পেশমন বেগম আগের দিন সারারাত বেলেল্লাগিরি করে অসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছিল।
বাঁদি আঙুরের রসের ভিতর এক পুরিয়া আফিং মিশিয়ে মুখের কাছে এনে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে মিহি গলায় ডাকলে–বেগমসাহেবা–
পেশমন বেগমের সারা মুখে-গালে-ঠোঁটে নখের আঁচড়ের দাগ লেগে ছিল। সেই ঘুম-চোখেই বললে–দে জবিন, পেয়ালা দে ।
ওটা আঙুরের রস নয়, ওটা সরাব। ওটা না খেলে বেগমদের জড়তা কাটে না সকালে।
বেগমসাহেবা, বেলা হয়ে গেছে, ধুপ উঠেছে!
সবুর কর, সবুর কর, ডাকিসনে এখন
বলে আড়মোড়া খেতে লাগল বিছানায়। মখমল-মোড়া শিমুল তুলোর পুরু গদির ওপর দু-তিনবার গড়িয়ে নিলে পেশমনের ভোরের নেশা কাটে না।
কিন্তু সেদিন নানিবেগমের ডাকাডাকিতে পেয়ালায় মুখ দেবার আগেই উঠে বসতে হল।
বেগমসাহেবা, নানিবেগম আয়ি।
কাল মরিয়ম কোথায় ছিল রে পেশমন? রাত্তিরে কোথায় ছিল? চকবাজারে কখন গেল? কে নিয়ে গেল? কী করতে গিয়েছিল সেখানে? কে আছে তার চকবাজারে?
নানিবেগম সোজা ঘরের মধ্যে ঝড়ের মতো এসেছিল। পেশমন সোজা হয়ে ওঠবার সময়টুকু পর্যন্ত পেলে না।
বললে, আমি তো জানি না বেগমসাহেবা!
তোর সঙ্গে মরিয়ম মেয়ের দেখা হয়নি কাল? তোর ঘরে আসেনি?
বেগমসাহেবা!
আমি যে দেখি তোদের দুজনের খুব ভাব। ক’দিন ধরে যে তোর ঘরে খুব আসত সে!
তা আসত, কিন্তু কাল আসেনি মরিয়মবিবি।
চকবাজারে কী করতে গিয়েছিল সে তুই জানিস? তুই কারও কাছে পাঠিয়েছিলি?
আমি কেন তাকে বাইরে পাঠাতে যাব বেগমসাহেবা? বাইরে আমার কে আছে যে তার কাছে আমি পাঠাতে যাব?
হেঁয়ালি রাখ, আমি যেন জানি না তোর মতিগতি! আমি যেন জানি না তুই কী রকম স্বভাবের মেয়ে! আমাকে তুই নতুন পেয়েছিস এখেনে? আমি এতকাল চেহেল্-সুতুন চরিয়ে এলাম, আমি চিনিনে তোদের? তা তুই না পাঠিয়ে থাকিস তো কে পাঠিয়েছে বল?
পেশমন বললে–আমি কিছুই জানি না বেগমসাহেবা!
আলবত জানিস!
পেশমন বেগম এবার কেঁদে ফেললে। বললে–আমি জানি না বেগমসাহেবা, সত্যি বলছি আমি জানি না, আমারও কপালের দোষ বেগমসাহেবা, এতদিন আছি চেহেল্-সুতুনে তবু আমার এই বদনাম দিলে তুমি বেগমসাহেবা? এখনও আমাকে কেউ বিশ্বাস করলে না?
মড়াকান্না রাখ তুই বাপু, তোর কান্না শোনবার সময় নেই এখন, আমি এখন যাই
হঠাৎ পিরালি খাঁ ঘরের সামনে কুর্নিশ করলে–বেগমসাহেবা
কী রে পিরালি?
শওকত জঙ বাহাদুর খুন হয়ে গেছে বেগমসাহেবা। পূর্ণিয়ার লড়াই ফতেহ হয়ে গেছে। পূর্ণিয়া থেকে ময়মনা বেগমসাহেবারা মুর্শিদাবাদের দিকে আসছে ।
নানিবেগমের মাথাটা হঠাৎ যেন ঘুরে উঠল। ঠিক নেশা করলে যেমন হয় তেমনি। আল্লা! অনেক দিন বেঁচে থাকলে বোধহয় এমনিই হয়। এমনি ভাবেই সব আঘাত সইতে সইতে পাথর হয়ে যেতে হয়। শওকত জঙকে মনে পড়ল নানিবেগমের। সেই মির্জার সঙ্গে একই বিছানায় একদিন শুয়ে কাটিয়েছে, কতদিন নানিবেগমের কোলে ওঠবার জন্যে দু’জনে ঝগড়া মারপিট করেছে। আজ আবার তার মৃত্যুসংবাদটাও বেঁচে থেকে সহ্য করতে হবে মুখ বুজে। এতটুকু চোখ ছলছল করলে চলবে না।
ময়মানা বেগমসাহেবা রওয়ানা দিয়েছে পূর্ণিয়া থেকে।
আর মির্জা? মির্জা আসছে না?
জাঁহাপনা ভি আসছেন বেগমসাহেবা! পূর্ণিয়া থেকে সওয়ানে-নেগার খবর নিয়ে এসেছে। নিজামতের দফতরে!
নানিবেগম বললে–ঠিক আছে পিরালি, আমার তাঞ্জাম বার করতে বল, আমি মতিঝিলে যাব মরিয়ম বেগমকে দেখতে–নেয়ামতকে বলে দিবি ফাটকের দরজা খুলে দেবে আমার জন্যে?
*
ভোরবেলা চেহেল্-সুতুনের নহবতখানায় গিয়ে উঠে বসতে গেল ইনসাফ মিঞা। এই নহবতখানায় জীবন কেটে গেল ইনসাফের। নবাব মির্জা মহম্মদের যে বছর সাদি হল তখন নতুন নোকরিতে ভরতি হল ইনসাফ মিঞা। বাপ আতাউল্লা খা এক-একটা করে নহবতের ফুটো টিপতে আর ছাড়তে শিখিয়েছিল ছেলেকে। নহবতে ফুঁ দিতে শিখিয়েছিল।
ইনসাফ মিঞা বলত-ইসমে ফোকর ছোড়না ঔর বন্ধ করুনাই আসলি কাম
ছোট সাগরেদ মমতাজ মিঞা তবলা নিয়ে চাটি দিত আর লোভর মতো একদৃষ্টে চেয়ে দেখত ওস্তাদজির ফুটো ছাড়া আর ফুটো বন্ধ করার কেরামতি! কবে ওস্তাদজির মতো বাজাতে পারবে, কবে ফুটো ছেড়ে আর বন্ধ করে সুরের দিমাগ টলিয়ে দেবে। সারা মুর্শিদাবাদ শহর দিওয়ানা করে দেবে। ইনসাফ মিঞার মত! কবে? কবে?
টোড়ি রাগটা ভারী বেয়াড়া। আগের দিন রাত্রেই ইনসাফ মিঞা ঠিক করেছিল টোড়িটা আজ দিলচস করে বাজাতে হবে! সবে এসে নহবতখানায় যন্তরটা নিয়ে বসেছে, হঠাৎ ছোট শাকরেদ এসে বললে–ইয়া বিসমিল্লা ওস্তাদজি, গজব খবর, মরিয়ম বেগমনে সফিউল্লা খাঁ সাহাবকো খুন কিয়া
ইনসাফের টোড়ির মেজাজটা বেসুরো হয়ে বিগড়ে গেল হঠাৎ।
ক্যা বেহুদা আদমি, তুমহে ইয়ে সুর কভি বাজানা নেহি আয়েগা
সত্যিই মেজাজ বিগড়ে যাবার মতো খবরই বটে। কিন্তু ইনসাফ মিঞা ওকথায় কান না দিয়ে উদারার নিখাদে ফুঁ দিলে। আর সঙ্গে সঙ্গে ছোট শাকরেদ বাহবা দিয়ে উঠল–শাবাশ উস্তাদজি–শাবাশ
তখন ফরসাও ভাল করে হয়নি। মুর্শিদাবাদ শহর ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে সুর অনেক দূর ভেসে ভেসে চলতে লাগল। সত্যিই অনেক দূর। সেই একেবারে আওরঙ্গজেবের শাকরেদ শায়েস্তা খাঁর আমলে গিয়ে যেন। আছড়ে পড়তে লাগল ইনসাফ মিঞার টোড়ি। বাদশা তখন দাক্ষিণাত্যে, আর ওদিকে মারাঠা-শক্তির কেন্দ্রমণি ছত্রপতি শিবাজি তার সাম্রাজ্যের ভেতর-বাইরে আঘাত হেনে একেবারে ফোপরা করে। তুলছে। কখনও কর্ণাটক, কখনও মহারাষ্ট্র, একের শান্তি আসে তো অন্যের বিদ্রোহ। একেবারে জেরবার হয়ে গেছেন বাদশা। একে ঠান্ডা করলে ও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ওদিকে। নিজের তৈরি চালাকির জালে নিজেই জড়িয়ে পড়েছেন বাদশা। পশ্চিমে কান্দাহার বাদকশান হাতছাড়া হয়েই যে রেহাই পেলেন তাই-ই নয়, হিন্দুস্থানের প্রত্যন্তর দেশে সবাই তখন বাদশার বিরুদ্ধে মাথা তুলে উঠে বলছে–অয়মহং ভো! তরোয়াল উঁচিয়ে বলে উঠল–অয়মহং ভো! আর কোথায় ছিল এই পূর্ব সীমান্তের এক চেতো বরদার শোভসিংহ, সেও যেন তখন তরোয়াল উঁচিয়ে বলে উঠল–অয়মহং ভো!
