দুর্গা বললে–সাহেবটা পাগল বউরানি, একেবারে বদ্ধ পাগল
কেন? কী বলছিল?
বলে কিনা সাহেব মরতে এসেছে এখানে। সাহেবের মরতে বড় সাধ!
ওমা, সেকী? মরতে চায় কোন দুঃখে?
তবেই বোঝো! পাগল কি আর সাধে বলছি! এমন মানুষের সঙ্গে থাকলে আমরাও কোন দিন মারা পড়ব দেখছি! তাই তো বললাম সাহেবকে। বললাম-তুমি বাবা আমাদের একটা হিল্লে করে তারপর মরো বাঁচো আমরা দেখতে যাচ্ছিনে!
তা কী বললে?
বলবে আবার কী! নিজের মাথার ঘায়েই কুকুর পাগল!
হঠাৎ হরিচরণ ঘরে ঢুকেছে। বললে–দিদি, একটা সুখবর আছে, তোমার জামাই এসেছে।
দুর্গা তো অবাক। বললে–কী বলছ তুমি হরিচরণ? জামাই আমার আবার কে?
হরিচরণ বললে–কেন, তোমার মেয়ের বর?
ছোট বউরানির বুকখানা হাত করে উঠল। দুর্গা বললে–কে? ছোটমশাই? ছোটমশাই? ছোটমশাই খবর পেয়ে গেছে?
না দিদি, এ যে বললে–এর বউয়ের নাম মরালীবালা। তাই শুনেই তো ডেকে আনলাম। লোকটা বরানগরের পথে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিল, ভারী ভাল গান গাইতে পারে তোমার জামাই, দিদি–আমি রব না ভব-ভবনে গান শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম–তোমার নাম কী? সে বললে–উদ্ধব দাস! তোমার জামাইয়ের নাম উদ্ধব দাস তো!
দুর্গা বললে–না হরিচরণ, তুমি ওকে বিদেয় করে দাও বাছা, ও পাগল মানুষ, তোমাদের সাহেবের মতো বদ্ধপাগল–
তবে যে ও বললে–হাতিয়াগড়ে ওর শ্বশুরবাড়ি, ওর বউয়ের নাম মরালীবালা, ওর শ্বশুরের নাম শোভারাম বিশ্বাস। তুমি যা যা বলেছিলে, সব তো মিলে যাচ্ছে–
তারপর আর উত্তরের অপেক্ষা না করে বললে–যাই, ওকে ডেকে নিয়ে আসি গে, ওকে আমি বলেছি যে ওর বউ এখানে আছে–
বলেই ঘরের বাইরে চলে গেল।
দুর্গা ছোট বউরানির দিকে চাইলে। বললে–হরিচরণ আবার এ কী বিপদে ফেললে বলল তো ছোট বউরানি। এই এতগুলো পাগলকে নিয়ে তো দেখছি মহা মুশকিলে পড়া গেল
*
মুর্শিদাবাদের চেহেল্-সুতুনের ভেতরে তখন তুমুল হইচই বেধে গেছে। মরিয়ম বেগমের খবরটা যেন দেখতে দেখতে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল সব জায়গায়।
রাত থেকেই শুরু হয়েছিল। ভোর হবার পর থেকে আরও বেড়ে গেল। লুৎফুন্নিসার ঘরে নানিবেগম দৌড়োতে দৌড়োতে এসেছে।
শুনেছিস বহু, আমাদের মরিয়ম বেটির কাণ্ড?
লুৎফুন্নিসা আগেই শুনেছিল। শুধু পাথরের চোখ দিয়ে একবার চেয়ে দেখলে নানিবেগমের দিকে। কোনওদিনই তার মুখে ভাষা নেই, আজও যেন তার মুখে কথা ফুরিয়ে গিয়েছে। শিরিনার কোলে নতুন মেয়েটা তার দুধ খাচ্ছিল, সেই দিকেই চেয়ে রইল অপলক দৃষ্টি দিয়ে।
তুই কিছু বলবিনে তা হলে? তা হলে কার কাছে আমি যাই বল তো? কে আমার কথা শুনবে?
তবু কিছু উত্তর দিলে না লুৎফুন্নিসা। সকালবেলা নানিবেগমের নাস্তা পর্যন্ত খাওয়া হয়নি। অন্যদিন কোরান পড়তে পড়তে রাত ভোর হয়ে যায়, আজ শেষরাত্রির দিকে খবর পাওয়ার পর থেকেই নানিবেগম সোজা উঠে এসেছে বাইরে।
এসেই আমিনা বেগমের ঘরে গিয়েছিল–শুনেছিস আমিনা?
আমিনার বরাবর দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যেস। যখন আজিমাবাদে জৈনুদ্দিন আহম্মদের সঙ্গে ছিল, তখন থেকেই বড় আয়েশি মেয়ে সে। তিন ছেলের মা, তিনটে ছেলে প্রসব করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভেবেছিল এক ছেলে যখন নবাব হবেই, তখন তার আর কী ভাবনা। বড় ছেলের যদি কোনও ক্ষতিও হয়, আরও দু’জন তো রইল। ফজলকুলি খাঁ, আর মির্জা মেহেদি! কিন্তু বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে যে ছেলেরা এমন করে পর হয়ে যাবে কে ভেবেছিল। ঘুম থেকে ওঠবার আগেই তার পা টিপে দেবার আরামটুকুর জন্যে বিছানায় শুয়ে থাকত আমিনা বেগম। যখন প্রথম তন্দ্রা ভাঙত তখন ডাকত–সাকিনা
সাকিনা বলত–জি, বেগমসাহেবা
তারপর সেই সকালবেলাই মাথার কাছে আসত টাটকা আঙুরের রস। তাতে এক ছিটে আফিং মেশানো থাকত। সেই নেশাতে চোখ খুলত বেগমসাহেবার। তখন পেয়ালা আসত, পেয়ালায় থাকত দুধ। সেই দুধের সঙ্গে কাশ্মীরি জাফরান মিশিয়ে প্রথম নাস্তা হত। তারপর গোসলখানা। সেখানে থাকত ঝারির গরম জল। সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ–ওড়নি, কাঁচুলি, ঘাগরা, সব খুলে নিয়ে বেগমসাহেবাকে। ঝারির তলায় বসিয়ে দিত সাকিনা বাঁদি। তারপর গা ডলে দিত, চুল খুলে দিত। তারপর আসত তেল। পদ্মফুলের পাপড়ি নিংড়ে যে রস বেরোয় তার সঙ্গে ভৃঙ্গরাজের রস মিশিয়ে তেল তৈরি করে আমিনা বেগমসাহেবার চুলে মাখাতে হবে। চুলের গোড়ায় গোড়ায় ঘষে ঘষে দিতে হবে সেই তেল। তারপর যখন গোসলখানা থেকে বেরোবে তখন পায়ে জরিদার চটি পরিয়ে দিতে হবে। আমিনা বেগম তখন ঘরে এসে কেদারায় বসে রোদ্দুরে চুল শুকোবে। তখন আসবে আসল নাস্তা!
খেতে খেতে বেগমসাহেবা তখন হিসেবের খাতা বার করতে বলবে সাকিনাকে! উমিচাঁদের কাছে কত পাওনা, জগৎশেঠজিকে কত দিতে হবে। সুদ কত হল মহাজনিতে। দিনের সব হিসেব ওই সময় থেকেই শুরু হয় আমিনা বেগমের।
এই-ই বরাবরের নিয়ম!
শুধু আমিনার কেন, চেহেল্-সুতুনের সব বেগমের ঘরেই এই-ই নিয়ম। কারও কম কারও বেশি। আগের রাত্রে যে একটু অনেক রাত পর্যন্ত গান গেয়েছে, অনেক রাত পর্যন্ত ফুর্তি করেছে, সে আরও দেরি করে ওঠে। তারপর যত বেলা বাড়ে তত খোঁজা আর বাঁদিদের হাঁকডাক বেড়ে যায়। তখন এ-ওর ঘরে যায়। এ-ওর কেচ্ছা ওর কাছে গিয়ে বলে, ও-এর কেচ্ছা তাঁর কাছে গিয়ে শোনায়। তখন নতুন করে আবার বেরোয় বীণ, নতুন করে আবার সারেঙ্গির ঢাকা ভোলা হয়। কিংখাবের মখমলের আর জরির ঘাগরা আবার ঝলমল করে ওঠে। তখন থেকেই গুজগুজ ফিসফিস শুরু হয়। আসরফির হিসেবে শূন্যের পর শূন্য বসে। অঙ্কের খাতায় হিসেবের শূন্য সংখ্যায় বেড়ে বেড়ে পাতা ভরতি করে দেয়। তারপর যখন বেলা পড়ে আসে তখন চেহেল্-সুতুনের খানা-খানায় মোরগ মশাল্লামের সঙ্গে কড়া জাফরানের গন্ধ বেগমদের তন্দ্রা ছুটিয়ে দেয়। তখন সেতার ছেড়ে তক্কি বেগম বলে–যা তো মামুদা, কী খানা বানাচ্ছে দেখে আয় তো
