*
নানিবেগম আসতেই নেয়ামত ফাটকের দরজা খুলে দিয়েছে। কোতোয়ালের লোক মোহরের ভাগ পেয়েছিল, তাই কান্তকে কিছু বলেনি। কান্ত কথা বলবার সময় আড়ালে চলে গিয়েছিল। এবার নানিবেগম আসতেই লম্বা সেলাম আলেকুম করলে।
একদিন এই ফাটকের ভেতরেই জগৎশেঠজি বন্দি হয়ে ছিল। কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস্ সাহেবের বিবিকেও এখানে আটকে থাকতে হয়েছে একদিন। হলওয়েল, কলেট সবাইকে এমনি করে পাহারা দিয়েছে কোতোয়ালের এই পাহারাদার। শুধু তাই নয়। ঘসেটি বেগমসাহেবাকেও একদিন এখানে নজরবন্দি হয়ে থাকতে হয়েছে এই পাহারাদারের ভাবে। আজ মরিয়ম বেগমকেও সেই তাদের সঙ্গে একই ফাটকের অন্দরে আটকে থাকতে হচ্ছে।
তবু মরালী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
সফিউল্লা খাঁ’র দেহটা সকালবেলাই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। রক্তের দাগও ধুয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। যাদের আসবার, যাদের দেখা করবার আর তদন্ত করবার কথা তারা তা করে গেছে।
কোতোয়াল জিজ্ঞেস করেছিল–আপনি সফিউল্লা খাঁ সাহেবকে খুন করেছেন?
মরালী বলেছিল –হ্যাঁ
কেন?
আমার ওপর অত্যাচার করতে এসেছিল।
আপনি হারেমের বেগম, আপনি চকবাজারে মর্দানা সেজে কেন গিয়েছিলেন? সেখানে কী কাম ছিল আপনার?
কী কাজ?
সব কথা আমি বলব না।
সব কথা খুলে না বললে–কিন্তু আপনারই লোকসান হবে, তা জানেন তো? মহকুমে কাজার সদরস। সুদুরের কাছারিতে আপনার বিচার হবে। খুন করলে দণ্ড হয় তা জানেন তো?
মরালীর চোখে জল পর্যন্ত নেই, গলা একটুকু কঁপা পর্যন্ত নেই, একেবারে কাটাকাটা উত্তর দিয়েছিল সেদিন। আর শুধু একবার নয়। নিজামতি কাছারির এক-একজন আমির-ওমরাহ বারবার করে তদন্ত করে গেল। প্রত্যেকবারই একই উত্তর দিয়েছে সে। প্রত্যেকবারই একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছে। শেষকালে যখন আর পারেনি তখন বলেছে আমাকে আর বারবার বিরক্ত করবেন না আপনারা, আমাকে ফাঁসি দিন, ডালকুত্তা দিয়ে খাইয়ে দিন, আমাকে মেরে ফেলে আপনাদের হাতির পিঠের ওপরে শুইয়ে সকলকে দেখান না–আমি তো আমাকে ছেড়ে দেবার জন্যে আপনাদের পায়ে ধরে সাধতে যাচ্ছিনে
মরিয়ম বেগমের তেজ দেখে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। এমন তেজি বেগম তো আগে দেখা যায়নি। আর তারপরই এসেছিল কান্ত! তুমি কেন এলে? তোমাকে দেখে যদি আমি শক্ত থাকতে না পারি! যদি ভেঙে পড়ি। যদি আমি ওদের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে ফেলি! তুমি যাও, তুমি সামনে থাকলে আমি ভেঙে পড়ব, আমি হাত-জোড় করে ক্ষমা চাইব। তুমি কেন এলে! তোমাকে এখানে দেখলে। সবাই যে তোমাকেও সন্দেহ করবে। তোমাকেও ফাটকে পুরে রাখবে। আমার সঙ্গে তোমাকেও ওদের। কুকুর দিয়ে কামড়িয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে খাওয়াবে।
কান্ত তবু যেতে চায়নি।
বলেছিল–তোমাকে এ-অবস্থায় ফেলে আমি যাই কী করে?
মরালী বলেছিল আমার জন্যে তোমার কেন ক্ষতি হবে বলো তো? আমি তোমার কে? আমার সঙ্গে তোমার কীসের সম্পর্ক?
আমি যে তোমাকে সঙ্গে করে এখানে এনেছি মরালী! সম্পর্ক না থাকলে কি এমন করে আসি এখানে? কেন তুমি গিয়েছিলে বলো তো আমার কাছে? আমি তো তোমার কাছে যাই-ই, তবু কেন তুমি এ ঝুঁকি নিলে? আমাকে একবার নজর মহম্মদকে দিয়ে খবর দিলেই তো তোমার কাছে। যেতাম!
মরালী বলেছিল–কিন্তু বাবাকে যে অনেক দিন দেখিনি, বাবার খবর জানতেই তো গিয়েছিলাম
তা আমাকে ডাকতে পারলে না তুমি?
মরালী যেন একটুখানি করুণ হয়ে এসেছিল খানিকক্ষণের জন্যে। কেন এ তার জন্যে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে এখানে এসেছে। এর সঙ্গে তো কোনও সম্পর্কই নেই তার। সম্পর্ক হতে গিয়েও তো শেষপর্যন্ত সম্পর্ক হয়নি তার সঙ্গে। অথচ যার সঙ্গে তার সত্যিকারের সম্পর্ক হল সে এল না। সে তো তাকে খোঁজবার চেষ্টাও করলে না একবার।
তুমি আর এসো না এখানে, জানো? এখানকার সবাই আজ আমার কাছে এসে বারবার অনেক কথা জিজ্ঞেস করে গেছে। আমি কেন মেরেছি সফিউল্লা খাঁ সাহেবকে, কেন আমি চকবাজারে গিয়েছিলুম, কার সঙ্গে দেখা করতে। সব কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে গেছে, তোমার কাছে গিয়েও তারা হয়তো জিজ্ঞেস করবে, তোমাকেও হয়তো জিজ্ঞেস করবে তোমার সঙ্গে আমার কীসের সম্বন্ধ, কেন তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে যাও চেহেল্-সুতুনে–একবার সন্দেহ করলেই তোমার কাছে যাবে ওরা, তখন তোমাকেও ফাটকে পুরবে
আর ঠিক এই সময়েই এসেছিল নানিবেগম।
কান্ত ঠিক সময়েই লুকিয়ে পড়েছিল, নইলে নানিবেগম দেখতে পেত। নানিবেগমের ওপরে রাগ হয়ে গিয়েছিল মরালীর। ঠিক সেই সময়েই কি নানিবেগমের আসতে হয়।
এ কী করলি মা, কী সর্বনাশ করলি তুই? কেন ওকে খুন করতে গেলি? তুইও কি আমাকে পাগল করে ছাড়বি না?
ফাটকের ভেতরে ঢুকে নানিবেগম একেবারে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছে মরালীকে। দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে তার।
আর দুটো দিন সবুর কর মা, মির্জা আসুক পূর্ণিয়া থেকে, আমি তাকে বলে তোকে ছাড়িয়ে নেব, হুট করে যেন তুই কিছু বলে বসিসনি কোতোয়ালকে।
পেছন থেকে নেয়ামত খা ডাকলে–বেগমসাহেবা
নেয়ামত বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। তারও দায়িত্ব আছে কিছু। মোহর নিয়ে একটু আগেই কান্তকে এখানে আসতে দিয়েছিল, কিন্তু নানিবেগমসাহেবাকে যেতেও বলতে পারলে না।
তুই থাম এখন। তুই যা আমার সামনে থেকে, ভাগ ইহাসে
