মেহেদি নেসারের কানে তুলে দেওয়া তার কাজ।
কিন্তু সফিউল্লা খাঁ যে এমন কঁচা কাম করবে তা মেহেদি নেসার সাহেব ভাবতে পারেনি। কথা ছিল করিম খাঁ কী কী বন্দোবস্ত করেছে তা লিখে সফিউল্লা সাহেবের হাতে দেবে। নবাব যখন পূর্ণিয়াতে থাকবে তখনই সব বন্দোবস্ত করতে হবে। বেল্লিক, বেত্তমিজ, বেওকুফ, হারামজাদা! যখন সঙ্গে অত জরুরি খত্ রয়েছে তখন কি কেউ মেয়েমানুষের দিকে নজর দেয়? মেয়েমানুষের দিকে নজর দেওয়ার। সময় তো অটেল রয়েছে হাতে; চিঠিটা আর কারও হাতে পড়ে গেলে সব মতলব যে খোলসা হয়ে যাবে।
ভোর হয়ে এসেছিল রাজমহলের পথেই। তার পরেই তির বেগে তিনটে ঘোড়া ছুটে চলল দক্ষিণের রাস্তাটা ধরে।
যখন মুর্শিদাবাদ পৌঁছল তখন আর একটা দিন, আর একটা রাতও কাবার হয়ে গেছে। পরের দিনের ভোরবেলা যখন কাজিসাহেবের হাবেলিতে পৌঁছুল তখন বেশ সকাল।
