ইনসাফ মিঞার নহবতের টোড়ি রাগ তার সর্গমের কড়ি-কোমল পরদায় বলতে লাগল–তুমি নাদির শাহ একদিন এসেছিলে হিন্দুস্থান লুঠ করতে, আর এসেছিলে সুন্দরী মেয়েমানুষ ভোগ করতে। মার্কোপোলোর সময় থেকেই তাই তোমরা এখানে এসেছ আর লুঠ করে সর্বস্ব নিয়ে চলে গেছ। এরা কিছু বলেনি, এই হিন্দুরা। তোমাদের সময় থেকে আমরা জেনে এসেছি মোগল দরবারে বিদ্যে বুদ্ধির চেয়ে সুন্দরী মেয়েমানুষেরই খাতির বেশি, ঘুষের প্রতিপত্তি সর্বাধিক। তোমাকে ঘুষ দিয়ে তাই আবার আর-এক নাদির শাহের দল এখন এসেছে। এরা আরও চতুর, আরও শঠ। এদের হাতে কিন্তু এবার নাদির শাহের মতো তরোয়াল নেই, এবার আছে দাড়িপাল্লা। সেই দাঁড়িপাল্লা দিয়েই এরা আবার ওজন করে নেবে তোমার পাপ আর তোমার পুণ্য, যাচাই করে নেবে তোমার বিদ্যে আর তোমার বুদ্ধি, পরখ করে নেবে তোমার শক্তি আর তোমার বিত্ত। তুমি এদের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষার চেষ্টা কোরো না নবাবজাদা। করলে তুমি হারবে। কারণ তোমার চেহেল্-সুতুনের মধ্যেই তোমার পরাজয়ের বীজ লুকিয়ে আছে। কারণ তুমি নিজেই তোমার নিজের শত্ৰু, তোমার নিজের আত্মীয়স্বজনই তোমার বৈরী। তুমি যে শত্রু নিয়েই জন্মেছ, আবার শত্রু সৃষ্টি করতেও তুমি যে অদ্বিতীয়। তোমারই দীর্ঘশ্বাস চেহেল্-সুতুনের ভেতর পুঞ্জীভূত হয়ে দিনের পর দিন পাথরের দেয়ালে যে মাথা কুটে মরছে আর তুমি মতিঝিলের দরবারে বসে সব দেখেও চোখ বুজে রয়েছ আর আমির-ওমরাওরা যা বলছে তাই বিশ্বাস করছ।
নহবত আরও বলছে–মনে রেখো, বাইরের জগতে যখন মানুষের আকাশে নতুন গ্রহ-উপগ্রহের উদয় হয়েছে, তুমি তখনও রয়ে গেছ সেই চেহেল্-সুতুনের আদিম খোসবাগে। তুমি তখনও গুলসন বেগমের ঠুংরির লয়ে লয়ে মাথা দোলাচ্ছ, মরিয়ম বেগমের আত্মবঞ্চনার সুযোগ নিচ্ছ। তোমার দুঃখ নিয়ে তো তোমার বিচার করবনা নবাব! তোমার কাজই যে তোমার বিচারকর্তা। তুমি হা-হুঁতাশ করো, তুমি অনুতাপ করো, তুমি ক্ষমা চাও, তবু তোমাকে আমরা অব্যাহতি দেব না। ইতিহাসের নিষ্ঠুর দাঁড়িপাল্লা দিয়ে তোমার তুল্যমূল্য বিচার করে তোমাকে মাথায় তুলে নেব কিংবা ছুঁড়ে ফেলে দেব পায়ের তলার মাটিতে।
ইনসাফ মিঞার টোড়ির সুরে লয়ে কান্তর যেন নেশা লেগেছিল। মতিঝিলের সেই শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে কান্ত ওপরে উঠতে লাগল। সামনে নেয়ামত, পেছনে নজর মহম্মদ, দু’জনে দুটো মোহর নিয়েছে। ফাটকের ভেতর মরালীর সঙ্গে শুধু একবার দেখা করিয়ে দেবে। আর কিছুই নয়। তারপর যা হবার হবে। এই কড়ার।
কান্তও ঘুমোয়নি সারারাত, মরালীও ঘুমোয়নি।
একী, তুমি?
ফাটকের লোহার শেকলটা যেন হঠাৎ বাঙ্ময় হয়ে উঠল।
কান্ত বললে–এ কী করলে তুমি মরালী? এমন করে নিজের সর্বনাশ কেন করতে গেলে?
মরালী বললে, তুমি এখানে কী করে এলে?
আমার কথা ছেড়ে দাও, আমার যা-হয় হোক, কিন্তু তোমার কথা ভেবে ভেবে যে আমি পাগল হয়ে গেছি, আমি যে দিন-রাত ছটফট করে মরছি
মরালী বললে–তুমি পালিয়ে যাও গো, তুমি এখানে আর এসো না, নইলে তোমাকেও এরা
আমার মতো ধরে রাখবে–তোমাকেও এই ফাটকের মধ্যে পুরে রাখবে! .
কিন্তু কেন তুমি চকবাজারে যেতে গেলে? আমি তো তোমার কাছেই গিয়েছিলুম তখন। তোমার সঙ্গে দেখা করতেই তো চেহেল-সুতুনে গিয়েছিলুম আমি!—
মরালী বললে–সে যা হবার হয়ে গেছে, তুমি চলে যাও এখান থেকে, তোমার দুটি পায়ে পড়ছি তুমি চলে যাও।
তোমাকে আমি এখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবই মরালী!
কী করে ছাড়াবে?
আমি এক হাজার আসরফি ঘুষ দেব মহকুমে কাজার সদরস সুদুরকে!
অত আসরফি কোথায় পাবে?
কেন সারাফত আলির সিন্দুক ভাঙব!
মরালী চমকে উঠল-না না, অমন সর্বনাশ কোরো না, কেন আমার জন্যে ওকাজ করতে যাবে। আমি তোমার কে যে তুমি অতখানি ঝুঁকি মাথায় তুলে নেবে? না না, খবরদার, অমন কাজটি কোরো না! আমার জীবনের কোনও দাম নেই, আমার কে আছে বলো না যে তার জন্যে ভাবব? তুমি চলে যাও এখান থেকে, আর কখনও এসো না-যাও–লক্ষ্মীটি যাও
কান্ত বললে–দেখো, এখানে এখন নবাব নেই, এই-ই সুযোগ! এমন সুযোগ আর আসবে না। তুমি কথা দাও যে এখান থেকে ছাড়িয়ে নিলে তুমি আমার সঙ্গে পালিয়ে যাবে?
পালিয়ে কোথায় যাব?
কেন, সেদিন তো পালিয়ে যেতে রাজি ছিলে তুমি, যেদিন তোমাকে নিয়ে প্রথম এখানে আসি?
কিন্তু আমি কী পরিচয় দেব আমার? লোকে যদি জিজ্ঞেস করে কী বলব তাদের?
যা সত্যি কথা তাই-ই বোলো!
কী সত্যি কথা?
হঠাৎ নেয়ামত খাঁ দৌড়ে এসেছে বাবুজি, ভাগ যাইয়ে, ভাগ যাইয়ে
নজর মহম্মদও ভয় পেয়ে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
চলুন বাবুজি, জলদি চলুন–
কান্ত বুঝতে পারলে না কিছু। মরালীকে এখানে এভাবে ছেড়ে যেতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল না। দুটো মোহর দিয়েছে সে এইটুকু কথা বলবার জন্যে?
কান্ত বললে–কেন, যেতে বলছ কেন? আমার যে আরও অনেক কথা বলবার আছে মরিয়ম বেগমের সঙ্গে
নেয়ামত খাঁ বললে–নেহি হুজুর, জলদি ভাগ যাইয়ে হাসে, নানিবেগম আতি হ্যায়
আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল যেন মতিঝিলের একতলার চবুতরে একটা তাঞ্জাম থামবার শব্দ হল। হাতির চলার শব্দও কানে এল! কী হবে তা হলে? এইটুকু কথা বলেই তাকে বিদায় নিতে হবে! এইটুকু কথার জন্যেই দুটো মোহর দিতে হল!
