তারপর মরালীকে জিজ্ঞেস করলে–হাতিয়াগড়ে তোর সোয়ামিকে খবর দেব? তোর সতিনকে চিঠি লিখব?
মরালীর এতক্ষণে কথা বেরোল। বললে–না
নানিবেগম বললে–তবু খবর পেলে তারা এখানে মহকুমে কাজায় এসে উকিল দিতে পারত।
মরালী বললে–না নানিজি, কাউকে খবর দিতে হবে না, আমার কেউ নেই
কেউ নেই তোর? বলছিস কী তুই?
না নানিজি, আমার কেউ নেই! কেউ থাকলে কি তোমরা আমাকে এখানে এমন করে আনতে পারতে? কেউ থাকলে কি আর আজ আমাকে এমন করে জানোয়ারটার বুকে ছুরি বসাতে হত?
ছুরি কোথায় পেলি তুই মা? কে ছুরি দিলে তোকে?
ভগবান জুগিয়ে দিয়েছে নানিজি, লজ্জানিবারণ ভগবান আমাদের।
তা খুন করতে তোর হাতে বাধল না? জলজ্যান্ত পুরুষমানুষটাকে খুন করে ফেললি তুই?
নানিজি, তুমি আমাকে ভালবাসো তাই তোমার এত কথার জবাব দিচ্ছি, নইলে দেখতে এতদিন আরও কটাকে খুন করে ফেলতাম! খুন করলে তোমারও ভাল হত, তোমার নাতিরও ভাল হত! এত লোককে তোমার নাতি খুন করেছে আর এগুলোকে খুন করতে পারেনি?
কে? কাদের কথা বলছিস তুই মা?
তুমি সব জানো নানিজি, সব জেনেশুনেও তুমি আমাকে এত কথা জিজ্ঞেস করছ? তুমি কি মনে করছ তোমার চেহেল্-সুতুন থাকবে? তুমি কি মনে করেছ তুমি তোমাকে নাতিকে টিকিয়ে রাখতে পারবে?
নানিবেগম তাড়াতাড়ি মরালীর মুখে হাত চাপা দিয়ে দিলে। যদি কেউ শুনতে পায় তো তাদের দু’জনেরই গর্দান যাবে।
এ ক’দিনে আমি সব দেখে নিয়েছি নানিজি! আমার আর দেখতে কিছু বাকি নেই। আমি তো একটাকে খুন করলুম, যদি পারো তো তুমি বাকিগুলোকেও খুন করে ফেলো, নইলে
কার কথা বলছিস তুই?
কেন, মেহেদি নেসার, ইয়ারজান
নানিবেগম আর সহ্য করতে পারলে না। নানিবেগমেরও ভয় হল। এ-মেয়ের কি এতটুকু ভয়-ডর নেই গা!
মরালী বলে চলল–তোমার ভালর জন্যেই বলছি আমি নানিজি, তোমার নাতিরও ভালর জন্যে বলছি, আমি তো এখন চলেই যাচ্ছি, কিন্তু একদিন তোমাদেরও আমার মতন চলে যেতে হবে নানিজি!
তোমার কোরান তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। যেমন আমার মাথার সিঁদুর আমাকে বাঁচাতে পারেনি, তেমনি কেউ কাউকেই বাঁচাতে পারবে না–
নানিবেগম কিছুই বুঝতে পারল না। এ-মেয়েটা এসব কী কথা বলছে।
তোমাকে আমি চুপি চুপি বলে যাই নানিজি, আমি যদি ওই পাষণ্ডটাকে খুন না করতাম তো ওই তোমাদের সকলকে খুন করত!
কে বললে–রে এ কথা তোকে?
নানিবেগম মরালীকে ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল।
বল, কে বললে–তোকে ওকথা?
মরালী বললে–আমি বললে–তো তুমি বিশ্বাস করবে না নানিজি! কিন্তু আমি বলছি একদিন ওই পাষণ্ডই তোমার নাতিকে খুন করত! শুধু ও একলা নয়, ওর সঙ্গে আরও অনেক পাষণ্ড আছে। পারলে তাদেরও আমি খুন করতাম, কিন্তু আর যে উপায় নেই, ওরা যে আমায় ধরে ফেললে রাত্রে-নইলে
নানিবেগম বললে–তুই সত্যি বলছিস মা?
মরতে চলেছি আমি, এখন কেন মিছে কথা বলতে যাব নানিজি? মিছে কথা বলে কি পাতকি হব ভগবানের কাছে?
নানিবেগম ফাটকের বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে নেয়ামত খাঁ দূরে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে কোতোয়ালের পাহারাদারও দাঁড়িয়ে আছে।
নানিবেগম তাদের দিকে চেঁচিয়ে বললে–এই, তোরা দূরে সরে যা, যা
যেন অনিচ্ছার সঙ্গেই তারা আরও দূরে সরে গেল। নানিবেগমকে কোনও কিছু কথা বলা তাদের এক্তিয়ারে নেই।
বল মা, এবার বল, বলে মরালীর কানের কাছে মুখ সরিয়ে আনলে নানিবেগম।
মরালী বললে–ওই পাষণ্ডটার কুর্তার ভেতরে একটা চিঠি পেয়েছি আমি! ওই ছোরাটা টেনে নিতে গিয়ে চিঠিটাও বেরিয়ে এসেছিল–
কীসের চিঠি? কার চিঠি? কে কাকে লিখেছে?
মরালী বললে–সে তুমি জানতে চেয়ো না নানিজি, জানলে তোমাদের অনেক আমির-ওমরাও জড়িয়ে পড়বে–আমি তো সকলের নাম জানি না, মনে হল নবাব তাদের বিশ্বাস করেন
সে চিঠি কই, দেখি? দেখা আমাকে। আমি কাউকে বলব না, দেখা–
মরালী বললে–সে আমি তোমাকে দেখাব না নানিজি, আমি মহকুমে কাজার সদরস সুদুর সাহেবকে দেখাব
তা আমাকে দেখালে দোষ কী? আমি তো বলছি কাউকে বলে দেব না।
না নানিজি, তুমি জানো না, যখন পাষণ্ডটা মরছে, ঝরঝর করে রক্ত বেরোচ্ছে বুক দিয়ে, তখনও আমার হাত থেকে চিঠিটা কেড়ে নেবার জন্যে হাত-পা ছুঁড়তে চেষ্টা করেছে, আমি তখন তার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে ক্যাত কাঁত করে লাথি মেরেছি, তবে হারামজাদা মরেছে–
নানিবেগমসাহেবা তখন মরালীর চিবুকটা ধরে আদর করতে লাগল–তা বেশ করেছিস মা, তুই লাথি মেরেছিস, কিন্তু আমাকে সেটা দেখাতে দোষ কী! তাতে তো তোরই ভাল হবে–
না নানিজি, তাতে আমারও ভাল হবে না তোমারও ভাল হবে না। যারা জানে আমার কাছে চিঠিটা। আছে তারা সকাল থেকে কেবল আমার কাছে এসেছে, আমাকে কেবল জিজ্ঞেস করেছে, আমি ওমরাহসাহেবকে কেন খুন করেছি তাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছে–
নানিবেগম বললে–তা হলে তুই চিঠিটা দেখা মা আমাকে, আমি একবার দেখে আবার তোকে ফিরিয়ে দেব–আমি শুধু মির্জাকে বলব কোন কোন লোক তার শত্ৰু, কোন কোন লোক তাকে মসনদ থেকে সরাতে চাইছে–
মরালী বলে–শুধু মসনদ থেকে নয় নানিজি, এই পৃথিবী থেকেই নবাবকে সরাতে চাইছে–নবাবকে একেবারে খুন করবার ষড়যন্ত্র করেছে।
ওমা, কী সব্বনাশ? দেখি মা, কার কার নাম আছে ওতে–
হঠাৎ নেয়ামত কাছে এসে ডাকলে-নানিবেগমসাহেবা–
নানিবেগম পেছন ফিরে দেখলে নেয়ামত আর কোতোয়ালের লোক আবার ফাটকের কাছে সরে এসেছে।
